logo

বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২০ | ৬ কার্তিক, ১৪২৭

header-ad

রোহিঙ্গাদের বাঙালি আখ্যা : একটি কুপরিকল্পিত বর্মীবর্বর কৌশল

কাফি কামাল | আপডেট: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭

আরাকানের ভূমিপুত্র রোহিঙ্গাদের দেশছাড়া করতে নানা সুপরিকল্পিত কৌশলে এগিয়েছে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা ও সেনা নিয়ন্ত্রিত সু চি’র পুতুল সরকার। প্রচার-প্রোপাগান্ডায় তারা রোহিঙ্গাদের আখ্যায়িত করে ‘বাঙালি’ ও ‘বাঙালি সন্ত্রাসী’। বর্বরদের দেশ মগের মুল্লুকের খুনে সেনাবাহিনী প্রধান মিন অং হ্লাইং তার অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে এ প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে।

অন্যদিকে আরাকানে সেনা অভিযানের মাধ্যমে গণহত্যার শুরুতেই দেয়া বিবৃতিতে দেশটির স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চি রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি সন্ত্রাসী’ আখ্যায়িত করে। মিয়ানমারের সরকারের ভাষ্য ছিল রাখাইনের টং বাজার গ্রামটি ‘বাঙালি সন্ত্রাসী’রা অবরোধ করেছিল। রোহিঙ্গাদের বাঙালি সন্ত্রাসী উল্লেখ করে নিয়মিত সরকারের দৃষ্টিভঙ্গিতেই সংবাদ প্রকাশ করে যাচ্ছে, মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন দৈনিক গ্লোবাল নিউ লাইট অব মিয়ানমার, দৈনিক মিয়ানমার টাইমস, ফ্রন্টিয়ারসহ দেশটির প্রায় সব গণমাধ্যম।

প্রশ্ন হচ্ছে, রোহিঙ্গারা কি বাঙালি? তাদের ভাষা কি বাংলা? বাংলাদেশের কোনো মানুষই বলবে না তারা বাঙালি। কেউ বলবে না তাদের ভাষা বাংলা। তাহলে কেন তাদের বাঙালি বলে আখ্যায়িত করছে মিয়ানমার। এখানেই রয়েছে বর্বর বার্মিজদের কূটকৌশল।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, পৃথিবীতে এককালে আরাকান নামে একটি স্বাধীন দেশ ছিল। বাংলাদেশের বৃহত্তর চট্টগ্রাম ও মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশ নিয়ে ছিল সে দেশটির অবস্থান। ১৪০৬ সালে মিয়ানমার রাজা আরাকান আক্রমণ করলে আরাকানের রাজা নরমিখলা বাংলার রাজধানী গৌড়ে এসে আশ্রয় নেন। ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে (কথিত) তিনি সোলায়মান শাহ নাম ধারণ করেন। ১৪৩০ সালে গৌড়ের সহায়তায় আরাকান পুনরুদ্ধার করেন। ১৫৩০ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ১০০ বছর গৌড়ের সুলতানকে কর দিতো আরাকান। ১৫৩০ সালের পর গৌড়ের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের সুযোগে আরাকান স্বাধীন হয় এবং ১৭৮৪ সাল পর্যন্ত আরাকান ম্রাউক উ রাজবংশের অধীনে শাসিত হয়। দীর্ঘ এ সময় পর্যন্ত আরাকানের সব শাসক তাদের নামের সঙ্গে মুসলিম উপাধি ব্যবহার করতেন।

গৌড়ের অনুকরণে তাদের মুদ্রার এক পিঠে আরবিতে কালিমা ও রাজার মুসলিম নাম ও তার ক্ষমতা আরোহণের সময় উল্লেখ থাকতো। সরকারি ভাষা ছিল ফার্সি এবং সৈনিকদের প্রায় সবাই ছিল মুসলমান। পরে অবশ্যই জেজুক শাহ’র আমলে পর্তুগিজ ও ম্রাইমাদের সমন্বয়ে গঠিত তার নৌবাহিনী জলদস্যুতে (ইতিহাসের মগ জলদস্যু) পরিণত হলে বাংলার সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট ও মিয়ানমারের শকুনি দৃষ্টিতে পড়ে।

১৭৮৪ সালে বার্মার রাজা ভোদাপায়া আরাকানের দক্ষিণাংশ নাফ নদীর দক্ষিণ তীর পর্যন্ত দখল করে নেয়। নাফ নদীর উত্তরাংশ চলে আসে বাংলার অধীনে। চূড়ান্তভাবে বিলুপ্তি ঘটে স্বাধীন আরাকানের। তারপর থেকেই দক্ষিণের বড় অংশটি (বর্তমান রাখাইন) বার্মার অধীনে শাসিত হয়। স্বাধীন আরাকান রাষ্ট্রের উত্তরাংশের বৃহত্তর চট্টগ্রাম ও নোয়াখালী অঞ্চলের মানুষ যেমন জীবিকার তাগিদে দক্ষিণাংশের মংডু, আকিয়াবে বসতি গড়েছে তেমনি ওই অংশের মানুষও বসতি গড়েছে উত্তরাংশে। নিজ দেশের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রাপ্ত যাওয়া কোনভাবেই অভিবাসন নয়। ভারতবর্ষ ও বার্মা যখন বৃটিশদের হাতে শাসিত হয়েছে তখনও তা ছিল শাসনব্যবস্থার দিক থেকে একদেশ। সে সময়ও জীবন-জীবিকার তাগিদে আরাকানের মানুষের একদিক থেকে অন্যদিকে বসবাস অভিবাসন নয়।

বৃটিশ শাসন অবসানের সময় আরাকান পূর্বপাকিস্তানের (বাংলার) সঙ্গে যুক্ত হতে চাইলেও বৃটিশদের কূটকৌশল ও পাকিস্তানপন্থী নেতাদের অনিহার কারণে সেটা হয়নি। ১৯৪৮ সালে বৃটিশ শাসন থেকে মিয়ানমার স্বাধীন হলে নাফের দক্ষিণাংশের আরাকানকে মিয়ানমারের ভাগেই দেয়া হয়।

আন্তর্জাতিক রীতিনীতি অনুযায়ী অভিবাসী বলা যায় ১৯৪৮ সালের পর কেউ আরাকানে বসবাস শুরু করলে তাদের। প্রশ্ন হচ্ছে, নাগরিকত্ব ও নিরাপত্তাহীনতা; অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা; শিক্ষা-চিকিত্সা-মানবাধিকারহীন গিনিপিগের দেশ আরাকানে কিসের আশায় বা কোন দুঃখে অভিবাসী হবে স্বাধীন বাংলাদেশের মানুষ! ইতিহাসের যুক্তিগুলো বিবেচনায় নিলে বার্মিজরা কোনদিনই রোহিঙ্গাদের অভিবাসী বলতে পারে না। সে জন্য কৌশলে তারা ইতিহাসের এ বিষয়গুলো মুছে ফেলতে চায়।

মনে রাখবেন, আরাকানের দক্ষিণাংশের (বর্তমান রাখাইন) বা উত্তরাংশের (বৃহত্তর চট্টগ্রাম) বাসিন্দা হোক না কেন রোহিঙ্গারা বাঙালি নয়, তাদের জাতীয়তা আরাকানি। আর রোহিঙ্গা শব্দটির উৎপত্তির একটি শক্ত ভিত্তি হচ্ছে রোসাঙগিরি। রোসাঙগিরির বাসিন্দারাই রোহিঙ্গা। রোসাঙ রাজসভা তাদেরই রাজসভা। সেই রোসাঙগিরি কিন্তু বাংলাদেশে নয়, বর্তমান রাখাইনে।

চট্টগ্রাম যেহেতু এককালে স্বাধীন আরাকানের অংশ ছিল এবং তখনও রাখাইনে রোহিঙ্গাদের বসবাস ছিল সেহেতু তাদের বাস্তু ও দেশচ্যুত করার কোন নৈতিক ভিত্তি থাকে না মিয়ানমারের সামনে। এ জন্য তারা চট্টগ্রামী ভাষার সঙ্গে মিলযুক্ত রোহিঙ্গা ভাষাকে বাংলা এবং রোহিঙ্গাদের বাঙালি আখ্যায়িত করে। রোহিঙ্গা ভাষাকে চট্টগ্রামী বললে ঐতিহাসিকতার বিচারে হেরে যায় মিয়ানমার। তাই বাংলা ভাষার সঙ্গে রোহিঙ্গা ভাষার পরিষ্কার ভিন্নতা সত্বেও রোহিঙ্গাদের বাংলাভাষী হিসেবেই প্রোপাগান্ডা চালায় মগের মুল্লুক। যাতে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে ঠেলে দিতে সুবিধা হয়।

এ এক কুপরিকল্পিত বর্মীবর্বর কৌশল।

২২ সেপ্টেম্বর ২০১৭

লেখক : কবি ও সাংবাদিক

ফেমাসনিউজ২৪/আরঅ্যা/আরইউ