logo

বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২০ | ৬ কার্তিক, ১৪২৭

header-ad

“ষোড়শ সংশোধনী: আইন, রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট”

ব্যারিস্টার এবিএম আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ বাশার | আপডেট: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৭

সাতজন মাননীয় বিচারপতির ঐক্যমতের ভিত্তিতে দেওয়া (৭৯৯ পৃষ্ঠার) ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় আপিল বিভাগ বহাল ঘোষণার পর চূড়ান্ত রায়ে এ মামলার মূল বিষয় উচ্চ আদালতের বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা। মামলার ‘ফ্যাক্ট অব ইস্যুর’ সঙ্গে সম্পর্কিত নয় এমন ‘অনেক অপ্রাসঙ্গিক কথা’ প্রধান বিচারপতি তার পর্যবেক্ষণে বলেছেন। বিচারপতি মোহাম্মদ আবদুর রশিদের মতে, “এটা মানতে হবে যে, আপিল বিভাগের ওই রায় পুরো বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করেছে। পুরো জাতি এখন প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে, ক্ষোভ প্রকাশ করছে, যার যার মত করে অভিযোগ করছে।” Lord Denning এর ভাষায়, Justice is not clastered virtue, it must face the criticism of the people. তাই জনসাধারণ এই রায়ের মূল্যায়ন ও বিশ্লেষণ করবে এটাই স্বাভাবিক।

বাংলাদেশে ষোড়শ সংশোধনীর ৯৬(২) অনুচ্ছেদে বলা আছে, ‘প্রমাণিত অসদাচরণ বা অসামর্থ্যের কারণে সংসদের মোট সদস্যসংখ্যার অন্যূন দুই-তৃতীয়াংশ গরিষ্ঠতার দ্বারা সমর্থিত সংসদের প্রস্তাবক্রমে প্রদত্ত রাষ্ট্রপতির আদেশ ব্যতীত কোনো বিচারককে অপসারণ করা যাবে না। আর ৯৬(৩) অনুচ্ছেদের বিধান অনুযায়ী কোনো বিচারকের অসদাচরণ বা অসামর্থ্য সম্পর্কে তদন্ত ও প্রমাণের পদ্ধতি সংসদ আইনের দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। সহজ অর্থ হলো কোনো বিচারকের বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগ উঠলে তা তদন্ত কমিটি তদন্ত করবে। তদন্তে অসদাচরণ প্রমাণিত হলে তা সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার দ্বারা সমর্থিত হতে হবে। এরপর পাসকৃত প্রস্তাব রাষ্ট্রপতির আদেশ দ্বারা অনুমোদিত হতে হবে, তবেই বিচারপতি অপসারিত হবেন। সংসদের অপসারণের বিরুদ্ধে তিন স্তরের রক্ষাকবচ রয়েছে, যা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল দ্বারা অপসারণের ক্ষেত্রে নেই। তদন্তে প্রমাণিত না হলে তা সংসদের কাছে যাবেই না। তদন্তের ক্ষেত্রে আইনটি যদি এমন করা হতো যে তদন্ত কমিটির প্রধান থাকবেন প্রধান বিচারপতি ও অন্যান্য জ্যেষ্ঠ বিচারপতি, তাহলে অবিচার কিভাবে হতো? আইন প্রণয়নের আগেই তো সংশোধনী বাতিল হলো।

বিংহ্যাম সেন্টার ফর দ্য রুল অব ল এর গবেষণায় কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর বিচারক নিয়োগ ও অপসারণ-সংক্রান্ত ড. ইয়ান ফান সেইল স্মিটের রচিত ২৫২ পৃষ্ঠার একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। বর্তমানে বিচারক অপসারণে ১৮টি কমনওয়েলথ দেশে সংসদীয় অপসারণ পদ্ধতি বহাল রয়েছে বলে উল্লেখ থাকলেও জাতিসংঘ সদস্য রাষ্ট্র বিষয়ক তথ্য তাদের জানা নাই। কিন্তু কমনওয়েলথের মূল দেশ ব্রিটেন, আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিন আফ্রিকা ও ভারতের মত উল্লেখযোগ্য দেশে সংসদীয় অপসারণ পদ্ধতি বহাল রয়েছে। অপরদিকে কাউন্সিল বা ট্রাইব্যুনাল ব্যবস্থা রয়েছে বারমুডা, ত্রিনিদাদ টবাকো ও ইরিত্রিয়ার মত অপরিচিত অতিক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলোতে! আর রয়েছে পাকিস্তানে। উল্লেখ্য যে, ১৯৫৬ সালের পাকিস্তান সংবিধানে সংসদের কাছেই ক্ষমতা ছিল, পরবর্তীতে ১৯৬২ সালে জেনারেল আইয়ুব খান কাউন্সিল গঠন করেন। একইরুপে, আমাদের গণপরিষদ যে ধারা করে দিয়েছে; সেটা থাকবে না বরং জেনারেল জিয়াউর রহমান অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে মার্শাল ল’ অর্ডিনেন্সের মাধ্যমে যে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল করেছে; সেটা থাকবে!

ভারতে সংসদীয় শাসনব্যবস্থা চালু রয়েছে। ভারতে সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্টের বিচারপতিদের সে দেশের পার্লামেন্ট অযোগ্যতা এবং অসদাচরণের জন্য বরখাস্ত করতে পারে। ভারতে জাজেস এনকোয়ারি অ্যাক্ট ১৯৬৮ অনুসারে এই তদন্ত করে থাকে তিন সদস্যের একটি কমিটি, যার দুজন সদস্য থাকবে উচ্চ আদালতের বিচারক। তবে এই বরখাস্ত করতে হলে রাজ্যসভা ও লোকসভায় ওই বিচারপতির বিরুদ্ধে কম করে থাকতে হয় দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের ভোট। আমাদের গণতন্ত্রের ধ্যান-ধারণা লাভ করেছে ব্রিটেনের কাছ থেকে। বিলাতে হাইকোর্ট অব দি পার্লামেন্ট বলতে বোঝায়, রাজা বা রানি, লর্ডস সভা এবং কমন্স সভা সমন্বয়ে গঠিত পার্লামেন্টকে। ১৭০১ সালে ‘দ্য অ্যাক্ট অব সেটেলমেন্ট’ আইন মতে, পার্লামেন্টের উভয় কক্ষে প্রস্তাবের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত পাস না হওয়া পর্যন্ত কোনো বিচারককে রাজা অপসারণ করতে পারবেন না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হলো প্রেসিডেন্ট-নির্ভর গণতন্ত্র। মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের কোনো বিচারকের বিরুদ্ধে যদি অযোগ্যতা অথবা অসদাচরণের অভিযোগ ওঠে হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভে এবং তা সিনেটে কম করে দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের ভোটে স্বীকৃত হয়, তবে ওই বিচারককে হতে হয় চাকরিচ্যুত। সংসদীয় ব্যবস্থায় শ্রীলংকায় সুপ্রিম কোর্টের বিচারকের অভিযোগের বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। বিপত্তি ঘটে ২০১৩ সালে শ্রীলঙ্কার প্রধান বিচারপতি ছিলেন শিরানি বন্দরনায়েরের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এনে প্রেসিডেন্ট রাজাপক্ষে সরকার অপসারণ করে। পরে শ্রীলঙ্কার নির্বাচিত সরকার তাঁকে পুনঃনিয়োগের মধ্য দিয়ে ওই অপসারণ প্রক্রিয়ার অসাংবিধানিকতাকে স্বীকৃতি দেন। এই বিষয়গুলো যে রায়ে বিশেষভাবে বিবেচ্য ছিল তা বলাই বাহুল্য।

বাংলাদেশে ১৯৭২ সাল থেকে ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টের কোনো বিচারককে অপসারণ করা না হলেও পরবর্তীতে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে না নিয়ে বিচারকদের চাকরি থেকে অপসারণ করার ইতিহাস রয়েছে, বিচারপতি আবদুর রহমান চৌধুরী, বিচারপতি এসএম হোসেন, বিচারপতি কেএম সোবহানকে অপসারণ করা হয়েছিল। বিচারপতি সহিদুর রহমানের ব্যাপারে কাউন্সিলের কোন রায় আসেনি, তিনি পদত্যাগ করেন। বিচারপতি ফয়সল মাহমুদ ফায়েজির বিষয়েও কাউন্সিল সিদ্ধান্ত শেষ করেনি। এমনকি পরবর্তীতে কিছু ডিসিপ্লিনারী বিষয়ে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল বসেও ছিল কিন্তু এর পরিণতি অজানা রয়ে যায়।

ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ে যেমন আইনগত যুক্তি প্রদর্শন করা হয়েছে তেমনি বিশ্লেষকগণও তা খণ্ডন করছেন। আইন কমিশনের চেয়ারম্যান সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক রায়ের কিছু আইনগত ব্যাখ্যাও প্রদান করেছেন।

১. রায়ে পাকিস্তান আমলে সামরিক শাসনকালে করা ‘মুসলিম ফ্যামিলি ল’কে গ্রহণের যুক্তি দেখিয়ে সামরিক শাসন আমলে করা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গ্রহণের যুক্তি দেওয়া হয়েছে। ‘মুসলিম ফ্যামিলি ল’ টিকে যাওয়ার কারণ যেদিন স্বাধীনতার ঘোষণপত্র গৃহীত হয়, সেদিন আইনের ধারাবাহিকতার রক্ষার সিদ্ধান্তও হয়। পরে ১৫২ অনুচ্ছেদে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে, আইনের ধারাবাহিকতাকে বৈধতা দেওয়া হয়।

২. রায়ের যুক্তিতে সামরিক শাসন আমলে যোগ করা ‘বিসমিল্লাহ’ এবং রাষ্ট্র ধর্ম রেখে দেওয়ার উল্লেখ করাকেও অপ্রাসঙ্গিক। সামরিক শাসন আমলে অবশ্যই বেআইনিভাবেই এটা করা হয়েছে। সেটা সপ্তম সংশোধনী বাতিলের রায়ে অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। প্রশ্ন এসেছে, তাহলে পঞ্চদশ সংশোধনীতে ঢোকানো হলো কেন? এই দুইটা কিন্তু আগের ফর্মে এখন আর নেই।

৩. রায়ে ৭০ অনুচ্ছেদকে উল্লেখ করে যুক্তি হিসাবে দেখানো হয়, সংসদ সদস্যরা দলের বিরুদ্ধে ভোট দিতে পারেন না ফলে বিচারপতিদের অপসারণ প্রক্রিয়া ঝুকিতে পড়বে। এটা সব সময় প্রয়োগযোগ্য না। এখানে বলা হচ্ছে, দলের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়া যাবে না।

৪. অষ্টম সংশোধনী বাতিলের রায়ে বলা হয় বিচার বিভাগ স্বাধীন এবং পঞ্চদশ সংশোধনীতেও তা বহাল রাখা হয়। তবুও বিচারকদের অপসারণ সম্পর্কিত ৯৬ অনুচ্ছেদ সংবিধানের বেসিক স্ট্রাকচার বা মৌলিক কাঠামোর অংশ নয়। সংবিধানের সপ্তম অনুচ্ছেদ, ‘…সংবিধান প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন এবং অন্য কোন আইন যদি এই সংবিধানের সহিত অসামঞ্জস্য হয়, তা হইলে সেই আইনের যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ, ততখানি বাতিল হইবে।’ ষোড়শ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে নতুন কিছু অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি বরং বাহাত্তরের মূল যা ছিল সেটিই কেবল পুনঃস্থাপিত করা হয়েছে। অতএব এটি সংশোধনযোগ্য।

৫. নিম্ন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলাবিধানের ক্ষমতা সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতিকে দেওয়া হয়েছে। ওই অনুচ্ছেদ সংবিধানের ১০৯ অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে এই রায়ের পর্যবেক্ষণে মত দিয়েছেন প্রধান বিচারপতি। রাষ্ট্রপতিরও ক্ষমতা কমিয়ে প্রধান বিচারপতির ক্ষমতা বাড়নো এ পর্যবেক্ষণ দেখে মনে হয়েছে যে ওই রায় ‘যুক্তিতাড়িত নয়, বরং আবেগ তাড়িত।

মনে রাখতে হবে যে, সংবিধানের কোনো একটি অংশ বাতিল বা সংযোজন-বিয়োজনের কাজটি ১৪২ অনুচ্ছেদের বিধান অনুযায়ী করতে পারে কেবলমাত্র সংসদ।

এই রায়ে প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা নিজের পর্যবেক্ষণের অংশে দেশের রাজনীতি, সামরিক শাসন, নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি, সুশাসন ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে সমালোচনা করেন। তিনি দেশের রাজনীতিতে ‘আমি’ ও ‘আমিত্বে’র সংস্কৃতির সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, আমরা যদি সত্যিই জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলায় বাঁচতে চাই তাহলে এই আমিত্বর আসক্তি, আত্মঘাতী উচ্চাভিলাষ থেকে আমাদের মুক্ত থাকতে হবে। এই আমিত্ব হলো কেবল এক ব্যক্তি বা একজন মানুষ সবকিছুই করতে পারেন এমন ভাবনা।প্রধান বিচারপতি রায়ের আরেক জায়গায় বলেছেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা কোনো একক ব্যক্তির কারণে হয় নাই। তার এই বক্তব্যে সবাই মর্মাহত। কিন্তু ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত বাঙালির স্বাধীনতার লড়াইয়ে বঙ্গবন্ধুর অবদানের কথা স্মরণ থাকা উচিত। আজ স্বাধীনতার ৪৭ বছর পর এই বাস্তব সত্যকে পুনরাবৃত্তি করতে হচ্ছে, সেটাই আমাদের জন্য অনেক কষ্টের এবং লজ্জার।

অন্যত্র রায়ে বলা হয়, ‘সংসদ যদি যথেষ্ট পরিপক্কতা অর্জন না করে তাহলে উচ্চ আদালতের বিচারকদের অপসারণ করার ক্ষমতা সংসদের কাছে ন্যস্ত করা হবে একটি আত্মঘাতী উদ্যোগ’। ভারসাম্যের অভাবে সরকার অনিয়ন্ত্রিত হয়ে যাচ্ছে বলেও মত আসে রায়ের পর্যবেক্ষণে। প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রে জনগণের পক্ষ থেকে সংসদ অভিভাবকত্ব করে থাকেন। অনির্বাচিত নারীরা সেখানে বসতে পারছে। রায়ে সংসদ সদস্যদের ‘অজ্ঞ’ বলা হয়েছে। অথচ বিচারপতিদের বেতন সংসদ দেয়। আবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হচ্ছে পার্লামেন্টের মেম্বার দ্বারা। সংসদ সদস্যরাই রাষ্ট্রপতিকে নির্বাচন করেন। আর সেই রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দেন প্রধান বিচারপতিকে। সংসদকে প্রশ্নবিদ্ধ করলে রাষ্ট্রপতির নিয়োগও প্রশ্নবিদ্ধ আর রাষ্ট্রপতি কর্তৃক প্রধান বিচারপতির নিয়োগও প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে! Lord Acton বলেছিলেন “Power tends to corrupt and absolute power corrupts absolutely.” এই রায়ে অতীতের সংবিধান সংশোধন, সামরিক শাসন ও গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা নিয়ে কিছু পর্যবেক্ষণ দেওয়া হয়েছে, যা কিনা অপ্রাসঙ্গিকই নয় ক্ষমতার যথাযথ ব্যবহার কতটুকু তাও ভেবে দেখতে হবে।

দেশে ও বিদেশে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন বিচারিক কার্যে আমরা লক্ষ্য করেছি যে, সব বিচারক সব সময় প্রশাসন বা বিশেষ ক্ষমতাবানদের প্রভাবমুক্ত থেকে নিরপেক্ষভাবে রায় প্রদান সম্ভব হয় নাই যা কিনা অনেক সময় বিচারপ্রার্থীকে বিক্ষুদ্ধ করে তোলে, বিচার বিভাগের উপর অশ্রদ্ধা ও আস্থাহীনতা আনয়ন করে– বিদেশে দেখা যাচ্ছে; যুক্তরাষ্ট্রে টুইন-টাওয়ারের ঘটনায় নিহতদের আত্মীয়রা সরকার বা নিউইয়র্ক শহরের বিরুদ্ধে মামলা করতে গেলে বিচারক তা খারিজ করে দিয়েছেন। ইয়েমেনে বর্বরোচিত আক্রমণের কারণে সৌদিতে অস্ত্র বিক্রীতে নিষেধাজ্ঞা জারী করার আহবান জানিয়ে মামলা করলে যুক্তরাজ্য ও কানাডায় বিচারকরা মামলা খারিজ করে দিয়েছেন। তেমনি ইরাক আক্রমণের দায়ে তৎকালীন ব্রিটিশ পররাষ্টমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারকে আন্তর্জাতিক আদালতে হাজির করার মামলা করলে বিচারকরা তা নাকচ করে দিয়েছেন ! তারা যে অন্যায় রায় দিয়েছেন সেটা বুঝতে বাকী থাকে না। রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের (সিনিয়র) আমলে নিযুক্ত সুপ্রিমকোর্টের এক শ্রেণীর বিচারকই পক্ষপাতিত্ব দেখিয়ে বিতর্কিত নির্বাচনে বুশ জুনিয়রকে জয়ী ঘোষণা করেছিলেন। আমাদের দেশেও সামরিক শাসনের সময় বা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসীন থাকা অবস্থায় বিচারকদের কাঁধে বন্দুকের নলা বসিয়ে রায় আদায় করিয়ে নেয়ার অভিযোগ উঠে। তখন কিন্তু কোনো বিচারপতিকে বিবেকের তাড়নায় পদত্যাগ করতে শোনা যায় নাই।

এ প্রসঙ্গে উপমহাদেশের দুটি ঘটনা উল্লেখ করছি যেখানে সুপ্রিমকোর্টের ত্রুটিপূর্ণ রায়ের বিরুদ্ধাচরণ করে জনগণ আন্দোলন গড়ে তুললে পার্লামেন্ট হস্তক্ষেপ করে আইন পাশ করলে তা নিরসন হয়।

প্রথমত : ১৭৭৫ সালে কামালউদ্দিনের মামলায় সুপ্রিম কোর্টের জামিন আদেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় নির্বাহী বিভাগ এবং আদালতের নির্দেশনা আনুযায়ী কামালউদ্দিনকে জামিনে মুক্তি না দিয়ে অন্তরীন রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। এরপর ১৭৭৭ সালে সাধারণ বিজ্ঞপ্তি জারি করে যে জমিদাররা সুপ্রিম কোর্টের এখতিয়ারাধীন নন, তাই তাঁদের সুপ্রিম কোর্টের আদেশ-নির্দেশ মানার প্রয়োজন নেই। সুপ্রিম কোর্ট ও নির্বাহী বিভাগের বিরোধের অবসান এবং সুপ্রিম কোর্টের কাজে বাধাদানের ফলে সৃষ্ট নির্বাহী বিভাগের দায়মুক্তির জন্য অবশেষে ১৭৮১ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে ‘সেটলমেন্ট অ্যাক্ট’ নামে একটি আইন পাস করা হয়।

দ্বিতীয়ত : বিখ্যাত মামলা (Mohd. Ahmed Khan v. Shah Bano Begum ( 1985 SCR (3) 844)) তুলনা দেয়া যেতে পারে, ১৯৮৫ সালে সুপ্রিম কোর্ট শাহ বানু মামলায় খোরপোষের নির্দেশ দেয়। ওই রায়ে বলা হয়, ভারতীয় দণ্ডবিধির ১২৫ নম্বর ধারায় শাহ বানুর খোরপোষ পাওয়ার অধিকার রয়েছে। ভারতীয় দণ্ডবিধির ওই ধারা জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। মুসলমান নেতারা বলতে শুরু করেন, সুপ্রিম কোর্টের এই রায় তাঁদের নিজস্ব পারিবারিক আইনে হস্তক্ষেপ, তুমুল সেই বিক্ষোভ আন্দোলন চলেছিল যতদিন না কেন্দ্রীয় সরকার আইন করে সুপ্রিম কোর্টের রায় অকার্যকর করে। ‘মুসলিম উইমেন (প্রোটেকশন অব রাইট অন ডিভোর্স) আইন ১৯৮৬’ পাশ করা হয় যা রাষ্ট্রের অসাম্প্রদায়িক চেতনার আঘাত হিসাবে অভিহিত করা হয়!

ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ের কারণে সৃষ্ট এই বিতর্কের অবসানে ভালো বিকল্প ভাবনা দরকার। আইন কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান বিচারপতি মোহাম্মদ আবদুর রশিদ এ রায়কে অভিহিত করেছেন, “আমরা এতকাল জেনে এসেছি, This is People’s Republic of Bangladesh, কিন্তু এ রায়ের পরে মনে হচ্ছে, We are no longer in the People’s Republic of Bangladesh. We are rather in Judges’ Republic of Bangladesh.” বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও দায়বদ্ধতা এক নয়। সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক বলেন, সংবিধানের প্রস্তাবনায় সেখানে ‘জনগণ বলছে, সংবিধানের রক্ষণ তাদের কর্তব্য’। যেহেতু কেবল জনগণের কাছে দায়বদ্ধ। তাই জনগণের প্রতিনিধিদের কাছেই তারা দায়বদ্ধ। গার্ডিয়ান কেউ হয়ে থাকলে, সেটা জনগণ। জনগণই শেষ কথা।

লেখক: আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্ট।