logo

বুধবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৮ | ২৮ অগ্রহায়ণ, ১৪২৫

header-ad

চায়ের কাপে নির্বাচনী উত্তাপ

মেহের মামুন: | আপডেট: ০৩ ডিসেম্বর ২০১৮

৩০ নভেম্বর শুক্রবার বিকেল গড়িয়ে প্রায় সন্ধ্যা। উপজেলার বনগ্রাম বাজারের বাস স্টপেজের নিকটে জিহাদের বিখ্যাত চায়ের দোকান। লাল চা, দুধ চা, ১৫ টাকায় ঘন দুধের চা পিপাসুদের নিত্য মিলন মেলা চলে সারাদিন, তবে শীতের সন্ধ্যা বলে কথা। আর চায়ের সাথে বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষের জম্পেস আড্ডার তুলনা সারাবাজার কি উপজেলায়ও মিলবে না। ২৫ বৎসরের অক্লান্ত যুবকের সহযোগী তার ভাই আহাদ। দেখেই লম্বা ছালাম সাংবাদিক (সংবাদ কর্মী হিসেবে আমাদের গড়পড়তা পরিচিতি) কাকা বসেন, আজকের চায়ের দাম নেব না। জানতে চাইলাম কেন?

স্বভাবসুলভ জবাব, নির্বাচনের গরমে চা বিক্রি বেড়েছে। নির্বাচনের আগ পর্যন্ত আপনাদের চা ফ্রি। পাশ থেকে তার কথায় ছোঁ বসান বনগ্রামের ভ্যান চালক জব্বার মিয়া, আমাদেরকেও কিন্তু ফ্রি খাওয়াতে হবে। পাশ থেকে অন্য একজন বলে ওঠেন ভোট তো দেব মার্কা (প্রতীক) দেইখা। মার্কার দোকান হলে ভোটারেও চা ফ্রি। মুকসুদপুর নৌকার ঘাঁটি তারপরও এবার উৎসাহ আছে, দেখি অন্য মার্কার জোর কেমন হয়। চায়ের কাপ হাতে বাজারের ব্যবসায়ী আজিজ মিয়া আরেক ব্যবসায়ীর সাথে নৌকার পক্ষে সাফাই গাইছেন। আড্ডারত ভোটাররা বললেন এবারের নির্বাচনে আমরা উৎসাহের সাথে ভোট কেন্দ্রে যাবে।

কয়েকজন বিরোধী দলেরও ছিল, কিন্তু নৌকার সমর্থক বেশি বলে তাদের মুখে কুলুপ এটে রেখেছে। কেউ হা করতে চাইলেই অন্যরা খপ করে ধরে বসে। দেশের নির্বাচন নিয়ে নানান মন্তব্য, তর্ক-বিতর্কের এ চিত্র শুধু বনগ্রাম বাজারেই নয়, মুকসুদপুর সদর বাজারসহ উপজেলার সর্বত্র; অলিগলির চা দোকান থেকে বিভিন্ন হোটেল- রেস্তোরাঁ, গরম চায়ের সঙ্গে বইছে নির্বাচনী উত্তাপও। মূলতঃ মুকসুদপুরের নির্বাচনে কে প্রার্থী বা কে প্রত্যাশা করে বাদ পড়লেন তার চেয়েও অধিক আলোচনা বিএনপি ও ঐক্রফ্রন্টের অংশ গ্রহণে দেশজুড়ে আওয়ামী লীগের অবস্থান, কেমন হবে ভোট? সুষ্ঠু শান্তিপূর্ণ নাকি ভোট কাটা, কোনটি। প্রায় আলোচনায় উপসংহার হয় এরকম বয়স্ক হলে শেখের বেটি বলছে ভোট নিরপেক্ষ হবে, নেতা-কর্মী হলে -নেত্রী চাইছে যে কোন মূল্যে ভোট শান্তিপূর্ণ করতে হবে, এটা তার ইজ্জ্বত।

উৎসবমুখর পরিবেশে একাদশ জাতীয় নির্বাচনে মনোনয়ন ফরম কিনেছেন প্রার্থীরা। উপজেলার প্রবীণ এক রাজনীতিক বললেন আমাদের রাজনীতির জীবনে আগে কখনো এতো দলীয় মনোনয়ন কিনতে দেখিনি। তিনি বলেন এবারের মতো মনোনয়ন ফরম বিক্রি এ দেশের রাজনীতির ইতিহাসে অতীতে কখনো হয়নি। ধানমন্ডির আওয়ামী লীগ কার্যালয় ঘিরে গোটা এলাকায় যেমন জনস্রোত নেমেছিল, তেমনি নয়াপল্টনে বিএনপি কার্যালয় ঘিরে নেমেছিল নেতা-কর্মীর ঢল। বনানীতে এরশাদের জাতীয় পার্টির মনোনয়ন ফরম বিক্রি নিয়েও উৎসব কম হয়নি। মনোনয়ন ফরম বিক্রি করেই আওয়ামী লীগ ১৩ কোটি টাকা আয় করেছে। বিএনপি করেছে ১২ কোটি। এরশাদের জাতীয় পার্টিও ৫ কোটি টাকার ওপরে আয় করেছে।

একমাস পরেই অনুষ্ঠিত হবে একদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। মুকসুদপুর-কাশিয়ানী নিয়ে গঠিত ২১৫ গোপালগঞ্জ-১ আসনের সব দলের মোট ৭জন প্রার্থী লড়বেন। মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার পরে দিনরাত ২৪ ঘন্টাই এখন গ্রামে গঞ্জে, হাটে বাজরে উৎসবের আমেজ। মুকসুদপুর উপজেলার ৩০৯.৬৩ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে ১৬টি ইউনিয়ন এবং ১টি পৌরসভায় মোট জনসংখ্যা ২ লাখ ৮৯ হাজার ৪শ ৬ জন, যার মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৪২ হাজার ৩শ ২০ জন, নারী ১ লাখ ৪৮ হাজার ৪শ ৫০ জন। এর মধ্যে মোট ভোটার ২ লাখ ২১ হাজার ১শ ২৯। পুরুষ ভোটার ১ লাখ ১১ হাজার ৭শ ৫৩, নারী ভোটার ১ লাখ ৯ হাজার ৩শ ৭৬। স্থানীয় আওয়ামীলীগ নেতা কর্মীরা নির্বাচন সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে পরিচালনা করার জন্য উপজেলার পৌরসভাসহ সকল ইউনিয়নে কেন্দ্রভিত্তিক নির্বাচনী পরিচালনা কমিটি গঠন করেছেন। অন্যদিকে বিরোধী দলের নেতা কর্মীরাও তাদের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করে যাচ্ছেন।

আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণকে কেন্দ্র করে সারা দেশের সাথে তাল মিলিয়ে মুকসুদপুরেও কর্মচাঞ্চল্য বাড়ছে; যার ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে অর্থনীতিতে। সময় ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে এর প্রভাবে আরও চাঙ্গা হয়ে উঠবে ভোটের অর্থনীতি। কেননা ঈদ-উৎসব, প‚র্জা কিংবা জাতীয় নির্বাচনের সময় শহরের পাশাপাশি প্রত্যন্ত গ্রামেও নগদ অর্থের সরবরাহ বাড়ে। এ সময় গ্রামের ছোটখাটো ব্যবসা-বাণিজ্য চাঙ্গা হয়। ভোগের উষ্ণতা চায়ের কাপের ঝড়কে প্রভাবিত করে। ফলে বিকিকিনি কয়েক গুণ বাড়ে। অর্থনীতির ভাষায় কর্মচাঞ্চল্য বাড়লে মানুষের ভোগ কিংবা ব্যয় বাড়ে; যা দেশের অর্থনীতি চাঙ্গা হওয়ার সহায়ক। বিশেষ করে ছাপা খানাগুলোতে কর্মতৎপরতা বেড়েছে চোখে পড়ার মতো।

মুকসুদপুর বাজারে জয় প্রেসের মালিক নাজমুল হাসান জানান, গতানুগতিকভাবে নির্বাচনের সময় একটু কাজের চাপ বেশি থাকে। এসময় বাড়তি কর্মচারীও নিয়োগ দিতে হয়। তবে এলাকার এমপি প্রার্থীরা যদি আমাদের মুকসুদপুর বাজার থেকে নির্বাচনী পোষ্টার, ব্যানার, ফেষ্টুন, লিপলেট ছাপায় তাহলে কর্মব্যস্ততা আরো বাড়বে এবং অনেক টাকার কাজ হবে। প্রেস ব্যবসায়ীদের দাবি মুকসুদপুর থেকে যেন ছাপার কাজ করানো হয়। তাহলে তারা ব্যবসা করে টিকে থাকতে পারবে।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতা কর্মীরা বলছেন মুকসুদপুর আওয়ামী লীগের ঘাটি। এ আসনে আমরা এবার মুহাম্মদ ফারুক খানকে ৫ম বারের মতো বিপুলভোটে বিজয়ী করব ইনশাআল্লাহ। আমরা আশা করি গতবারের তুলনায় এবার আমরা আরো বেশি ভোট দিব। শতভাগ ভোট দেবার আশ্বাস আমাদেরকে সাধারণ ভোটাররা দিয়েছেন। সুতরাং আওয়ামীলীগের প্রার্থী মুহাম্মদ ফারুক খানকে আমরা শতভাগ ভোট দিয়ে সংসদীয় আসনে অধিষ্টিত করব। আমরা আশা করি তিনি নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পরে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তাকে মন্ত্রীর আসনে বসাবেন।

অন্যদিকে বিএনপি এবং অন্যান্য দলের নেতাকর্মীরা বলছেন যদিও মুকসুদপুর আওয়ামী লীগের ঘাটি তবুও আমরা বিজয়ী হওয়ার আশায় নির্বাচনে এসেছি। যদিও নির্বাচন সুষ্ঠ ও নিরপেক্ষ হয় তাহলে আমরাও বিজয়ী হতে পারি।

ফেমাসনিউজ২৪/এসএ/কেআর