logo

রবিবার, ২৪ জুন ২০১৮ | ১০ আষাঢ়, ১৪২৫

header-ad

এখন আর চিঠি লেখে না!

পাঠকইলেখক ডেস্ক | আপডেট: ০৯ মার্চ ২০১৮

কাগজে-কলমে চিঠি লেখার অভ্যাস নেই বললেই চলে। এর বদলে মানুষ ব্যবহার করছে কম্পিউটার। শুধু দ্রুততার কারণেই যে এ মাধ্যমে লেখার চাহিদা তৈরি হয়েছে, তা নয়। কম্পিউটারে লেখার আরো কিছু সুবিধা রয়েছে। ইচ্ছেমতো ডিলিট কিংবা আগের লেখা নিয়ে আসা যায়। এবং চিরস্থায়ীভাবে তা ই-মেইলে পাঠিয়ে ইথারে সংরক্ষণ করা যায়।

এতকিছুর পরও কথা কিন্তু থেকেই যায়। আধুনিক বিজ্ঞান মানুষকে দিয়েছে বেগ, কেড়ে নিয়েছে আবেগ। রবীন্দ্রনাথের একথাটি গভীরতর অর্থ নির্দেশ করে। কম্পিউটারে দ্রুতগতিতে লেখার অভ্যাস এবং সুবিধা মানুষকে একটি সিস্টেমের মধ্যে তৈরি করে ফেলেছে। ফলে তার চিন্তা-আবেগ খুব বেশি এখন আর কাজ করে না। এরকমই নিয়ম। সময়ের সাথে সাথে মানুষকে খাপ খাইয়ে নিতে হয়। তাই মানুষকেও হতে হয়েছে গতিবান।

জনপ্রিয় একটি গান আছে। গানটি এই, নাই টেলিফোন নাইরে পিয়ন নাইরে টেলিগ্রাম/বন্ধুর কাছে মনের খবর কেমনে পৌঁছাইতাম। সময়ের সাথে এ গানটির উপযোগিতা হারিয়ে গেছে। বর্তমান প্রজন্ম এই আকুতি কোনোভাবেই উপলব্ধি করতে পারবে না। এক সময় বাবার কাছে টাকা চেয়ে পুত্রের চিঠির যে আবেদন ছিল, তা এ প্রজন্মের কাছে অজানা। পুত্রের কাছে মায়ের একটা চিঠি কিংবা মায়ের কাছে পুত্রের একটা চিঠির কী আবেদন তা বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির আলোয় বেড়ে ওঠা একটি ছেলে বা মেয়ের অনুভূতিতে কখনোই স্পর্শ করবে না। প্রযুক্তির ছোঁয়ায় আমরা যখন অভ্যস্ত ছিলাম না তখন চিঠিই যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হতো। এ চিঠিই কখনও বিনোদনের খোড়াক যোগাত, কখনও ব্যথাতুর হৃদয়ে কান্না ঝরাতো, কখনও উৎফুল্ল করতো। কখনো আবার আবেগে আপ্লুত করতো কালি ও কাগজে লেখা চিঠিতে।

কিছু কিছু চিঠি বারবার খুলে পড়ে আবার ভাঁজ করে রাখতে রাখতে ভাঁজের অংশগুলোই ছিঁড়ে যেত। বিশেষ করে প্রেমের চিঠি। চিঠি পাওয়ার আকুলতা কিংবা চিঠি পড়ার আনন্দ সবকিছুই যেন আজ ম্লান হয়ে গেছে। ইন্টারনেটের এ যুগে কাগজ-কলমে লেখা চিঠির প্রচলন অনেক কমে গেলেও তা একেবারে বন্ধ হয়ে যায়নি। অনেক অফিসিয়াল চিঠি এখনও প্রতিদিন ডাকবিভাগের মাধ্যমেই আসে। তবে প্রযুক্তির ছোঁয়া ডাকবিভাগেও লেগেছে। ফেসবুক টুইটার কিংবা মেইলে চিঠি বা তথ্যের আদান-প্রদান যত দ্রুত হোক না কেন, কাগজে লেখা চিঠির আবেগময়তা মানুষ কোথায় পাবে?

বিজ্ঞান আমাদের দিয়েছে নিত্যনুতন প্রযুক্তি। আজ পকেটে পকেটে মোবাইলফোন। নিমিষেই প্রিয়জনের কাছে পৌঁছে যায় হৃদয়ের কথা। কাগজে চিঠি লিখে আবার তার জবাবের জন্য পথ চেয়ে বসে থাকার সময়টুকু আজ হারিয়ে গেছে। একটা সময় ছিল, কাগজে চিঠি লিখে তার জবাব পাবার জন্য তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষা করতে হয়েছে প্রিয় মানুষকে। চাতক পাখির মতো পথের পানে চেয়ে থাকতে হয়েছে। কখন আসবে সেই চিঠি! কখন ডাক পিয়ন দরাজ কণ্ঠে বলবে, চিঠি এসেছে চিঠি। বাড়িতে কে আছেন? প্রিয় মানুষের কাগজে লেখা খামে ভর্তি চিঠি হাতে পেয়ে খুশিতে একেবারে আটখানা। আজ নিজের স্ট্যাটাস বাড়ানোর জন্য, যোগাযোগের জন্য কিংবা বন্ধু খোঁজার জন্য কত না প্রযুক্তি। আজ পত্রমিতালি গাইডের মাধ্যমে বন্ধু খোঁজার দরকার নেই। মার্ক জুকারবার্গ হয়তো বিষয়টি বুঝতে পেরেই ফেসবুক বানিয়েছেন।

এরপরও এক সময় মার্জিন টানা কাগজে বলপেন কিংবা রেডলিপ কলম দিয়ে লেখা চিঠির আনন্দই ছিল অন্যরকম।

এ চিঠি লেখার বাক্য চয়ন, ভাষার প্রায়োগিক ব্যবহার, চিঠির কথা সবমিলিয়ে চিঠির নান্দনিকতায় স্নেহ ভালবাসার পূর্ণতায় এক অপার মমত্ত্ব প্রকাশ পেত। হাতে লেখা চিঠি হৃদয়ের কথাই শুধুই বলতো না, তাতে আবেগ, আকুলতা ও ব্যাকুলতা সবই প্রকাশ পেত। মা-বাবা যখন সন্তনের হাতের লেখা চিঠি পড়তেন তখন লেখার মধ্যে হৃদয় দিয়ে সন্তানের মুখ দেখতে পেতেন। অবচেতনে চিঠি বুকে জড়িয়ে আদর দিতেন। প্রেমের চিঠিগুলো তো এক একটি ইতিহাস। প্রেমিক-প্রেমিকা হৃদয়ের আকুলতা-ব্যাকুলতা প্রতীক্ষার প্রহরের খুঁটিনাটি ভাষার মাধুর্যে এমনভাবে লিখত যা পড়ে মনে হতো, শত ফুল দিয়ে গাঁথা একটি গল্প বা উপন্যাস।

প্রণয়ের কাগজে চিঠি লিখতে কত পাতা যে ভরে যেত তার কোন সীমারেখা থাকত না। বেশি পাতার চিঠি হলে খামের ওপর বাড়তি টিকিট লাগাতে হতো। বাড়তি মাশুল না দিলে প্রাপককে তা পরিশোধ করতে হতো। খামের ওপর অর্ধচন্দ্রের সিলমোহর আঁটা এ চিঠিকে বলা হতো বেয়ারিং। হাতে লেখা চিঠি পরিবারের মধ্যে নিবিড় সম্পর্ক ও ভালবাসার গভীরতার সেতু গড়ে দিত। পোস্ট অফিসের খাকি বুশ শার্ট পোশাকের পিয়ন দরজায় কড়া নেড়ে যখন উচ্চস্বরে হাঁক দিত চি...ঠি, তখন কে আগে ছুটে গিয়ে চিঠিটি নেবে এর ছোটখাটো দৌড় প্রতিযোগিতা হয়ে যেত। দীর্ঘদিন পিয়নের এমন হাঁকডাক না শুনলে অর্থাৎ চিঠি না এলে মনে নানা ভাবনার উদয় হতো।

প্রণয়ের চিঠি ছিল তারুণ্যের উচ্ছ্বাসে হৃদয়ের আবেগের এক মধুময় পাঠশালা। যেখানে লেখার সঙ্গে মিশে থাকত সৃষ্টিশীল ভাবনার প্রকাশ। ভাষা ও জ্ঞানের কত শৈলী দিয়ে একে অপরের হৃদয়ের কত গভীরে পৌঁছাতে পারে তার প্রতিযোগিতা শুরু হতো। চিঠি পাঠানোর সময় কখনও কাগজের ভাঁজে ফুলের পাপড়ি ছিটিয়ে দেয়া, কখনও পারফিউমের দুই এক ফোঁটা ফেলে সুগন্ধী করা ছিল বাড়তি অনুভূতির বিষয়। প্রেমের এ চিঠি আদান-প্রদানও ছিল অ্যাডভেঞ্চারাস। লুকিয়ে চিঠি লিখে তা খামে ভরে পোস্ট অফিসের বাক্সে ফেলার পর শুরু হতো ফিরতি চিঠির প্রহর গোনা। এক্ষেত্রে পিয়ন ছিল প্রণয় গভীর করে দেয়ার অনুঘটক।

প্রেমিক-প্রেমিকা উভয়ই সুসম্পর্ক রাখত পিয়নের সঙ্গে। হাতের লেখা চিনিয়ে দিত পিয়নকে। খামের ওপর ঠিকানায় এমন লেখা থাকলে তা যেন অভিভাবকের হাতে না পড়ে তার ‘আন্ডারস্ট্যান্ডিং’ ব্যবস্থা ছিল। এভাবে অনেক সফল প্রণয়ের নীরব স্বাক্ষী হয়ে থাকত ডাকপিয়ন। বিয়ের আনুষ্ঠানিকতায় তারাও নিমন্ত্রণ পেত। প্রেম উপাখ্যানে এতদিন যে পিয়ন প্রণয়ের মানুষদের কাছ থেকে বখশিশ পেত অনুষ্ঠানে তার ছিল উপহার দেয়ার পালা। প্রণয়ের সফল মানুষদের আশীর্বাদ করতে গিয়ে কত পিয়নের চোখে আনন্দের জল গড়িয়ে পড়েছে।

আবার প্রেমের ব্যর্থতায় ব্যথিত হয়েছে। পরিবারের চিঠিই হোক আর প্রেমের চিঠি হোক, যে চিঠি যত নান্দনিকতার সৃষ্টিতে লেখা তা কতবার যে পড়া হতো! কোন চিঠি পড়ে হৃদয় জুড়িয়ে যেত। কোন চিঠি পড়ে আনন্দে মুখ হাসি ফুটত। আবার কোনো চিঠি পড়ে চোখের জলও গড়িয়ে পড়ত। পারিবারিক চিঠিগুলো অনেক সময় খবরের কাগজের বিকল্প হিসাবে কাজ করত। কোনো চিঠিতে গ্রামের ঘটনা, আবাদের খবর, প্রকৃতিক দুর্যোগের খবরসহ নানা খবর লেখা থাকত। আগের দিনে কোনো চিঠি ফেলে দেয়া হয়নি। প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই সাইকেলের স্পোকের মাথায় বড়শির মতো করে তার মধ্যে গেঁথে রাখা হতো। অনেক চিঠি ছিল নীরব স্বাক্ষী।

বাজারে রাইটিং প্যাড (চিঠি লেখার প্যাড) মিলত। বনেদি বাড়িতে টেবিলে এ প্যাড থাকত। বিদেশে চিঠি পাঠাতে বিশেষ ধরনের নীল রঙের এয়ার মেইল পার অ্যাভয়েন ছাপাঙ্কিত খাম পাওয়া যেত। অনেক সময় নীল কাগজে ও খামে লেখা চিঠি ছিল প্রেমের চিঠির প্রতীক। পোস্ট অফিসের এসব চিঠিকে ঘিরেই এসেছে সভ্যতা। ডাকঘরের এ চিঠির দিন আজ ফুরিয়ে গেছে। সভ্যতার অগ্রযাত্রায় চিঠির বদলে এসেছে কম্পিউটারে ই-মেইল, সেল ফোনের ক্ষুদে বার্তা (শর্ট মেসেজ), সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে স্ট্যাটাস হোয়াটস অন ইউর মাইন্ড বক্সে লিখা। বর্তমানে কুরিয়ার সার্ভিসে যে চিঠি আদান প্রদান হয় তার বেশিরভাগই প্রাতিষ্ঠানিক ও অফিসিয়াল।

সেদিনের ও আজকের চিঠি সবই চিঠি। তবে কোন চিঠিতে প্রাণের আকুলতা কতটুকু তাই প্রশ্ন! বর্তমানে যার কাছে আমরা চিঠি লিখতে চাই তাকে স্কাইপি বা ভাইবারের মাধ্যমে কম্পিউটারের মনিটরে দেখে কথা বলা যায়। সেল ফোনে সরাসরি কথা বলা যায়। ক্ষুদে বার্তায় অতি সংক্ষেপে জানান দেয়া যায়। 

তাহলে চিঠির মতোই বইও কী পাঠকের কাছ থেকে হারিয়ে যেতে চলেছে? এক সময় প্রিন্টেড বইয়ের চাহিদা তুঙ্গে থাকলেও এখন বেশিরভাগ পাঠকই ই-বুক কিংবা পিডিএফ ফরম্যাটের বই পড়ছে। এজন্য নির্দিষ্ট কিছু ই-বুকের ওয়েবসাইটে গিয়ে বইয়ের নাম লিখলেই পাওয়া যাচ্ছে প্রিয় লেখকের জনপ্রিয় সব বই। আর তাই তো দিন দিন প্রিন্টেড বইয়ের বিক্রি কমার সাথে সাথে অনলাইনে বই পড়ার পাঠক বাড়ছে। (লেখা সংগৃহীত)

ফেমাসনিউজ২৪/ এসআর/পিআর