logo

রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ১২ আশ্বিন, ১৪২৭

header-ad
ছোট গল্প

পীর বকস আলীর স্বপ্নভঙ্গ

সেখ হুমায়ুন কবির সূর্য্য | আপডেট: ১৬ জুলাই ২০১৪

মাথার উপর গনগনে রোদ। চাঁদি ফেটে যাওয়ার মতো অবস্থা। পীর বকস আলীর কপাল-বুক দিয়ে ঘাম ঝরে পড়ছে। এক নাগারে হাঁটার ফলে মাথার সাথে পা দুটোও ঝিমঝিম করছে। তবু জোর কদমেই হাঁটছে সে। একটু জিরিয়ে নিলে ভালো হতো কিন্তু তাকে অনেক দূর পথ যেতে হবে। এজন্য কষ্ট হলেও হাঁফাতে হাঁফাতে এগিয়ে চলছে সে। রাস্তায় তার মতো ছিন্নমূল অনেক মানুষ চুপচাপ যন্ত্রের মতো হেঁটে চলেছে। কারো মুখে কোনো কথা নেই।

পীর বকস আলীর মনে হলো তার বুঝি শহরেই পৌঁছানো হবে না। ক্ষিদে এবং পিপাসায় ছাতি ফেঁটে যাওয়ার মতো অবস্থা। কিন্তু রফিক চেয়ারম্যানের কথা মনে হতেই তার মধ্যে জেদ চেপে বসল। কষ্ট সহ্য করতে না পারলে বউ-ছেলে-মেয়েরা না খেয়ে থাকবে। তাকে সবার আগে শহরে পৌঁছাতে হবে। আবার নতুন উদ্যোমে পা টেনে টেনে এগুতে থাকে সে।

রফিক চেয়ারম্যান তাকে কখনই কোনো সাহায্য করবে না। সেপ্টেম্বরে সর্বনাশা বন্যা দুবার ফসল নস্ট করেছে। অক্টোবরের ঘূর্ণিঝড় আধাপাকা ফসল জমিতে খেয়ে ফেলেছে। নভেম্বরের এই মাঝামাঝি সময়ে ফসল হারিয়ে কাজ না পেয়ে চেয়ারম্যানের কাছে গিয়েছিল কার্ডের জন্য। কিন্তু চেয়ারম্যান তাকে দু’কথা শুনিয়ে দিয়েছে। বলেছে, ‘কি পীর বকস মিয়া, ভোটের সময় আমার বিরুদ্ধে খুবতো লম্ফ-ঝম্ফ করলা। বাপ-দাদা তুইলা গালিগালাজ করলা। এখন আমার কাছে আসতে শরম লাগল না।’ পীর বকস আলী অসহায় আত্মসমর্পণে বলেছিল, ‘বাবাজি, না খায়া আছি! একটু ব্যবস্থা করো।’ চেয়ারম্যান তেরছা গলায় বিদ্রুপ করেছিল, ‘আমার কাছে কেন, তোমার হাসেম মৃধার কাছে যাও! সেই গোলা থাইকা তোমারে চাল দিবো, গম দিবো।’ অপমানিত পীর বকস আলী ক্ষোভ চাপা দিয়ে বলেছিল, ‘এইডা কি কও! সরকারতো হগল গরিব মানুষের জন্য কার্ড দিছে। আমারে দিবা না কেন?’

বেকায়দায় ছোট্ট একটুকরো ইটের সাথে ধাক্কা খেয়ে চেতনা ফিরে পেল পীর বকস আলী। ডান পায়ের বুড়ো আঙ্গুলের নখ উঠে গেছে। শরীরে রক্ত না থাকায় অল্প একটু রক্ত বেরুল। কিন্তু ব্যথা করছে খুব বেশি! এবার দাঁত চেপে খুড়িয়ে খুড়িয়ে হাঁটতে হচ্ছে। কত দূর এসেছে জানে না। তবে মাইকের হালকা শব্দ শোনা যাচ্ছে। তার মানে কাছাকাছি এসে পড়েছে। এবার একটু গতি বাড়াল সে। শহরে নামকরা একজন মন্ত্রী আসছে। বিরাট মিটিং হবে। ভাষণ দেওয়ার পর মন্ত্রী সবাইকে এক বস্তা করে চাল দিবে। সে আশায় ক্ষুধার্ত-ভগ্ন শরীর নিয়ে পথ মাড়িয়ে চলছে সে। তাকে যে চালের বস্তা পেতেই হবে।

বেলা একটার দিকে শহরের সেই বিশাল মাঠে এসে পৌঁছালো পীর বকস আলী। বিশাল মাঠের তখন অর্ধেক ভরে গেছে। এতো লোক দেখে সে কিছুটা ঘাবড়ে গেল। পিছনে থাকলে কিছুই পাওয়া যাবে না। তাই লোকজনকে ঠেলেঠুলে সামনের দিকে এগুতে লাগলো সে। প্রত্যাশা আর পরিশ্রমে কাহিল হয়ে পড়েছে গোটা শরীর।

মাঠে ঢুকে একটা খুটি ধরে ঝিম মেরে রইল সে। বেলা দুইটার দিকে আলোচনা সভা শুরু হলো্। তখনও মন্ত্রী মহোদয় আসেননি। এর প্রায় দেড় ঘণ্টা পর মন্ত্রী মহোদয় এলেন। ততক্ষণে পুরো মাঠ ছেয়ে গেছে মানুষে মানুষে। তিল ধারণের ঠাঁই নেই। লোকজনের চাপে পীর বকস আলী হাঁসফাঁস করতে লাগল। তার মনে আশার দ্বীপ ক্রমেই নিভে যেতে লাগল। এতো মানুষ। তাদের ভিড়ে চালের বস্তা চোখে পড়ছে না। আসলে কী সবাই বস্তা পাবে। মাইকে কে কী বলছে তার কানে কোনো শব্দ ঢুকছে না। সে শুধু ভাবছে এসব প্যাঁচাল কখন শেষ হবে। সে বিরক্ত হলেও মুখটা হাসি হাসি রাখার চেষ্টা করছে। আর সেই মুহূর্তটির জন্য প্রহর গুনছে কখন বস্তা দেয়া শুরু হবে। মনে একটু আশঙ্কাও হলো, এই ভিড়ের মধ্যে চালের বস্তা নিয়ে যেতে পারবে তো। চারদিকে শুধু মানুষ আর মানুষের মাথা। কোথায় দাঁড়ালে সুবিধা হবে, এটাই ভাবছিল সে। এমন সময় সবাই হাততালি দিয়ে উঠল। মনে হয় মন্ত্রী মহোদয় ভাষণ দিবেন। পীর বকস আলী এবার মনযোগ দেওয়ার চেষ্টা করল। তিনি বলার জন্য মাইকের কাছে গেছেন, ঠিক এমন সময়ে মঞ্চের ভিতরে ও পীর বকস আলীর সামনে বিকট শব্দে বোমাটা ফাটল। আর্ত চিৎকারে লুটিয়ে পড়ল অনেক মানুষ। মানুষের ঢালের কল্যাণে অল্পের জন্য বেঁচে গেল সে। বুকটা তার এখনো ধরফর করছে। তবে শরীরে কোনো শক্তি নেই। ফলে লোকজনের ধাক্কায় দুর্বল শরীরে মাঠেই নেতিয়ে পড়ল। এক সময় জ্ঞান হারিয়ে ফেলল সে।

হঠাৎ জ্ঞান ফিরে পেয়ে পীর বকস আলী দেখে চারদিকে পুলিশ ছেয়ে গেছে। যারা পালাবার তারা পালিয়ে গেছে। পীর বকস আলী পালাতে পারেনি বলে পুলিশের সন্দেহ হওয়ায় তাকে গ্রেফতার করা হলো। ফ্যালফ্যাল করে নিজের দুরবস্থা দেখছিল সে। মন্ত্রী মহোদয় বোমার আঘাতে সাথে সাথেই মারা গেছেন। তার মৃত্যুতে পুলিশ বাহিনীর টনক নড়ে গেছে। একজন পুলিশ অফিসার  চিৎকার করে অন্যান্যদের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘সন্দেহজনক কেউ যেন রেহাই না পায়। হত্যাকারীদের ধরতে হলে কাছাকাছি যারা ছিল তাদের সবাইকে আটক করতে হবে।’ পীর বকস আলী হাউমাউ করে কেঁদে ফেলল। এক পুলিশ বুট দিয়ে তার কোমড়ে জোড়ে লাথি মারল।

পরদিন থানায় রফিক চেয়ারম্যান এলেন। ডিউটি অফিসার পীর বকস আলীকে দেখিয়ে বললেন, ‘এরে চেনেন।’ রফিক চেয়ারম্যান আমুদে হাসি দিয়ে বলল, ‘একটু-আধটু চিনি। আমার ইউনিয়নের লোক। শুনেছি অচেনা অজানা লোকজনের সাথে উঠবস করে।’

পীর বকস আলী আর ছাড়া পেল না।