logo

শুক্রবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৭ | ৭ আশ্বিন, ১৪২৪

header-ad

রোহিঙ্গা গণহত্যা: সভ্য যুগে অসভ্যতার হাতছানি

ড. সরদার এম. আনিছুর রহমান | আপডেট: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৭

বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর মধ্যে মায়ানমারের জাতিগত সংঘাত তথা ‘রোহিঙ্গা সঙ্কট’অন্যতম।  বিষয়টি এতোদিন অনেকটা ধামাচাপা দিয়ে রাখা হলেও গত ২৫ আগস্ট থেকে  রাষ্ট্রীয় বাহিনীর নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ শুরু হওয়ার পর তা বিশ্ববাসীর নজরে এসেছে।

জাতিসংঘের তথ্য মতে, ২৫ আগস্ট থেকে এ পর্যন্ত এক হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। এর বেশির ভাগ রোহিঙ্গা। ২লাখ ৭০ হাজার রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী শরণার্থী হয়েছে। এছাড়া বিশ্বের প্রায় সব মানবাধিকার সংস্থা রাখাইনের এ সহিংসতাকে Genocide তথা গণহত্যা হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী দক্ষিণ আফ্রিকার সমাজকর্মী ডেসমন্ড টুটুর মতে, রাখাইনে ‘জাতিগত নির্মূল’ এবং ‘মন্থর গণহত্যা’চলছে।

অক্সফামের মতে, মায়ানমারে বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। সহিংসতা শুরুর পর কত লোক যে নিখোঁজ কিংবা আটকা পড়েছে তা কারো জানা নেই। সেখানে কোনো মানবাধিকার সংস্থা, সাংবাদিক কিংবা সমাজকর্মীদের যেতে দেওয়া হচ্ছে না। ফলে সহজেই অনুমেয় সেখানে কী ধরনের বিভীষিকাময় অবস্থা। পরিস্থিতি বিবেচনায় বলা যায়- এটা একবিংশ শতাব্দীর সভ্য সমাজ্যের অসভ্যতার সবচেয়ে খারাপ নজীর। নিকট অতীতে এ ধরনের দৃষ্টান্ত বিরল।  

বর্তমানে এই সঙ্কট নিয়ে বিশ্বের গুটি কয়েক রাষ্ট্র ছাড়া বাকীরা প্রায় একই সূরে কথা বলছেন। তবে সঙ্কট নিরসনে একেক রাষ্ট্র কিংবা বিশ্বনেতারা একেক ধরনের পন্থার কথা বলছেন। বেশির ভাগই নিন্দা-উদ্বেগের মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকেছেন। অতি সম্প্রতি চোখে পড়ার মতো কার্যকর কোনো পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করতে গেলে তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোগানের কথা বলা যায়। তিনি বাংলাদেশকে ফোন এবং শরণার্থীদের সব ব্যয় বহনের কথা না বললে হয়তো এই হত্যাযজ্ঞে নিহতের সংখ্যা আরো কয়েকগুণ হত। 

এখন আসি মূল সমস্যা এবং তা সমাধানের পন্থায়। অনেকেই বলছেন, মায়ানমারকে চাপ দিয়ে সহিংসতা বন্ধ এবং রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে বাধ্য করতে পারলেই সঙ্কটের সমাধান হয়ে যাবে। এক্ষেত্রে বলবো- যারা এসব বলছেন তারা  সঙ্কটের শেকড়ে না গিয়ে তা বলছেন। আমার মতে এটা সাময়িক পদক্ষেপ হতে পারে কিন্তু স্থায়ী সমাধান নয়।

এবারের সহিংসতাটা বেশ নারকীয় বলে বিশ্ববাসীর নজরে এসেছে কিন্তু প্রতি বছরে যে কয়েকবার সহিংসতা হয়ে থাকে সেগুলো তো আর বিশ্বনেতাদের জানা নেই। আমরা যারা বাংলাদেশে বসবাস করি তা কমবেশি আমাদেরকে স্পর্শ করে।

রোহিঙ্গা ও সঙ্কটের পটভূমি এবং নিপীড়নের দীর্ঘ ইতিহাস: রোহিঙ্গারা পশ্চিম মায়ানমারের রাখাইন স্টেটের উত্তরাংশে বসবাসকারী একটি জনগোষ্ঠী। ধর্মের বিশ্বাসে এরা অধিকাংশই মুসলমান। রাখাইন স্টেটের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ রোহিঙ্গা। সরকারি হিসেবে- আট লাখ রোহিঙ্গা আরাকানে বসবাস করে। রোহিঙ্গারা বর্তমান পৃথিবীর সবচেয়ে নিপীড়িত জনগোষ্ঠীগুলোর একটি। আর পৃথিবীতে যে কয়টি চরমপন্থী রাষ্ট্র আছে এর মধ্যে চরম বৌদ্ধ জাতীয়বাদী রাষ্ট্র মায়ানমার। যার নির্দশন বিশ্ববাসীর কাছে পরিস্কার নারকীয় হত্যাযজ্ঞে।

সরকার রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। দেশটির সরকার ১৩৫টি জাতিগোষ্ঠীকে সংখ্যালঘু জাতি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, রোহিঙ্গারা এই তালিকার অর্ন্তভুক্ত নয়। সরকারের মতে, রোহিঙ্গারা বাংলাদেশি, তারা অবৈধভাবে মায়ানমারে বসবাস করছে। যদিও ইতিহাস বলে, রোহিঙ্গারা মায়ামারের আদি জনগোষ্ঠী এবং কয়েক শতাব্দী ধরে বসবাস তাদের।  

সপ্তম-অষ্টম শতাব্দীতে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর উদ্ভব। প্রাথমিকভাবে মধ্যপ্রাচ্যীয় মুসলমান ও স্থানীয় আরাকানিদের সংমিশ্রণে রোহিঙ্গা জাতির উদ্ভব। পরবর্তীতে চাঁটগাইয়া, রাখাইন, আরাকানি, বার্মিজ, বাঙালি, ভারতীয়, মধ্যপ্রাচ্য, মধ্য এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মানুষদের মিশ্রণে উদ্ভুত এই সংকর জাতি এয়োদশ-চর্তুদশ শতাব্দীতে পূর্ণাঙ্গ জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। পঞ্চদশ শতাব্দী হতে অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের আরাকান রাজ্য নামে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাজ্য ছিল।

রোহিঙ্গা সঙ্কট যেভাবে শুরু: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে রোহিঙ্গাদের অবস্থান ছিল মিত্র বাহিনীর পক্ষে। ১৯৪২ সালের মধ্য জানুয়ারিতে জাপান বার্মা আক্রমণ করে। ১৯৪২-১৯৪৫ সালে বার্মায় জাপানি সেনাদের হাতে অন্তত ১ লাখ ৭০ হাজার থেকে ২ লাখ ৫০ হাজার মানুষ প্রাণ হারায়। তখন প্রায় ৫০ হাজার রোহিঙ্গা প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে চট্টগ্রামে ঢুকেছিল। এছাড়া আরাকানের স্থানীয় রাখাইনদের (বৌদ্ধ মগদের) সঙ্গে এসব উদ্বাস্তু মুসলিম রোহিঙ্গাদের বেশ কিছু দাঙ্গাও হয়েছিল।

১৯৪৬ সালের মে মাসে রাখাইন প্রদেশের মুসলিম রোহিঙ্গা নেতৃবৃন্দ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর সঙ্গে দেখা করেন। তাদের প্রস্তাব ছিল রাখাইন প্রদেশকে পাকিস্তানের সঙ্গে সংযুক্ত করে বুথিডং ও মংদৌ নামে দুটি শহরের একত্রীকরণ। এর দুই মাস পর রোহিঙ্গা মুসলিম নেতৃত্ব আকিয়াবে নর্থ আরাকান মুসলিম লীগ গঠন করে। তখন রোহিঙ্গা মুসলিমরা পাকিস্তানের সঙ্গে আলাদা প্রদেশ হিসেবে বার্মা থেকে আলাদা হওয়ার চেষ্টা করে।

১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি বার্মা ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। কিন্তু রোহিঙ্গাদের এই স্বাধীনতার দাবি ধীরে ধীরে সশস্ত্র সংগ্রামের দিকে যায়। ১৯৬২ সালে বার্মায় সামরিক জান্তা ক্ষমতা দখল করে। ১৯৭৮ সালে জেনারেল নে উইন বার্মার রাখাইন প্রদেশে মুসলিম সশস্ত্র রোহিঙ্গাদের দমন করতে ‘অপারেশন কিং ড্রাগন’পরিচালনা করে। সাড়ে তিন হাজার ফুট উঁচু ভিক্টোরিয়া পাহাড়ের কারণে মায়ানমারের মূল কেন্দ্র থেকে উত্তর-পশ্চিমের রাখাইন প্রদেশ বা আরাকান অঞ্চল কিছুটা বিচ্ছিন্ন।

সরকার রোহিঙ্গাদের নাগরিক হিসেবে স্বীকার না করায় সকল প্রকার নাগরিক ও মৌলিক সুবিধা হতে বঞ্চিত। মায়ানমারে ভ্রমণ, শিক্ষা, চিকিৎসার জন্য পরিচয়পত্র থাকা জরুরি বিষয়। কিন্তু সরকার রোহিঙ্গাদের পরিচয়পত্র ইস্যু করে না, ফলে, এমনিতেই পিছিয়ে পড়া রোহিঙ্গারা আরো পিছিয়ে পড়ছে।

মায়ানমার সরকারের ভূমি ও সম্পত্তি আইন অনুসারে বিদেশিরা কোনো সম্পত্তি ও ভূমি মালিক হতে পারে না। রোহিঙ্গারা সরকারের দৃষ্টিতে অবৈধ অভিবাসী তথা, বিদেশি। তাই, রোহিঙ্গারা কোনো ভূমি বা, স্থায়ী সম্পত্তির মালিক হতে পারে না। বর্তমানে যেসকল ভূমিতে রোহিঙ্গারা বসবাস করছে, সরকার যেকোনো মুহুর্তে সেগুলো দখল করে নিতে পারে।

সরকার আইনের মাধ্যমে রীতিমত অসহনীয় করে তুলেছে রোহিঙ্গাদের জীবন। রোহিঙ্গারা সরকারি চাকরি করতে পারে না, সরকারি কোনো দপ্তরের সেবা পায় না, ব্যাংকে লেনদেন করতে পারে না, চিকিৎসা কেন্দ্রের সেবা গ্রহণ করতে পারে না, উপযোগ সেবার (বিদ্যুত, পানি, জ্বালানী) জন্য আবেদন করতে পারে না, স্বপরিচয়ে শিক্ষা কেন্দ্রগুলোতে ভর্তি হতে পারে না। প্রায় ৮০% রোহিঙ্গা বাস্তবিক অর্থে অশিক্ষিত।

প্রায়ই সরকার কর্তৃক রোহিঙ্গা নিপীড়ণের শিকার। রোহিঙ্গাদের জোরপূর্বক শ্রমিক হিসেবে খাটানো হয়। প্রায়শ স্থানীয় প্রশাসন ও সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের বিভিন্ন লোকালয়ে হানা দেয়। শহরের সৌন্দর্য্য বর্ধন, সরকারি জমি অধিগ্রহণের নামে রোহিঙ্গাদের অনেকগুলো মসজিদ ভেঙে ফেলা হয়। এর মধ্যে প্রাচীন কিছু মসজিদও আছে।

সরকার রোহিঙ্গাদের জন্য ‘গ্যাটো' জাতীয় বিশেষ ধরনের ব্যবস্থা করেছে। রোহিঙ্গাদের জন্য বেশ কয়েকটি বিশেষ বসবাসের স্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছে, যা থেকে ওরা অনুমতি ছাড়া বের হতে পারে না। সেই গ্যাটোগুলোর ভিতরে আবদ্ধ মানবেতর জীবনযাপন করে রোহিঙ্গারা। চিকিৎসা, শিক্ষা ও উপযোগ সেবার ব্যবস্থা এই গ্যাটোগুলোতে থাকলেও, তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল ও নিম্নমানের।

রোহিঙ্গাদের বিয়ে করার জন্যও প্রশাসনের অনুমতি নেয়া লাগে। এছাড়া দুটোর বেশি সন্তান নেয়া রোহিঙ্গাদের জন্য শাস্তিযোগ্য অপরাধ। প্রশাসনের অনুমতি না নিয়ে বিয়ে করায় ও দুজনের বেশি সন্তানের জন্ম দেয়ায় রোহিঙ্গা পরিবারের সন্তানদের মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে।  এসব পরিবারের সন্তানরা সরকারের ‘গ্যাটো ব্যবস্থা' তালিকাভুক্ত নয়, ফলে, এদের জীবন ফোঁড়ার উপরে বিষ ঘা এর মত।

আবার, গ্যাটোর বাইরেও থাকতে পারে না, কারণ, মায়ানমারের নাগরিক নয় ওরা। অবস্থাটা ওদের এমন যে, সরকার ওদের কোনো অস্তিত্বই স্বীকার করে না। এইসব পরিচয়হীন রোহিঙ্গারা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশ, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ডের পথে পা বাড়ায়। নৌপথে সীমান্ত পাড়ি দিতে গিয়ে অসংখ্য রোহিঙ্গা ঢুবে মারা গেছে।

বিগত কয়েক দশক ধরে মায়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদেরকে বাংলাদেশ সীমান্তে পুশ ইন করছে। রুটিনমাফিক নির্যাতন করে রোহিঙ্গাদের বাধ্য করছে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করতে। বর্তমানে সাত লক্ষের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রিত অবস্থায় বসবাস করছে। যদিও রিফিউজি হিসেবে বাংলাদেশে তালিকাভুক্ত রোহিঙ্গাদের সংখ্যা আরো কম।

রোহিঙ্গাদের প্রতি যা করছে মায়ানমার সরকার, তা সমগ্র মানবতার বিরুদ্ধেই অপরাধ। এক হাজার বছরের বেশি সময় ধরে আরাকানে বিকশিত হতে থাকা রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব সুবিধা না দেয়া, গ্যাটো সৃষ্টি করে সেখানে অমানবিক পরিবেশে থাকতে বাধ্য করা, জোরপূর্বক শ্রমে নিয়োগ করা, বিচারবর্হিভূতভাবে গ্রেপ্তার করা, মালিকানাস্বত্ব, সার্বজনীন শিক্ষা, চিকিৎসা, উপযোগ সেবা ও মৌলিক মানবাধিকার হতে বঞ্চিত করার মাধ্যমে নিমর্মতার শেষ সীমানাটুকু অতিক্রম করেছে মায়ানমার সরকার।

সরকারের নিপীড়ণের সাথে নতুন করে যোগ হয়েছে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে রাখাইনসহ অন্যান্য বৌদ্ধ আরাকানীদের উস্কানি দিচ্ছে সরকার। সাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্বে বৌদ্ধ মৌলবাদকে সরাসরি ইন্ধন ও মদদ যোগাচ্ছে সরকার।

এর আগে ২০১২ সালে রোহিঙ্গা ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মধ্যে সহিংসতা শত শত রোহিঙ্গা নিহত হয় এবং প্রায় ১,৪০,০০০ রোহিঙ্গাকে স্থায়ীভাবে বাস্তুচ্যুত করা হয়। রাখাইন রাজ্যে সেনা অভিযানে হাজারো রোহিঙ্গার মৃত্যু হয়েছে। কয়েক দশক ধরে চলা রোহিঙ্গা নির্যাতনের পর এবার মিলছে প্রতিরোধের আভাস। শুধু পালিয়ে বেড়ানো নয়, অস্ত্র হাতে রুখে দাঁড়াচ্ছেন রোহিঙ্গারা।

২৫ আগস্ট ভোরে বিদ্রোহীরা অন্তত ৩০টি পুলিশ ও সেনা ঘাঁটিতে হামলা চালায়। আইনশৃংখলা বাহিনীর অন্তত ১২ জন সদস্য তাতে নিহত হন। এরপর থেকে রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গা অধ্যুষিত বিভিন্ন এলাকায় শুরু হয় গণহত্যা, নিপীড়ন ও নির্যাতন। সীমানা পেরিয়ে আবারো দলে দলে বাংলাদেশে আসতে শুরু করে রোহিঙ্গারা। তবে বরাবরের মতোই বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ফেরত পাঠাচ্ছে রোহিঙ্গাদের। ফলে নো ম্যানস ল্যান্ডে আটকা পড়েছে হাজারো রোহিঙ্গা।

তবে এবার শরণার্থীদের ঢলে একটু পরিবর্তন দেখছেন বিজিবি সদস্যরাও। অন্যান্যবার পুরো পরিবারসহ রোহিঙ্গারা পালিয়ে এলেও এবার শরণার্থীদের দলে পুরুষদের সংখ্যা একেবারেই কম বলে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এএফপিকে জানিয়েছেন বিজিবি কর্মকর্তারা।‘পুরুষদের কী হয়েছে, আমরা তাদের (রোহিঙ্গা নারীদের) জিজ্ঞেস করেছিলাম। আমাদের জানানো হয়েছে লড়াই করার জন্য পুরুষরা রয়ে গেছে’ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন এফপিকে।

আরাকান রোহিঙ্গা সলিডারিটি আর্মি (এআরএসএ)। হামলার দায় স্বীকারের পর থেকেই আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে পরিচিত হয়ে উঠেছে এআরএসএ। দীর্ঘদিন ধরে জাতিগত নির্যাতনের শিকার হলেও সাধারণ রোহিঙ্গারা এতদিন সহিংসতা এড়িয়ে চলছিল। কিন্তু গত বছরের অক্টোবরে এবং চলমান সেনা অভিযানের পর সাধারণ রোহিঙ্গারাও হাতে তুলে নিচ্ছেন অস্ত্র।

সীমান্তে আসা রোহিঙ্গা নেতা শাহ আলম জানান, আশেপাশের তিন গ্রাম থেকে অন্তত ৩০ জন যুবক ‘স্বাধীনতার যুদ্ধে’ যোগ দিয়েছে এআরএসএতে। তিনি প্রশ্ন করেন, ‘তাদের কীই বা করার ছিল! পশুর মতো খুন হওয়ার চেয়ে লড়াই করে মারা যাওয়ার পথ বেছে নিয়েছেন তারা।’

মায়ানমারের নেতা অং সান সুচি এআরএসএকে জঙ্গি ও সন্ত্রাসী সংগঠন বলে উল্লেখ করেছেন। সংগঠনটির বিরুদ্ধে শিশু যোদ্ধা ব্যবহারের অভিযোগও করেছেন তিনি। তবে এআরএসএ এ ধরনের অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছে। আনুষ্ঠানিকভাবেই এখন বিশ্বজুড়ে এআরএসএকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে পরিচিত করানোর উদ্যোগ নিয়েছে মায়ানমার সরকার। কঠোর বিবৃতি এবং এআরএসএর গুলিতে নিহত বেসামরিক নাগরিকদের ছবি প্রকাশ করে বিশ্বে জনমত গড়ে তোলারও চেষ্টা চালাচ্ছে মায়ানমার। কিন্তু পালটা প্রচার চালাচ্ছে এআরএসএ-ও। শুধু মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যেই নয়, বাংলাদেশের বিভিন্ন শরণার্থী ক্যাম্পে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের কাছেও পৌঁছে গেছে যুদ্ধের ডাক।

এআরএসএ বিদ্রোহীদের ভারী অস্ত্র বলতে কিছুই নেই। এ পর্যন্ত বিভিন্ন হামলায় ব্যবহার করা হয়েছে ছুরি, ঘরে তৈরি বোমা এবং আগ্নেয়াস্ত্র। ফলে মায়ানমারের সুসজ্জিত সেনাবাহিনীর সাথে যুদ্ধে কতটুকু টিকতে পারবে বিদ্রোহীরা, সে সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে।কিন্তু তাতে দমছেন না রোহিঙ্গারা। ‘আমাদের শত শত যোদ্ধা পাহাড়ে অবস্থান নিয়েছে। আমরা আরাকানকে রক্ষায় শপথ নিয়েছি, সেটা চাকু এবং লাঠি দিয়ে হলেও আমরা করবো,’ সীমান্তে এএফপিকে জানিয়েছেন এক রোহিঙ্গা যোদ্ধা।

কুতুপালং ক্যাম্পে এক রোহিঙ্গা যুবকের মন্তব্য ছিল এমন - ‘আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। আমাদের তরুণরাও চিন্তা করছে যুদ্ধে যোগ দেয়ার। আমরা প্রতিজ্ঞা করেছি, প্রথম সুযোগেই আমরা সীমান্ত অতিক্রম করবো।’

হাজেরা বেগমের তিন ছেলেকে নিয়ে গত মাসে সীমানা অতিক্রম করে বাংলাদেশে এসেছেন। তাঁর আরো দুই ছেলে রয়ে গেছেন যুদ্ধ করবেন বলে। বাংলাদেশে আসার এক সপ্তাহের মধ্যে তার আরেক ছেলেও যোগ দেন লড়াইয়ে।

এএফপিকে তিনি বলেন,‘ওরা (মায়ানমার সেনাবাহিনী) আমাদের এমনিতেই মারবে। এরা (এআরএসএ) আমাদের অধিকারের জন্য লড়াই করছে। আমি আমার ছেলেদের পাঠিয়েছি স্বাধীনতার জন্য লড়াই করতে।’তিনি বলেন, ‘আমি তাদের উৎসর্গ করেছি, আরাকানের জন্য।'

এতে সহজেই অনুমেয় সঙ্কটটা কত গভীরে। এরই মধ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়ন চালানোর যেসব প্রমাণ পাওয়া গেছে তাতে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, মায়ানমার সামরিক বাহিনী রোহিঙ্গাদের মতো একটি নিরস্ত্র সংখ্যালঘুর ওপর সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালাচ্ছে। অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে হত্যা, ধর্ষণ ও জীবিকার প্রধান মাধ্যম মাছ ধরতে না দেয়ার অর্থই হচ্ছে পৈতৃক ভিটা থেকে তাদের উচ্ছেদ করা।

মায়ানমারে রোহিঙ্গাদের মৌলিক অধিকারগুলোও হরণ করা হয়েছে। এমনকি গত নির্বাচনে শত শত রোহিঙ্গা মুসলিমকে ভোটের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়। ২৫ আগস্ট নতুন করে যে আক্রমণ চালানো হয়, তাতে হাজার হাজার রোহিঙ্গা পার্শ্ববর্তী দেশ বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া ও চীনে পালিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত এই সঙ্কট নিরসনে কঠোর শান্তিপূর্ণ পদক্ষেপের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের সমর্থন দেয়া। এর একটি হচ্ছে রোহিঙ্গাদের জন্য রাখাইনে স্বাধীন ‘আরাকান’ রাষ্ট্র গঠন করা। সেই সঙ্গে মায়ানমারের রোহিঙ্গা নীতির উন্নতির জন্য দেশটির সরকারের ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করা যেতে পারে।  অন্যথা, দক্ষিণ এশিয়া আরো অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে। আর সেটি হলে বিশ্বকে যে কঠোর মাশুল গুনতে হবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

সবশেষে বলবো, ইতিপূর্বে যেভাবে খ্রিস্টান সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ার অজুহাতে ২০০২ সালের ২০শে মে ইন্দোনেশিয়া থেকে পূর্ব তিমুরকে এবং ২০১১ সালের ৯ জুলাই সূদান থেকে দক্ষিণ সূদানকে জাতিসংঘ কর্তৃক পৃথক রাষ্ট্র ঘোষণা করা হয়েছে, সেভাবে মুসলিম সংখ্যাগুরু হওয়ার কারণে অতীতের ন্যায় আরাকানকে পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্র ঘোষণা করা হোক।আর জাতিসংঘ এমনটি না করলেও দেরিতে হলেও আরাকান যে একদিন স্বাধীন হবে এতে কোনো সন্দেহ। পৃথিবীর রক্ত জড়ানো সকল জনপদই স্বাধীন হয়েছে আরাকান হবে। এজন্য অবশ্য নিপীড়িত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে আরো কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে হবে।

লেখক: শিক্ষা, সমাজ ও রাজনীতিবিষয়ক গবেষক। ই-মেইল: [email protected] 

ফেমাসনিউজ২৪/এমএইচ/আরকে