logo

বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২০ | ৬ কার্তিক, ১৪২৭

header-ad

রাখাইনের রোহিঙ্গা গণহত্যা স্রেব্রেনিচা গণহত্যার চেয়েও ভয়াবহ

ড. সরদার এম. আনিছুর রহমান | আপডেট: ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৭

গত ২৫ আগস্ট থেকে মায়ানমারের রাখাইনে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর যে ধরনের নৃশংস হত্যাযজ্ঞ, ধর্ষণ, অত্যাচার-নির্যাতন চালানো হচ্ছে তা গত কয়েক শতাব্দীর ইতিহাসে যুদ্ধবিহীন কোনো জনপদে এ ধরনের নির্মমতার নজীর নেই। এমন কী যুদ্ধকালেও কোনো জনপদে এমন বর্বরতা দেখেনি বিশ্ববাসী। একবিংশ শতাব্দীতে সভ্যতার স্বর্ণযুগে এ ধরনের বর্বরতা যেন গোটা মানব সভ্যতাকেই বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে মায়ানমারের চরমপন্থী বৌদ্ধরা।

সর্বশেষ রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের জন্য ত্রাণ সরবরাহ ঠেকাতে পেট্রলবোমাও নিক্ষেপ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক রেডক্রস ওই ত্রাণ নিয়ে রাখাইন রাজ্যে যাচ্ছিল। এ ঘটনায় প্রমাণ করে এটা কোনো সহিংসতা নয়, সুপরিকল্পিতভাবেই রোহিঙ্গা মুসলিমদের নিধন করা হচ্ছে।

রাখাইনের আজকের এ ঘটনা আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয় সেই স্রেব্রেনিচা গণহত্যাকে। স্রেব্রেনিচা হত্যাযজ্ঞ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের মাটিতে সংঘটিত সবচেয়ে ভয়াবহ ও পাশবিক গণহত্যার ঘটনা। বসনিয়া যুদ্ধ চলাকালে ১৯৯৫ সালের ১১ জুলাই থেকে ১৩ জুলাই পর্যন্ত দেশটির স্রেব্রেনিচা শহরে যে হত্যাকান্ড পরিচালিত হয়, তা-ই ইতিহাসে স্রেব্রেনিচা হত্যাকান্ড নামে পরিচিত। সেখানে তিন দিনে নারী-শিশুসহ ৮ হাজারেরও বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়, যাদের বেশিরভাগই ছিল পুরুষ ও কিশোর। ১৯৯৫ সালের পর একে একে পার হয়ে গেছে ২২টি বছর। এখনও এ হত্যাকান্ডে নিহত হতভাগ্যদের দেহাবশেষের সন্ধান মেলে ওই এলাকায়।

এ পর্যন্ত এই অঞ্চলে ৭৬টি স্থানে অন্তত দেড়শ গণকবরের সন্ধান মিলেছে। ২০০৩ সাল থেকে এ পর্যন্ত স্রেব্রেনিচা হত্যাকান্ডে নিহত ৭ হাজার একশ জনের দেহাবশেষ উদ্ধার করে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় সনাক্ত করা হয়েছে। সন্ধান চলছে নিখোঁজ আরও ১২০০ জনের। এই গণহত্যা সংগঠিত হয়েছিল পূর্ব বসনীয় শহরে, এটা ঘটেছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যা সবচেয়ে নিষ্ঠুর গণহত্যা। আর এটা ঘটেছিল মূলতঃ জাতিসংঘের শান্তিরক্ষীদের একটি ডাচ ব্যাটেলিয়ন বসনীয় সার্ব বাহিনী থেকে বেসামরিক নাগরিকদের রক্ষা করতে ব্যর্থ হওয়ার কারণেই।

১৯৯২-১৯৯৫ সালের বসনীয় যুদ্ধের সময় জাতিসংঘের ‘স্রেব্রেনিচা নিরাপদ জোন’ থেকে বসনীয় বেসামরিক লোকদের স্থায়ীভাবে ও জোরপূর্বক অপসারণ করার পরিকল্পনায় এই গণহত্যা সংঘটিত করেছিল সার্বীয় সেনাবাহিনী। আর এক্ষেত্রে সার্বীয় বাহিনীকে মদত ও সহায়তার অভিযোগ ছিল নেদারল্যান্ডস এবং রাশিয়ার বিরুদ্ধে।

আজকে রাখাইনের পরিস্থিতি স্রেব্রেনিচার চেয়েও ভয়াবহ। কেননা, বসনীয় যুদ্ধের শেষ সময়ে জাতিসংঘের ‘স্রেব্রেনিচা নিরাপদ জোনে’তিনদিনেই ওই হত্যা সংঘটিত হয়েছিল। কিন্তু রাখাইনের রাষ্ট্রীয় মদদে বছরের পর বছর ধরে গণহত্যা চলে আসছে। মায়ানমারের সংলঘু রোহিঙ্গা সম্প্রদায় অবর্ণনীয় ব্যাপক সহিংসতার মোকাবেলা করছে। তাদের ওপর চালানো হচ্ছে পাশবিক নির্যাতন আর বীভৎস হত্যাযজ্ঞ। সবমিলেই বার্মার সামরিক বাহিনীর সহায়তায় চরমপন্থী বৌদ্ধদের ডেথস্কোয়াড মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যকে নরকে পরিণত করেছে। গত ২৫ আগস্ট শুরু হওয়া সহিংসতায় ৪ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী পালিয়ে প্রতিবেশি বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার মতে, গত তিন সপ্তাহে সেখানে ১০ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা মুসিলম গণহত্যার শিকার হয়েছেন।

শুধু তাই নয়, রাখাইনে বার্মিজ বাহিনী রোহিঙ্গা নারী-শিশুদের ওপর যে ধরনের বর্বরতা ও নৃশংসতা চালাচ্ছে তা ইতিহাসে বিরল। রাখাইন থেকে পালিয়ে আসা কক্সবাজারের কুতুপালংয়ে আসা মদিনা খাতুনের ভাষায়- ‘ওরা মেয়েদের ছাড়ে না, বিশেষ করে উঠতি বয়সের মেয়ে। ঘরের বউ যার আছে, সে শেষ। মেয়েদের তো ধর্ষণ করেই। এর পরেও ক্ষমা নেই। ওখানে মেয়েদের জীবন নেই।’

‘মেয়েদের ওপর ওদের (সেনাবাহিনীর) চোখ পড়ে বেশি। মেয়েদের ইচ্ছামতো ধর্ষণ করে। বড় বীভৎস সে দৃশ্য। সবার সামনে মেয়েদের ইজ্জত-সম্মান নিয়ে খেলা করে।’

‘নারীদের ধর্ষণ করার পর গলা কেটে হত্যা করে সেনা ও তাদের লোকজন। শুধু তাই নয়, নারীদের স্তন কেটে ছেড়ে দেওয়া হয়। এর পর দেখে ওই নারী কী করে। তীব্র মৃত্যুযন্ত্রণা দিয়ে আনন্দ করে এক পর্যায়ে মেরে ফেলে।’

মদিনা ভাষায়, তার এক প্রতিবেশী নারী শিশুকে বুকের দুধ পান করাচ্ছিল। সেনারা ওই নারীর দুই স্তন কেটে দেয়। পরে ওই শিশুকে ঠেলে দেয় নারীর বুকে। এসব বীভৎস দৃশ্য তাদের খুব ভালো লাগে। এমনও দৃশ্য মদিনা দেখেছেন, যেখানে নারীকে ধর্ষণ করে শরীরে কেরোসিন ঢেলে দেয়। তার পর ওর পুড়ে মারা যাওয়া দেখে। সবমিলেই রাখাইনে বার্মিজ বাহিনী রোহিঙ্গা গণহত্যা সার্বীয় বাহিনীর স্রেব্রেনিচা গণহত্যার চেয়েও ভয়াবহ। সামরিক জান্তা রাখাইনে রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর যে বর্বর নিষ্ঠুর গণহত্যা চালাচ্ছে, তার কোনো তুলনাই হয় না।

এমতাবস্থায় ‘সার্বজনীন মানবাধিকার সংক্রান্ত ঘোষণা’ অনুযায়ী রাখাইনের রোহিঙ্গা মুসলিমদের অধিকারসমূহ রক্ষা জাতিসংঘের মৌলিক দায়িত্ব। আন্তর্জাতিক সনদ অনুযায়ী রাখাইনের রোহিঙ্গাদের অধিকার রক্ষায় জাতিসঙ্ঘের মধ্যস্থতায় এই সঙ্কটের সমাধান হতে পারে। এরপরও সমাধান না হলে জাতিসঙ্ঘের পক্ষ থেকে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারে। তাতেও কাজ না হলে জাতিসঙ্ঘের চ্যাপ্টার ৭ অনুযায়ী সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ ও প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমেও মানুষের অধিকার রক্ষা করতে পারে জাতিসংঘ। ফলে সঙ্কট নিরসনে জাতিসংঘকেই আজ আরো জোরালো ভুমিকা রাখতে হবে। অন্যথা মায়ানমারে যেসব মানবাধিকারের ঘটনা ঘটছে এর জন্য একদিন জাতিসংঘকেই দায় নিতে হবে।

লেখক: শিক্ষা, সমাজ ও রাজনৈতিক বিষয়ক গবেষক।