logo

মঙ্গলবার, ২৩ অক্টোবর ২০১৮ | ৮ কার্তিক, ১৪২৫

header-ad

যে কারণে বিশ্ব ইজতেমায় মাওলানা সাদকে বাধা

নিজস্ব প্রতিবেদক | আপডেট: ১০ জানুয়ারি ২০১৮

দিল্লির নিজামউদ্দিন মসজিদ থেকে শতবর্ষ আগে তাবলিগ জামাতের যাত্রা ও প্রসারের ক্ষেত্রে মাওলানা মোহাম্মদ ইলিয়াস (রহ.)-এর অক্লান্ত প্রচেষ্টা ও দোয়ার কথা বিশ্ববাসী জানে।…জীবিত থাকতে প্রতিবছর এই মারকাজের উত্তরসূরি মাওলানা মোহাম্মদ ইউসুফ (রহ.), মাওলানা ইনামুল হাসান (রহ.) মাওলানা জুবায়েরুল হাসান (রহ.) টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমায় অংশ নিয়েছেন। এখন তাদের উত্তরসূরি হিসেবে আসছেন মাওলানা মোহাম্মদ সাদ।

পুরো তাবলিগের ইতিহাসে দেখা যাচ্ছে, টঙ্গীসহ এ ধরনের ইজতেমার দায়িত্বভার নিজামউদ্দিন মারকাজের উত্তরসূরিদের ওপরই থাকছে, যেটা ক’বছর ধরে অত্যন্ত সুচারুভাবে পালন করে আসছেন মাওলানা মোহাম্মদ সাদ।

তবে বিশ্ব ইজতেমা নিয়ে বিতর্কের সূত্রপাত মাওলানা সাদের বক্তব্য 'তাবলীগ করা ছাড়া কেউ বেহেশতে যেতে পারবে না' এমন বক্তব্যের জের ধরে। ভারতের সবচেয়ে বড় ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দারুল উলুম দেওবন্দ থেকে তার এ বক্তব্যের বিরোধিতা করা হয়। এমন বক্তব্য প্রত্যাহারের জন্য বলা হলেও মাওলানা সাদ উল্টো যুক্তি দেন। তারপর থেকেই বিশ্বব্যাপী মাওলানা সাদকে কেন্দ্র করে সমালোচনার ঝড় ওঠে। বাংলাদেশের আলেমরাও এ বক্তব্যের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। এমন উদ্ভুত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে বিশ্ব ইজতেমায় মাওলানা সাদ যেনো না আসতে পারেন সেজন্য আলেমরা সম্মিলিত সিদ্ধান্ত নেন। তাবলীগের বাংলাদেশের ১১ জন শুরা ফয়সালের মধ্যে ৬জনই আলেমদের এ সিদ্ধান্ত মেনে নেন। তারপরেও একটি অংশ তাবলীগের মুরুব্বী ওয়াসিফুল ইসলামের নেতৃত্বে সম্মিলিত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তিনি অবস্থান নেন বলে অভিযোগ ওঠে।

মাওলানা সাদকে ঠেকাতে বিমানবন্দরে বিক্ষোভ : মাওলানা সাদ কান্ধলভীভারতের দিল্লির মাওলানা সাদ কান্ধলভীকে বাংলাদেশে আসা ঠেকাতে হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিক্ষোভ করছেন শত শত আলেম-ওলামা। বিশ্ব ইজতেমায় সাদ কান্ধলবীর অংশগ্রহণকে প্রতিহত করতেই বিক্ষোভ হচ্ছে ঢাকার বিভিন্ন মাদ্রাসায়। দিল্লির নেজামুদ্দিনের মুরব্বি মাওলানা সাদ যেন বাংলাদেশে আসতে না পারেন সেজন্য বুধবার সকাল থেকেই বিমানবন্দর এলাকায় জড়ো হন আলেম-ওলামারা।

নিজের বিতর্কিত বক্তব্য প্রত্যাহার না করে এবং সবার সম্মিলিত সিদ্ধান্তকে পাশ কাটিয়ে মাওলানা সাদের ইজতেমায় আসা উচিত নয়- এমন দাবিতে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করছেন তারা। আলেমরা এখন বিমানবন্দর গোলচত্বর অবস্থান করছেন বলে জানান মাদরাসা বাইতুল মুমিনের মুহতামিম মুফতি নেয়ামতুল্লাহ আমিন। গোলচত্বরের চারপাশে অস্থায়ী মঞ্চ স্থাপন করে আলেমরা বক্তব্য দিচ্ছেন। বক্তারা বাংলাদেশে তাবলিগ জামাতের যে নিরপেক্ষ ইমেজ রয়েছে তা অক্ষুণ্ন রাখার দাবি জানান।

বিশ্ব ইজতেমায় সাদকে ঠেকাতে বিমানবন্দরে বিক্ষোভ করছেন আলেম-ওলামারাএকাধিক সূত্রে জানা যায়, ১২ জানুয়ারি এবারের বিশ্ব ইজতেমা শুরু হলেও মাওলানা সাদ ১০ জানুয়ারি বুধবার বাংলাদেশে আসবেন। বেলা ১টা ৩০ মিনিটে বাংলাদেশ বিমানবন্দরে তার অবতরণের কথা। মাওলানা সাদ কান্ধলভী ও নিজামুদ্দিন মারকাজের সদস্যদেরকে বাংলাদেশ সরকার বিশেষ কূটনৈতিক ভিসা দিয়েছে। তারা এরই মধ্যে বাংলাদেশগামী বিমানের টিকিটও বুকিং দিয়েছেন বলে জানা যায়।

এদিকে তাবলীগ জামায়াতের সবচেয়ে বড় সম্মেলন বিশ্ব ইজতেমা বাংলাদেশ থেকে সরিয়ে নেয়ার ষড়যন্ত্র চলছে। ভারতের নিজামুদ্দিনের (তাবলীগের প্রধান কেন্দ্র) মুরুব্বী মাওলানা সাদকে ঘিরে এ ষড়যন্ত্র দানা বাধছে। আর এ নেপথ্যে কলকাঠি নাড়ছেন বাংলাদেশের তাবলীগের কয়েকজন। সম্প্রতি বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে মালয়েশিয়া নও মুসলিম আব্দুল্লাহ চং বিশ্ব ইজতেমা সরিয়ে নেয়ার হুমকি দিয়ে এ চিঠি পাঠান।

চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, তাবলীগের মুরুব্বী মাওলানা সাদকে বিশ্ব ইজতেমায় আসতে না দিলে বাংলাদেশ থেকে ইজতেমা মালয়েশিয়াতে নিয়ে যাওয়া হবে। যদিও মালয়েশিয়া তাবলীগের শুরা ফয়সালরা (নীতি নির্ধারকরা) এ চিঠির বিরোধিতা করে পাল্টা চিঠি দিয়ে বাংলাদেশে ইজতেমার প্রতিই সমর্থন জানিয়েছেন।

এদিকে গত ৭ জানুয়ারি তাবলীগ জামাতের মুরুব্বী ও কওমি আলেমদের সমন্বয়ে গঠিত একটি কমিটি মাওলানা সাদের ঢাকা সফরের প্রতি নিষেধাজ্ঞার সুপারিশ করেন। যাত্রাবড়িার জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলুম মাদানিয়ায় এ বিষয়ে আলেমদের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ তাবলীগের শুরা সদস্য, উপদেষ্টারাও এ বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।

তাবলীগের শুরা ফয়সাল মাওলানা ফারুক বলেন, "যেহেতু মাওলানা সাদকে নিয়ে কিছু কথা উঠেছে, তাই আমিও এবারের ইজতেমায় তার না আসার পক্ষে রায় দিয়েছিলাম। সম্মিলতি আলেমগণ তার না আসার বিষয়ে মতামত দিয়ে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেন।"

তারপরেই গতকাল ৮ জানুয়ারি বাংলাদেশের সর্বস্তরের আলেম ও তাবলীগ জামাতের অধিকাংশ মুরুব্বীদের সিদ্ধান্ত অমান্য করে কয়েকজনের স্বাক্ষর জাল করে ভারতের বিতর্কিত আলেম সাদ’কে বিশ্ব ইজতেমায় আনতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছেন ঢাকার কাকরাইলের মুরুব্বী প্রকৌশলী সৈয়্দ ওয়াসিফুল ইসলাম। চিঠিতে তিনি নিজেকে তাবলীগের ফয়সাল বলেও দাবি করেন। অথচ বাংলাদেশের তাবলীগের প্রধান কার্যালয় কাকরাইলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গত শুক্রবার থেকে চলতি সপ্তাহের ফয়সালের দায়িত্ব পালন করছেন মাওলানা ফারুক। ওয়াসিফের এ চিঠি তাবলীগে ফের বিতর্ক সৃষ্টি করছে বলেও তাবলীগ সংশ্লিষ্ট মনে করেন।

এদিকে ওয়াসিফ যে চিঠি দিয়েছেন তাদের কয়েকজন শুরা সদস্যের স্বাক্ষর জালেরও অভিযোগ উঠেছে। তার চিঠিতে উল্লেখিত ১১ জন শুরা সদস্যদের মধ্যে মাত্র ৪ জনকে শুরা সদস্য হিসেবে পাওয়া যায়। এছাড়া চিঠিতে যুক্ত শূরা সদস্য প্রফেসর ইউনূছ শিকাদারের স্বাক্ষরটি জাল করা হয়েছে বলেও ওয়াসিফের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে।

এ বিষয়ে তাবলীগের শুরা ফয়সাল মাওলানা ফারুক বলেন, গত শুক্রবার থেকে চলতি সপ্তাহে ফয়সালের দায়িত্ব আমাকেই দেয়া হয়েছে। তবুও কেউ যদি এর বাইরে নিজেকে ফয়সাল দাবি করেন, সেক্ষেত্রে আমার বলার কিছু নাই।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মো.আসাদুজ্জামান বলেন, তাবলীগে দুটি অংশ দুইভাবে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। আমরা কারও পক্ষ নিচ্ছি না। আমরা বলে দিয়েছি, আপনারা নিজেরা বসে সিদ্ধান্ত নেন কী করা উচিত। তাদেরকে ভারতের নিজামুদ্দিন ও দেওবন্দে গিয়েও আলোচনা করে আসতে বলেছি। এ নিয়ে তারা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মাদরাসায় বসে বৈঠক করছেন, তাদের বিষয়টি তারাই সিদ্ধান্ত নেবেন।

তবে মাওলানা সাদের বিতর্ককে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ থেকে বিশ্ব ইজতেমা সরিয়ে নেয়ার কোনো ষড়যন্ত্র সফল হবে না বলেও ঢাকার একাধিক তাবলীগের সিনিয়র সদস্যরা জানিয়েছেন। তাদের মতে, কোনো একজন ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে ইজতেমা নিয়ে এ ষড়যন্ত্র বিশ্ব তাবলীগের কেউই মানবেন না।

উল্লেখ্য, এই বছর ১২ জানুয়ারি ও ১৯ জানুয়ারি দুই দফায় তিন দিনব্যাপী বিশ্ব ইজতেমা অনুষ্ঠিত হবে। প্রথম দফায় ১৪ জানুয়ারি ও দ্বিতীয় দফায় ২১ জানুয়ারি আখেরি মোনাজাত অনুষ্ঠিত হবে।

ফেমাসনিউজ২৪ডটকম/এফ/এন