logo

বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২০ | ৬ কার্তিক, ১৪২৭

header-ad
৭১তম জন্মদিন

শেখ হাসিনার ‘শ্রেষ্ঠতম মুহূর্তে’ চারদিকে সম্ভাবনার হাতছানি

ড. সরদার এম. আনিছুর রহমান | আপডেট: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৭

আজ (বৃহস্পতিবার) প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ৭১তম জন্মদিন। ৭০ বছর পেরিয়ে ৭১-এ পা পড়েছে। নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে জীবনের পড়ন্তবেলায় আজ চারদিকে আশার আলো আর সম্ভাবনার হাতছানি।

তিন তিনবারের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন শেখ হাসিনা। দেশ-বিদেশ থেকে অসংখ্য পুরষ্কারে ভূষিত হয়েছেন তিনি। বাবার মৃত্যুর পর ভঙ্গুর ও বিভক্ত দলকেও সংগঠিত করে পরিণত করেছেন দেশের সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক শক্তিশালী দলে। নেতৃত্বের জোরে ব্যক্তি শেখ হাসিনাও হয়েছেন বিশ্বের শক্তিধর নারী রাষ্ট্রনায়কদের একজন। নিজেকে গঠন করেছেন এক প্রাজ্ঞ ও কৌশলী রাজনৈতিক নেতা হিসেবে। সন্তানদেরও গড়েছেন সেভাবে। তাদেরও সুনাম-সুখ্যাতি ছড়িয়েছে দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও। অতিসম্প্রতি রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়ে বিশ্বে আরো বেশি আলোচিত ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছেন।

এই কৃতিত্বের জন্য শেখ হাসিনাকে অনেকে ‘গণতন্ত্রের মানসকন্যা’ আবার অনেক বাঙালি জাতির ‘শান্তির প্রতীক’বা ‘বিশ্ব মানবতার বাতিঘর’ বলেও তাকে উপাধিতে ভূষিত করেছেন। আবার অনেকে বলছেন, অমর কীর্তিতে বাবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পেয়েছেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালীর উপাধি, এবার তারই কন্যা শেখ হাসিনা হতে যাচ্ছেন হাজার বছরের ‘শ্রেষ্ঠ বাঙালী নারী’। সবমিলেই শেখ হাসিনার এখন পরম সুদিন। এই সুদিনে তার চারপাশে বন্ধু-বান্ধব, শুভাকাঙ্খী ও গুণকীর্তনকারী লোকের অভাব নেই। মুজিব পরিবারে এমন সুদিন ফিরবে তা হয়তো অনেকেই কল্পনা করতেও পারেননি। তবে গণতন্ত্রের ছদ্মাবরণে একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও বিরোধী মত দমনে নিষ্ঠুর ভূমিকার জন্য বিরোধীদের দিক থেকে তার সমালোচনাও একেবারে কম নেই।

এই সুদিনের আগে তাকেও অনেক দুর্দিনের কষ্ট-যন্ত্রনা পোহাতে হয়েছে। ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট বাবা-মা, ভাইসহ আপনজনদের হারিয়ে এতিম হয়েছেন সেই ২৮ বছর বয়সেই। এরপর আল্লাহর অসীম কৃপায় বেঁচে যাওয়া (জার্মানীতে থাকায়) একমাত্র বোন শেখ রেহেনাকে নিয়ে পথচলা শুরু। এরপর অনেকটা নিয়তির ডাকেই রাজনীতিতে আসেন শেখ হাসিনা। দলে বাবার শূন্যতা পূরণে দলীয় সভানেত্রী নির্বাচিত হয়ে নেতানেত্রীদের পীড়াপিড়িতেই সেই ১৯৮১ সালের ১৭ মে যুক্তরাজ্য থেকে দেশে ফেরেন তিনি। হাল ধরেন বিভক্ত আওয়ামী লীগের। অনেকটাই ছন্নছাড়া দলের নেতাকর্মিদের সংগঠিত করে ধীর পায়ে এগুতে থাকেন আগামীর পথে।

বলা যায়, বর্তমান সময়টাই শেখ হাসিনার জীবনের ‘শ্রেষ্ঠতম মুহূর্ত’। আর এই সময়টা যদি শেখ হাসিনার জীবনের ‘শ্রেষ্ঠ সময়’ হয়ে থাকে তবে ৭৫ ও এর পরবর্তী সময় থেকে জেনারেল জিয়া, স্বৈরাচার এরশাদ এবং পরে খালেদা জিয়া ও মইন-ফখরুদ্দীন বিরোধী আন্দোলনের সময়গুলো ছিল তার জীবনের সবচেয়ে ‘অন্ধকার সময়’।

কারণ ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের ভয়াল রাত্রিতে সপরিবারে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু নিহত হলেও তৎকালীন পশ্চিম জার্মানিতে থাকায় বেঁচে যান শেখ হাসিনা ও তার বোন শেখ রেহানা। পরবর্তী ৬ বছর লন্ডন ও দিল্লিতে নির্বাসিত জীবন কাটাতে হয় তাদের দু’বোনকে। এরপর দেশে ফিরে ১৯৮২ সালে জেনারেল এরশাদের ক্ষমতায় আরোহনকে অবৈধ ঘোষণা করে এরশাদ বিরোধী দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলেন শেখ হাসিনা।

১৯৮৩ সালে পনেরো দলের জোট গঠন করে তারই নেতৃত্বে দেশ জুড়ে সামরিক শাসক এরশাদ বিরোধী দুর্বার আন্দোলন গড়ে ওঠায় ১৯৮৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের ৩১ জন নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়। চোঁখ বেঁধে তাকে ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর আওয়ামী লীগের ভাষায় কৌশলগত কারণে ১৯৮৬ সংসদ নির্বাচনে সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা নির্বাচিত হন তিনি। ১৯৮৭ সালের ১১ নভেম্বর শেখ হাসিনাকে গৃহে অন্তরীণ করা হয়। ১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি চট্টগ্রামে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে শুরু হওয়া ৮ দলের মিছিলে জনতার ওপর পুলিশ ও বিডিআর নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করে। এ ঘটনায় ৯ জন নিহত হয়। এরপরও তাকে দমাতে পারেনি। শান্তিপূর্ণভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা হস্তান্তরে ১৯৯০ সালে তিনি এক গণআন্দোলনের নেতৃত্ব দেন।

১৯৯০ সালের ২৭ নভেম্বর আন্দোলনের জোয়ার ঠেকাতে সারা দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয় এবং শেখ হাসিনাকে ধানমন্ডির বাসায় গৃহবন্দি করা হয়। ৪ ডিসেম্বর জরুরি অবস্থা উপেক্ষা করে বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে অনুষ্ঠিত জনসভায় ভাষণ দেন শেখ হাসিনা। পরে অভিন্ন রাজনৈতিক আন্দোলনের মাধ্যমে এরশাদ সরকারকে ক্ষমতা থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেন। স্বৈরশাসনের নাগপাশ থেকে মুক্তি পায় বাংলাদেশ। পরে ১৯৯১ সালের সাধারণ নির্বাচনের পর তিনি সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা নির্বাচিত হন।

এরপর খালেদা সরকার বিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলেন। ১৯৯৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর শেখ হাসিনা মিন্টো রোডের বিরোধীদলীয় নেতার বাসভবন ত্যাগ করেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন নির্বাচন দাবিতে ২৮ ডিসেম্বর শেখ হাসিনার নেতৃত্বে জাতীয় সংসদ থেকে আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামীসহ কয়েকটি বিরোধী দলের সদস্যরা একযোগে পদত্যাগ করেন। চলতে থাকে আন্দোলন। কিন্তু বিএনপি সরকার জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজন করলেও তার দল এবং জোট তা বর্জন করে। পরে বিএনপি সরকার সংবিধান সংশোধন করে একপর্যায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয়।

পরবতীর্তে ১৯৯৬, ১২ জুন অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ১৪৬টি আসন পেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে। ১৯৯৬ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

এরপর ২০০১ সালের সাধারণ নির্বাচনে তিনি আবারো সংসদে বিরোধী দলীয় নেতা নির্বাচিত হন। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে যান। এ সময় দলের পরীক্ষিতনেত্রী আইভি রহমানসহ আরো ২৪জন নেতাকর্মী মারা গেলেও বড় ধরনের কোনো আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেননি। সেই সাথে এই ভয়াবহ হামলার বিচারও পাননি। ফলে জীবনের কঠিন দুর্দিন এ এক অন্যরকম সময় পার করেছেন। সেটা যেন ৭৫ এর চেয়েও কোনো অংশে কম ছিল না।

সেই দুর্দিন কাটাতে নেতাকর্মীদের সংগঠিত করে ধীর পায়ে এগুতে থাকেন আগামীর পথে। পরে সেনা নিয়ন্ত্রিত ড. ফকরুদ্দীনের নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে ২০০৭ সালের ১৬ জুলাই তাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং ২০০৮ সালের ১১ জুন প্যারোলো মুক্তি পাওয়ার আগ পর্যন্ত কারান্তরীণ থাকেন। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে তার দল বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়ী হয় এবং সরকার গঠন করে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। এরপর আর তাকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

বিরোধীদের সব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে গেল ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন। এরই মধ্যে বিরোধী জোটের গড়ে উঠা আন্দোলনও মোটামুটিভাবে স্তব্ধ করে দিয়েছেন। গেল সিটি, জেলা-উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও ইউপি নির্বাচনেও নিজের পছন্দের প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন। আগামী জাতীয় নির্বাচনেও সমূহ সম্ভাবনা দেখছেন। সবমিলেই এখন পরম সুদিন।

তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সামনের পথ যে একেবারেই মসৃণ হবে তা বলার উপায় নেই। কেননা, উন্নয়নশীল দেশের রাজনীতি মূলতঃ অস্থিতিশীল, কখন কী ঘটে তা বলার উপায় নেই। এত সুদিনেও শেখ হাসিনার সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ। তাই সতর্কভাবেই তাকে সামনে এগুতে হবে। সবশেষে, ৭১তম জন্মদিনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। সেইসঙ্গে তার জীবনের দীর্ঘায়ু কামনা করছি।