logo

বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২০ | ৬ কার্তিক, ১৪২৭

header-ad

জয়বাংলা ঘটাবে কি ধর্মধাপ্পা উচ্ছেদ?

বেলাল বেগ | আপডেট: ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৭

বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় মানুষ মূল প্রাণীগোষ্ঠী ‘হোমো’র অন্তর্ভূক্ত ইরেকটিকাস উপজাতি হোমোসেপিয়ন ভুক্ত একটি প্রজাতি যার বৈশিষ্ট বড় মস্তিষ্ক ও বাকশক্তি।যোগাযোগ ব্যবস্থা ও যানবাহনহীন আদিমানুষেরা পশুদের মতোই এক স্থানে দলবদ্ধ হয়ে বাস করত এবং একসঙ্গে হিংস্র প্রাণী বা ভিন্নগোত্রের মানুষ থেকে আত্মরক্ষা করত। মানুষের শুরুর এমন জীবনাভিজ্ঞতাগুলিই ক্রমাগত বৃদ্ধিপ্রাপ্ত, ব্যাপক ও পরিশীলিত হয়ে মানুষের জ্ঞান ভান্ডার স্ফীত হয়েছে বলেই আজকের মানুষ অবিশ্বাস্য জ্ঞানের অধিকারী হয়ে গ্রহ-নক্ষত্র ভ্রমণেরও স্বপ্ন দেখছে।

জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রখর আলোর এ যুগে যে সকল নেতৃত্বহীন মানবগোষ্ঠী নিজেদের আদি গোষ্ঠী চেতনার বাইরে তাকাতে পারেনি এরাই দূর্বল ও অনুন্নত থেকে গেছে। সে অবস্থাটির সুযোগ নিয়েছে অগ্রসর জাতিগুলি নিজেদের ধন-সম্পদ ও শক্তি বৃদ্ধি করার জন্যে। এভাবেই ইউরোপের জাতিগুলি সম্পদশালী ও শক্তিশালী হয়ে বিশ্বনেতৃত্বের আসনে বসে। তারা একইসঙ্গে পৃথিবীর সমুদ্রপথগুলি ও তাদের প্রাচীন জ্ঞান-বিজ্ঞান সম্পদও উদ্ধার করে যাচ্ছিল। এই যুগটাই ইতিহাসে ‘রেঁনেসা’ বা সাংস্কৃতিক জাগরণ হিসাবে চিহ্নিত আছে। রেঁনেসার আগে শুধু ইউরোপ নয় তদানীন্তন পুরো বিশ্বে ‘ধর্ম’ই মানুষে মানুষে জাতিতে জাতিতে পরিচয়ের একমাত্র সূত্র ছিল। একজন মানুষ কেমন হবে তা নির্ণীত হত তার হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, ইহুদী বা ধর্মহীন পরিচয়ে।

রেঁনেসা ইউরোপে জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার নবযুগ আনে। এ সময় প্রিন্টং প্রেস ও বাষ্পীয় ইঞ্জিন আবিষ্কৃত হলে মানব সভ্যতায় প্রযুক্তির অকল্পনীয় শক্তি যোগ হয়। মানুষের অগ্রগতি আরও বেগবান হয়। এভাবেই সকলের অগোচরে মানব প্রতিভা এবং সৃজনশীলতা মানুষ মানুষে জাতিতে জাতিতে পরিচয়ের মাধ্যম হিসাবে ধর্মকে অপাংত্তেয় করে দেয়। বলা চলে, রেঁনেসাই মানুষের আত্মআবিষ্কার ঘটিয়েছে; জাগ্রত মানুষের কাছে কল্পিত ধর্ম এক বা একাধিক সর্বময় শক্তির ইশ্বর বা আল্লার আর তেমন কোনো গুরুত্ব বা প্রয়োজন থাকল না। সমস্ত ইউরোপে স্ব স্ব মানবিক সংস্কৃতি নিয়ে সগৌরবে উত্থান ঘটে জাতি-রাষ্টসমূহের; ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, স্পেন, পর্তুগাল, হল্যান্ড, স্পেন ইত্যাদি ছোট বড় রাষ্ট্রে পোপের চেয়ে বড় হয়ে গেলেন রাজারা। যে ইউরোপ ক্যাথলিক-প্রোটেস্টান–হিউগোনট হিসাবে নিজেদের মধ্যে বহু বছর অবিরাম যুদ্ধ করেছে, একসঙ্গে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ও ক্রসেডের ধর্মযুদ্ধ করেছে, রাষ্ট্রনীতি হিসেবে তারা সকলেই ধর্মকে উচ্ছেদ করে দেয়। ইউরোপের এই জাগরণের খবর তখনও ভারতে আসেনি বা আসতে দেয়নি বৃটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানি। কারণ ধর্মের অসারতা ফাঁস হয়ে গেলে ভারতবাসীকে পরবর্তীকালে দখলে এনে পদানত রাখার হাতিয়ার হিসাবে ধর্মের ব্যবহার করা অসম্ভব হয়ে যেত। বিংশ শতাব্দীতে তখনও ভারতবর্ষে ধর্মের দোর্দণ্ড প্রতাপ দেখে অলৌকিক প্রতিভার বাঙালি কবি নজরুল ইসলাম বিরক্তির সংগেই বলেছিলেন, ‘মূর্খরা সব শোন, মানুষ এনেছে গ্রন্থ (ধর্মগ্রন্থ), গ্রন্থ আনেনি মানুষ কোন।’

বর্তমান বিশ্বের গণতন্ত্রহীন রাষ্ট্রগুলির মতোই, এক কালে ইউরোপীয় দেশগুলি ধর্মকে সর্বশ্রেষ্ঠ শক্তি হিসাবে মানত এবং পোপকেই বিশ্ব-অধীশ্বর মনে করত। কোন দেশে নতুন কোন রাজা সিংহাসনে বসলে তাকে পোপের স্বীকৃতি ও আশীর্বাদ নিতে হত। মুসলমান দেশগুলিও খিলাফতের উত্তরাধীকারী দেশের রাজাকে বিশ্ব-অধিপতির মর্যাদা দিত। মানব ইতিহাসে রাষ্ট্রে ধর্মের এই আধিপাত্য উচ্ছেদ করেন মহাবীর নেপোলিয়ন বোনাপার্টি। তার অভিষেকে তিনি পোপকে নিমত্রণ করে এনেছিলেন বটে কিন্তু নিয়মানুযায়ী পোপের হাত থেকে রাজমুকুট গ্রহণ না করে তিনি তা নিজের তলোয়ারের সাহায্যে মাথায় তুলে নিজেই পরেছেন, নিরুপায় মহামতি পোপ ছিলেন বেচারা দর্শক। ১৭৮৯ সালের ফরাসী বিপ্লবে হাজার হাজার ধর্মযাজক ও প্রতিবাদকারীদের হত্যা করে এমনকি এক কবরে মাটিচাপা দিয়ে ফরাসীরাই প্রথম দ্যর্থহীনভাবে ধর্মকে রাষ্ট্রব্যবস্থাপনার আঙ্গিনা থেকে চিরতরে বহিষ্কার করে দেয়। এই আদর্শই পরবর্তীকালে পৃথিবীর সকল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র তাদের সংবিধানের মূলনীতি হিসাবে গ্রহণ করে এবং মানবাধিকারকেই সর্বোচ্চ মর্যাদা দেয়।

পশ্চিম বিশ্বে নীতিনৈতিকতার প্রতীক হিসাবে পোপ এখনও একজন সন্মানিত ব্যক্তি; কেউ আশা করে না তিনি কোনো রাষ্ট্রের আভ্যন্তরীণ ব্যাপারে নাক গলাবেন, এমন কি নিজেদের ভাবমূর্তি ধরে রাখার জন্যে পোপেরাও জাগতিক বিষয়গুলি থেকে নিজেদের দূরে রাখেন।

পাশ্চাত্যে ধর্মের রবি অস্তাচলে থাকলেও তাদের সাম্রাজ্যবাদীরা Religion is opium of the people কার্ল মার্কসের এই অমর বাক্যটিকে তাদের অধিকৃত দেশগুলির অশিক্ষিত জণগনকে পদানত রাখার মন্ত্র ও ম্যাজিক হিসাবে লুফে নেয়। এক্ষেত্রে উদাহরণ সৃষ্টি করেছে বিশাল ভারতবর্ষ দখলকারী বৃটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির স্বল্প সংখ্যক কর্মচারী ও ব্যবসায়ীরা। মুঘল আমলে ব্যবসায় করতে আসা এই কোম্পানিটি ১৭৫৭ সালে নবাব সিরাজদ্দৌলার পরাজয় ঘটিয়ে তাদের আধিপাত্য প্রতিষ্ঠার পর ১৮৫৭ সাল পর্যন্ত রাজত্ব ও শোষণ করে। সেই সালের সিপাহী বিদ্রোহ দমন করার পর ইংল্যান্ড ভারতের শাসন সরাসরি গ্রহণ করেছিল। ১৭৫৭-১৮৫৭ সাল সময়ে ঠিক কত সংখ্যক ইংরেজ ভারতবর্ষে ছিল তার সঠিক সংখ্যা জানা না গেলেও সংখ্যা যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য ছিল না তা বলাই বাহুল্য। ১৮৭১ সালে ভারতবর্ষের ইতিহাসে প্রথম আদমশুমারিতে ভারতবর্ষে জনসংখ্যা ছিল ২৩৮৮৩০৯৫৮; তখন ইংরেজদের সংখ্যা ছিল মাত্র ২৩৮৪০৯ যা শতকরা হিসাবে ১%’র কাছাকাছি যা প্রায় ধর্তব্য ছিল না। ভাবুন, প্রায় ২৪ কোটি মানুষকে পদানত রেখেছিল তার তুলনায় কত নগন্য মানুষ? কেমন করে এটা সম্ভব করেছিল ইংরেজরাই বলে গেছে।

বৃটিশ পার্লামেন্টের সদস্য তখনকার দিনের সুবিদিত পন্ডিত লর্ড ম্যাকলে ভারতে এসেছিলেন বৃটিশ সাম্রাজ্য দেখতে। তিনি এসেই অনুধাবন করেছিলেন যে ভারতবাসীরা চিন্তা চেতনায় অত্যন্ত উন্নত, এতই উন্নত যে তাদের অদূর ভবিষ্যতে দমিয়ে রাখা যাবে না। তাদের দমিয়ে রাখার একটিই মাত্র উপায়, ভারতবর্ষের দুই প্রধান ধর্মীয় সম্প্রদায় হিন্দু মুসলমানকে ঘৃণ্য শত্রু হিসাবে পস্পরের বিরুদ্ধে লেলিয়ে বিভক্ত রাখতে হবে। মেকলের এ নীতিটি ইতিহাসে বৃটিশ অনুসৃত Divide and rule নামে কুখ্যাত হয়ে আছে। এই নীতির অধীনে হিন্দুদের জন্য হিন্দু কলেজ ও মুসলমানদের জন্য আলীয়া মাদ্রাসা জাতীয় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ছাড়াও উচ্চশিক্ষার সকল পর্যায়ে উভয় সম্প্রদায়ের জন্য আলাদা ব্যবস্থা হতে থাকল। প্রধানত হিন্দুদের জন্য অল ইন্ডিয়া ন্যাশনাল কংগ্রেস, মুসলমানদের জন্য মুসলিম লীগ নামক রাজনোইতিক দল গঠিত হওয়া মাত্রই হিন্দু-মুসমান সাম্প্রদায়িক রাজনীতিই হয়ে গেল ভারতীয় রাজনীতির একমাত্র লক্ষ্য; ভেসে গেল ভারতের সংঘবদ্ধ স্বাধীনতা আন্দোলন , পাত্তাই পেল না মাস্টার দা সূর্য সেন, সুভাষ বসুর জাতীয়তাবাদী উত্থান। ধর্মই যে মানব জাতির নেশার আফিম, কার্ল মার্ক্স বলার বহু আগে থেকেই ধুরন্দর বৃটিশ এটা জানত। ভারতবাসীকে ধর্মের আফিমে নেশাগ্রস্ত করায় ভারতবর্ষকে ত্রিখণ্ডিত ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করতে বেগ পেতে হল না বৃটিশ শাসকদের। বিশ্বের মহাশক্তি হিসাবে ভারতবর্ষের উত্থান যে অসম্ভব করা হয়েছে, এ খবরটি এখনও জানে না বাংলাদেশ পাকিস্তান ও ভারত নামক সাম্প্রদায়িক দেশগুলি।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের বাঙালি এই আমরাই বৃটিশ কতৃক বপিত ধর্মধাপ্পা রাজনীতিকে মাটির নীচে চাপা দিয়েছিলাম। কিন্তু ধর্মধাপ্পা বন্ধ হলে ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্র হবে, ধনতন্ত্র উচ্ছেদ হয়ে সমাজতন্ত্র আসবে। বাংলাদেশকে আর কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না। আমেরিকা এটা চায় না। তাই মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শত্রুজোট প্রথমেই বঙ্গবন্ধু এবং চার প্রধান সহযোগীদের হত্যা করে আমাদের নেতৃত্বে এ্কটা ভয়ানক শূন্যতা তৈরি করে তারপর সেখানে প্রতিস্থাপন করে তাদেরই পালক সেনা দালালদের। ওরা সবাই মিলে সারা জাতিকে জোর করে ধরে ‘বিসমিল্লাহ’ দিয়ে বেঁধে ধর্মের করাডৌজ আফিম খাইয়ে দেয়। ২০০৯ সালে স্বাধীনতা অর্জনে নেতৃত্ব দানকারী আওয়ামি লীগ ক্ষমতায় আসায় সকলে আশায় বুক বেঁধেছি্ল ধর্মধাপ্পার রাজনীত উচ্ছেদ হবে। গত সাত বছর এ সম্বন্ধে কোন টুঁ শব্দ না হওয়ায় বুঝা গেল একাত্তরের ধর্ম নিরপেক্ষ ‘জয়বাংলা’র ব্যাটারিও শেষ হয়ে গেছে। বাংলাদেশ কি ধর্মধাপ্পার অভিশাপের অন্ধকারেই দিনাতিপাত করবে?

লেখক : সাহিত্যিক ও সাংবাদিক

ফেমাসনিউজ২৪/আরআর/আরইউ