logo

শুক্রবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৭ | ৭ আশ্বিন, ১৪২৪

header-ad

প্রধানমন্ত্রী মিয়ানমারের বিরুদ্বে নিন্দা প্রস্তাব গ্রহণ করুন

আদম মালেক | আপডেট: ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৭

রোহিঙ্গা নিধন চলছে। নাফ নদীতে ভাসছে লাশ। লম্বা হচ্ছে লাশের মিছিল। তাদের জানাযা ছাড়াই দলে দলে দেশ ছেড়ে যাচ্ছে স্বজনরা। লাশের কাছেও যায়নি জাতিপুঞ্জ। গোপন করল গণহত্যার নির্মমতা। আড়াল করে রাখল রোহিঙ্গাদের গণকবর। তাদের সমর্পণ করল হত্যাকাণ্ডের ক্রীড়নকদের পদতলে। এদেরই বানিয়ে রাখল গণকবরের দ্বাররক্ষী।

গত ২৪ আগস্ট থেকে আবারও মিয়ানমারের রাখাইনে রোহিঙ্গা মুসলিম নির্মূল অভিযানে নেমেছে শান্তিতে নোবেলবিজয়ী মিয়ানমারের জাতীয় উপদেষ্টা অং সান সু চির প্রশাসন। এই নৃশংসতায় বিক্ষুব্ধ পৃথিবীর নানা প্রান্তের মানুষ। রাজপথে চলছে মিছিল-সমাবেশ। হত্যা বন্ধের জন্য সু চির প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা।

তবুও টনক নড়েনি অং সান সু চির। তিনি গণহত্যা বন্ধের নির্দেশতো দূরের কথা তার বিরোধীতাও করেননি, উল্টো দুষেছেন নির্যাতিত রোহিঙ্গা মুসলিম ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে। তিনি বলেছেন, বাঙালি বিদ্রোহীদের আক্রমণের মুখে সেনা অভিযান শুরু হয়েছে। এ অভিযানকে তিনি অভিনন্দন জানিয়েছেন এবং বলেছেন, গণমাধ্যমের মিথ্যা প্রচারণার জন্য রাখাইনে উত্তেজনা। এর আগেও আন্তর্জাতিক মহলের ‘নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি’ মিয়ানমারের সংখ্যাগুরুবৌদ্ধ ও রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের মধ্যে উত্তেজনা বাড়িয়ে দিচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। সে সময় সু চির অভিযোগের তীরে বিদ্ধ হয়েছিল আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। বিশ্বসম্প্রদায়ের সদস্য হিসেবে তার অভিযোগের বিষমাখা ছুরি থেকে মুক্তি মেলেনি বাংলাদেশেরও। সু চির বিষবাক্য সহ্য করেছিল বাংলাদেশ। তারা নিন্দা জানায়নি মিয়ানমারে সু চি সরকারের গণহত্যা ও তার ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্যের বিরুদ্ধে। অথচ ঢাকার হলি আর্টিজানে ২২ জন নিহত হওয়ার ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন। নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে রাশিয়া ও কানাডাসহ বিভিন্ন দেশ। নিন্দা জানাতে ভুলেননি ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মূখার্জি।

অথচ মিয়ানমারে গেল মাস থেকে পুনরায় শুরু হওয়া গণহত্যায় পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সরকারি পর্যায়ে একমাত্র ইন্দোনেশিয়া ও তুরস্ক ছাড়া বিশ্বমোড়ল তো দূরের কথা বাংলাদেশ সরকার মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কোনো নিন্দা প্রস্তাব আনেনি। ভারতের নরেন্দ্র মোদি মিয়ানমার সফরে গিয়ে সন্ত্রস দমনের নামে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা নির্মুল অভিযানের প্রতি তার সমর্থন ব্যক্ত করেছেন। এ পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান, মিয়ানমারের বিরুদ্ধে একটি নিন্দা প্রস্তাব গ্রহণ করুন। মিয়ানমার এমন কোনো পরাশক্তি নয় যে দেশটির বিরুদ্ধে নিন্দা জানানোর শক্তি বাংলাদেশের নেই। গুটিকয়েক প্রাণী ছাড়া বাংলাদেশের বৃহৎ রাজনৈতিক দল ও জনগণ আপনার পাশে রয়েছে। বিজিবি’র সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) আ ল ম ফজলুর রহমান বাংলাদেশে পালিয়ে আসা ২ লাখ রোহিঙ্গাকে সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়ে মিয়ানমারে পাঠানো দরকার বলে মনে করছেন। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া রোহিঙ্গাদের জন্য সীমান্ত খুলে দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। দলটির যুগ্মমহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আপনার বিরুদ্ধে মুসলিম বিদ্বেষের অভিযোগ এনেছেন। অং সান সু চির বিরুদ্ধে নিন্দা জানিয়ে নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেছেন, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, মালদ্বীপসহ বিভিন্ন রাষ্ট্র রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। তুরস্কের ফার্স্ট লেডি শরণার্থীশিবির সফর করে গেছেন। কিন্তু দেশের সরকারপ্রধান এখনো পরিস্থিতি দেখতে যাননি। নিন্দা জানিয়েছে বাংলাদেশের সম্মিলিত বৌদ্ধ সমাজ, বাংলাদেশ জাতীয় মানবাধিকার কমিশন। নিন্দা জানাতে ভুলেনি কমিউনিস্ট পার্টি ও বাসদ।

দিন দিন রোহিঙ্গাদের জন্য সীমান্ত উন্মুক্ত করে দেয়ার দাবি জোরালো হয়ে উঠলেও রোহিঙ্গাদের আশ্রয়দানের বিরোধীতা করেছে একশ্রেণীর খুদ-কুঁড়া খাওয়া বুদ্ধিজীবি। এরা সুযোগ পেলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছেন। যেখানে অনেক পরে হলেও জাতিসংঘসহ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রোহিঙ্গা নির্যাতনের কারণে সমালোচনায় পড়েছে মিয়ানমার সরকার সেখানে আমাদের দেশের একশ্রেণীর বুদ্ধিজীবি রোহিঙ্গাদের মাঝে ধর্মান্ধতা, উগ্রবাদ আর জঙ্গিপনা আবিষ্কারে ব্যস্ত। এর কারণ জঙ্গিবাদের তকমা লাগিয়ে মুসলিম বিরোধীতাও কারও কারও কাছে একধরনের ফ্যাশন। কেউবা তাদের মাঝে খুঁজে বেড়ায় মাদক চোরাচালান ও সামাজিক অস্থিরতাসহ নানা ধরনের অপরাধমূলক উপসর্গ। মানবতা য়েখানে বিপন্ন সেখানে বেপরোয় কি নিরিহ হিন্দু কি মুসলিম বৌদ্ধ কি খৃস্টান আস্তিক কি নাস্তিক আল্লাওয়ালা কি নিরীশ্বরবাদী তা অনেকের কাছে বড় প্রশ্ন নয়। প্রশ্ন হল এরা দুনিয়ার সবচেয়ে নির্যাতিত মানুষ। তাই এই মূহূর্তে স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার অজুহাতে নিজেদের মহান দেশপ্রেমিকের আসনে বসিয়ে রোহিঙ্গাদের বিচারের জন্য তাদের দোষত্রুটি আবিসষ্কারের চেয়ে তাদের সঙ্গে মানবিক আচরণ অনেক জরুরি। তারা এ পৃথিবীর সন্তান ও আরাকানের ভূমিপুত্র। নিজ দেশে তারা পরবাসী। একদিন তারা স্বাধীন ছিলেন। জীবনের ভাঙা-গড়ার খেলায় তাদের আরাকান রাজ্য আজ মিয়ানমারের উপনিবেশ। কিন্তু উপনিবেশের বাসিন্দা হিসেবে বৃটিশ সরকারের কাছে আমাদের যে অধিকার ছিল মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের সে অধিকারটুকুও নেই। মিয়ানমার সরকার আরাকানের রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব বাতিল করে। তারা দেশের নামটিও কেড়ে নিয়েছে। আরাকানের পরিবর্তে দেশটির নাম রাখে রাখাইন। মিয়ানমার সরকারের অনুমতি ছাড়া রোহিঙ্গারা বিয়ে করতে পারে না। দুয়ের অধিক সন্তান গ্রহণ নিষিদ্ধ। রাখাইন রাজ্য থেকে বের হওয়ার কোনো সুযোগ তাদের নেই। লেখাপড়া, চাকরি ও বাণিজ্যে তাদের সুযোগ নেই। এর ওপর রয়েছে মিয়ানমার সরকারের নিয়মিত রোহিঙ্গা মুসলিম নির্মূল অভিযান। সীমাহীন অত্যাচারে রাষ্ট্রহীন এই জাতির সন্তানেরা তাদের অস্তমিত নাগরিক অধিকার পুনরুদ্ধারের জন্য মায়ানমারের সরকারি বাহিনীর ওপর আক্রমণ চালায় বলে অনেকে মনে করছেন। মিয়ানমার সরকার ও আমাদের দেশের কিছু বুদ্ধিজীবিদের ভাষায় অস্তিত্ব রক্ষার আন্দোলনে নিয়োজিত সশস্ত্র যোদ্ধারা এখন সন্ত্রাসী। এরা পাকিস্তানী রাজাকারের ভাষায় কথা বলছে। ১৯৭১ সালে পাকিস্তান সরকার ও তাদের দোসরের চোখে আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা ছিল সন্ত্রাসী। অভিযোগ ছিল, ভারতের উস্কানিতেই তারা দেশে অরাজকতা করছে। তেমনিভাবে পাকিস্তানের যোগসাজশে আরাকানের সশস্ত্র যোদ্ধারা রাখাইন রাজ্যে অস্থিরতা সৃষ্টি করছে-এহেন অজুহাতে বর্তমান রাজাকাররা মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বর্বরোচিত হামলাকে বৈধতা দিচ্ছে। এরা বর্মী সেনাবাহিনীর রোহিঙ্গা নির্যাতন প্রকাশের পরিবর্তে গণহত্যার হোতা সু চি সরকারের ভাবমূর্তি উজ্জল প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব হাতে নিয়েছে। তারা মজলুমকে বানায় দানব আর রক্তপিপাসু জানোয়ারকে বানায় মহামানব। তাই পত্রপত্রিকায় রোহিঙ্গা নির্যাতনের প্রকাশিত খবর ও ছবি তারা ভুয়া বলে উড়িয়ে দেয়। রোহিঙ্গাদের রক্তগঙ্গায় মানবতার শত্রুরা খুঁজে বেড়ায় জঙ্গিবাদের কারখানা। তাদের নজরে আসেনি বার্মার সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে পরিচালিত ওই হামলায় রয়েছে রোহিঙ্গা জাতির মুক্তির অদম্য বাসনা। হামলায় জড়িত যুবকেরা সন্ত্রাসী নয় তারা নিপীড়িত রোহিঙ্গা জাতির সূর্য সন্তান। তাদেরকে স্যালুট।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, ২৫ আগস্টের মিয়ানমারের সেনা চৌকিতে হামলা নিছক কোনো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নয়। ওই হামলায় রয়েছে রোহিঙ্গা জাতির মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। ওই ঘটনায় জড়িতরা সন্ত্রাসী নয় তারা রোহিঙ্গা জাতির বীরসন্তান। তাদের মুক্তির স্বপ্নকে অসম্মান করার অধিকার কাহারও নেই।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, ৭১-এ আমরা যখন পাকিস্তান দ্বারা আক্রান্ত হয়েছি তখন ভারত আমাদের পাকিস্তান হানাদারবাহিনীর হাতে তুলে দেয়নি বরং সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছিল। সে সময় ভারত আমাদের আশ্রয় দিয়েছে, ট্রেনিং দিয়েছে, অস্ত্র দিয়েছে, সৈন্য দিয়েছে। ভারতীয় সৈন্যরা আমাদের জন্য জীবনও দিয়েছে।

তাই বলছি প্রধানমন্ত্রী ভারতের মতো রোহিঙ্গাদের সাহায্য করার জন্য বাংলাদেশের সামর্থ্য নিয়ে কারও কারও প্রশ্ন থাকতে পারে। তবে গণহত্যার বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশের দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মুক্তিকামী বীর রোহিঙ্গা লড়াকুদের সন্ত্রাসের অভিযোগে মিয়ানমার পুলিশের হাতে তুলে দেয়ার হুমকি দুঃখজনক। বিদ্যমান বাস্তবতায় গণহত্যা ও রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেয়ার অপরাধে অং সান সু চির প্রশাসনের বিরুদ্ধে সংসদে একটি নিন্দা প্রস্তাব গ্রহণের জন্য আবারও আহ্বান জানাচ্ছি। যদি নিন্দা জানানোর মতো শক্তি নেই বলে মনে করেন তাহলে অন্তত রেহিঙ্গা মুসলিমদের জন্য কাঁদুন।

(লেখকের ব্যক্তিগত মতামত। ফেমাসনিউজ কর্তৃপক্ষ দায়ি নয়)

ফেমাসনিউজ২৪/আরআর/আরইউ