logo

বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২০ | ৬ কার্তিক, ১৪২৭

header-ad

রোহিঙ্গা সঙ্কট: মানবতা না রাজনীতি?

ড. সরদার এম. আনিছুর রহমান | আপডেট: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭

বিশ্বের প্রায় সব পক্ষই কমবেশি স্বীকার করছেন যে- মায়ানমারে ‘জাতিগত নির্মূল ও গণহত্যা’ চলছে এবং এর স্বপক্ষে যথেষ্ট তথ্য প্রমাণও রয়েছে সেখানে আন্তর্জাতিক মহলের। তবে এ পর্যন্ত তারা ত্রাণ বিতরণ আর উদ্বেগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছেন। গণহত্যা বন্ধে চোখে পড়ার মতো কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।

কার্যকর পদক্ষেপ না নিয়ে আন্তর্জাতিক কালক্ষেপণ যেন মায়ানমারের চরম বৌদ্ধত্ববাদীদের রোহিঙ্গা মুসলিম নিধন হত্যাযজ্ঞে সুযোগ করে দেওয়া। আজ যেখানে গণহত্যা বন্ধে মায়ানমারের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান এবং অর্থনৈতিক অবরোধ দেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে সেখানে ত্রাণ বিতরণ আর উদ্বেগ প্রকাশ একবিংশ শতাব্দীর এই সভ্যতার স্বর্ণযুগে মানবাধিকারের সঙ্গে তামাসা ছাড়া আর কিছুই নয়। প্রকাশ্যে গণহত্যা চলবে আর রাতের আঁধারে আমরা উদ্বেগ প্রকাশ করবো এ জন্যই কী জাতিসংঘ, ওআইসি ও ন্যাটোসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো গড়ে তোলা হয়েছিল? কখনোই নয়।

ফলে আমরা মনে করি, মায়ানমার গণহত্যা চালিয়ে যে ধরনের অমার্জনীয় অপরাধ করছে, আমরা বিশ্ববাসী নীরবতা পালন করে এর চেয়েও বড় অপরাধী। কেননা, মায়ানমার এমন কোনো শক্তিধর রাষ্ট্র নয় যে তাকে গণহত্যা বন্ধে বিশ্বনেতারা বাধ্য করতে পারবে না। অতীতের ঘটনা থেকে এটা দৃঢ়ভাবেই বলতে পারি- এ ধরনের গণহত্যা যদি রোহিঙ্গা মুসলিমদের ক্ষেত্রে না হয়ে অন্য কোনো ধর্মের লোকদের ক্ষেত্রে হতো এতোদিন এর প্রেক্ষাপট ভিন্ন হতে পারতো।

হয়তো এতোদিনে চীন, রাশিয়া ও মার্কিনিরাসহ বিশ্বের শক্তিধর নেতারা ঝাঁপিয়ে পড়তেন, চালাতেন সামরিক অভিযান। যেমনটি ইতিপূর্বে আমরা দেখেছি খ্রিস্টান সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ার অজুহাতে ২০০২ সালের ২০ মে ইন্দোনেশিয়া থেকে পূর্ব তিমুরকে এবং ২০১১ সালের ৯ জুলাই সুদান থেকে দক্ষিণ সুদানকে জাতিসংঘ কর্তৃক পৃথক রাষ্ট্র ঘোষণা করা হয়েছে। সেখানে তড়িত মোতায়েন করা হয়েছিল শান্তি রক্ষী মিশনকে। আজ তারা কোথায়, তাদের বিবেক কোথায়? মুসলিমরা নিধন হলে নীরব, আর অন্যদের সামান্য কিছু হলেই সরব। তাহরে মানবাধিকার কী শুধু ইহুদী, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ ও হিন্দুদের জন্যই?

অথচ আন্তর্জাতিক সনদ অনুযায়ী বিশ্বের যেখানেই মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটুক না কেন, তা বন্ধে এবং মানবাধিকারের সুরক্ষায় আমরা সবাই বদ্ধপরিকর। কিন্তু রোহিঙ্গা মুসলিমদের নিধনে বিশ্ব নেতাদের এ ধরনের নীরবতায় ধিক্কার জানানোর ভাষা আমার জানা নেই।

রোহিঙ্গাদের নিয়ে শুধু আন্তর্জাতিক পর্যায়েই নয়, বাংলাদেশের অভ্যন্তরেও নোংরা রাজনীতি হচ্ছে। কী আওয়ামী লীগ, কী বিএনপি সবাই এ ইস্যুতে যথাযথ ভূমিকা পালনে ব্যর্থ। সবাই এই ইস্যুকে কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলে ব্যর্থ। কেননা, গত ২৫ আগস্ট মায়ানমারে ‘জাতিগত নির্মূল’ অভিযান তথা রোহিঙ্গা গণহত্যা শুরু হওয়ার পর তাদের যেধরনের ভূমিকা পালনের কথা ছিল তা পরিলক্ষিত হয়নি। বরং এক্ষেত্রে প্রথমদিকে সরকারের ভূমিকা খুবই ন্যাক্কারজনক ছিল- সীমান্তে বিজিবি রোহিঙ্গাদের প্রবেশের সুযোগ না দিয়ে তাদেরকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে। এছাড়া, রোহিঙ্গা গণহত্যা নিয়ে বিশ্বে এতো তোলপাড়, এতো উদ্বেগ-নিন্দা অথচ বাংলাদেশের কোনো দায়িত্বশীল নেতাকে রোহিঙ্গাদের পাশে গিয়ে দাঁড়াতে দেখা যায়নি। অথচ কয়েক হাজার কিলোমিটার দূর থেকে তুর্কি ফার্স্টলেডি রোহিঙ্গাদের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করতে এলেও তাকে যথাযথ সম্মান দেখানো হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে। পরে অবশ্য রাজনৈতিক স্বার্থেই রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন।

প্রসঙ্গত, এখানে একটি বিষয় উল্লেখ না করলেই নয়, গত ২৫ আগস্ট মায়ানমারে ‘জাতিগত নির্মূল’ অভিযান শুরুর পর রোহিঙ্গারা দলে দলে বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা করেছিল, কিন্তু আমাদের সরকার তাদের বাধা দিয়েছে। আর যারা গোপনে প্রবেশ করেছিল তাদেরকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। এরপর আমরা কী দেখলাম- ৩১ আগস্ট যখন তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোগান আমাদের রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদকে ফোন করে বললেন ‘রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় দিন, আমরা সব ব্যয় বহন করবো’ এরপরই সরকারের ভূমিকা রাতারাতি পাল্টে গেল। সীমান্তে রোহিঙ্গা প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা ও বাধা প্রত্যাহার করে নেয়া হল। এরপর কয়েকদিনেই প্রবেশ করলো তিন লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী।এতে আমরা কী বুঝলাম- আমাদের সরকার মানবাধিকার প্রশ্নে নয়, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজেদের ভাবমূর্তির প্রশ্নে এবং ত্রাণ ও দানের প্রত্যাশায় রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছেন, তাই নয় কী?

বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও বাম রাজনীতির অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকাও একই ধরনের । তাদের উদ্দেশ্য রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল। আমাদের সংবিধানে সুস্পষ্টভাবে বলা আছে বিশ্বের যেকোনো জায়গায় নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কথা ফলে আমাদের রাজনৈতিক নেতাদের উদ্দেশ্যে বলবো- শুধু স্বার্থবাজিতে সবকিছু হয় না, কার্যক্ষেত্রে প্রমাণ করার সময় এসেছে কে কতটুকু মানবতাবাদী।

আজ মায়ানমারের সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা সম্প্রদায় অবর্ণনীয় ব্যাপক সহিংসতার মোকাবেলা করছে। তাদের ওপর চালানো হচ্ছে পাশবিক নির্যাতন আর বীভৎস হত্যাযজ্ঞ। বার্মার সামরিক বাহিনীর সহায়তায় চরমপন্থী বৌদ্ধদের ডেথস্কোয়াড রাখাইন রাজ্যকে নরকে পরিণত করেছে। রাখাইনে আজ বিভীষিকাময় অবস্থা। গত তিনসপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে রাষ্ট্রীয় বাহিনী আর বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর চালানো ‘গণহত্যায়’ আরাকানের সর্বত্র লাশ আর লাশ, পথে প্রান্থরে মুসলিম রোহিঙ্গাদের রক্তের বন্যা, আগুনে পোড়া লাশের দুর্গন্ধে আরাকানের বাতাস দুর্গন্ধময় হয়ে উঠেছে। এসব কিছু গোপন করতেই সু চির সরকারের বাহিনী সাংবাদিক, মানবাধিকার কর্মী, সমাজকর্মীসহ আন্তর্জাতিক মহলের সদস্যদের সেখানে প্রবেশে বাধা দিচ্ছে। এতে সহজেই অনুমেয় সেখানকার পরিস্থিতি কতটা বিভীষিকাময়।

তাই আজ আমাদের চিন্তা করার সময় এসেছে মজলুম রোহিঙ্গাদের নিয়ে রাজনীতি করবো, না মানবতার পক্ষে শক্ত অবস্থান নিবো?

লেখক: শিক্ষা, সমাজ ও রাজনীতিবিষয়ক গবেষক।