logo

বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২০ | ৬ কার্তিক, ১৪২৭

header-ad

রোহিঙ্গারাও মানুষ!

এলড্রিক বিশ্বাস | আপডেট: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৭

বর্তমানে যে ইস্যুটি সবচাইতে হট ইস্যু তা হল রোহিঙ্গা ইস্যু। বাংলাদেশের পার্শ্ববর্তী দেশ মিয়ানমার সাবেক বার্মার একটি প্রদেশ হচ্ছে রাখাইন। এরা আরাকানী নামেও পরিচিত।

বাংলাদেশ এখন আর তলাবিহীন ঝুড়ি নয়। দীর্ঘ ৪৬ বছরে স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশ এখন ঝুড়িপূর্ণ একটি দেশ। ১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দে আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরী কিসিঞ্জার বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি বলে মন্তব্য করেছিলেন। সেই ঝুড়ি সময় গড়িয়ে এখন পূর্ণতার পথে। সেই ঝুড়ি অনেক লোডও নিতে পারে।

কক্সবাজার, বান্দরবানসহ মিয়ানমারের সীমান্তঘেষা বাংলাদেশের বর্ডারে রোহিঙ্গারা আসছে তো আসছেই। তারা কোনো বাধা মানছে না, সুযোগ পেলেই চলে আসছে। আমার মনে পড়ে সেই ১৯৭১ এর উত্তাল দিনগুলির কথা। ১৯৭১-এর ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানী সৈন্যরা নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করেছিল বাঙ্গালি সন্তানদের। তারা চেয়েছিল বাঙ্গালি জাতিকে নিশ্চিন্ন করে দিতে। সেই একই লক্ষ্যে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের ওপর নিযার্তন চালাচ্ছে।

মানুষ কখন নিজ ঘর-বাড়ি ছাড়ে। যখন দেখে আর থাকা যাচ্ছে না তখন সিদ্ধান্ত নেয় প্রিয় ঘর-বাড়ি, ভিটে-মাটি ছেড়ে চলে যাবে অনিশ্চিত যাত্রা পথে। মিয়ানমার থেকে বালাদেশে আসতে জীবন বাজী রেখে অনেক কষ্টের পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। বিশেষভাবে মহিলা ও শিশুরা মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর অত্যাচারের শিকার। মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের ছবি, গল্প ও ঘটনা বর্তমান প্রজম্ম জেনেছে। এইরূপ নির্যাতন হয়েছিল ১৯৭১ এ বাংলাদেশে অর্থাৎ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে।

১৯৭১ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী মানবতা ও সহমর্মিতার টানে বাংলাদেশের এক কোটির বেশি শরনার্থীদের জন্য পশ্চিমবঙ্গে ও আগরতলায় থাকা এবং খাওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন। সেই একই ভালোবাসার টানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গাদের জন্য বাংলাদেশের বর্ডার উন্মুক্ত করে দিয়েছেন। ইন্দিরা গান্ধীর বিশাল হৃদয় মিশে গিয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে। পার্থক্য ইন্দিরা গান্ধীর সময় ছিল ১৯৭১ ও বর্তমান রোহিঙ্গা ইস্যু ২০১৭। ৭১ উল্টালে ১৭ হয়।

পিছনের দিকে তাকালে আমরা কি দেখতে পাই। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে আমেরিকা ও চীন পাকিস্তানকে সমর্থন করেছিল। বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে অনেক টালবাহনা করেছিল। বাংলাদেশের মিত্রশক্তি ছিল ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়ন মানে রাশিয়া। এখন অনেকে আমেরিকা যেতে চায়, আমেরিকার প্রশংসায় গদগদ, কিন্তু ১৯৭১ মহান মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে ছিল আমেরিকা। সপ্তম নৌ বহর আমেরিকা পাঠিয়েছিল বঙ্গোপসাগরে বাঙ্গালি নিধনে পাকিস্তানকে সহায়তা করতে। তবে রাশিয়ার হুমকিতে আমেরিকা পিছিয়ে যায়। আর চীন অস্ত্র দিয়েছিল পাকিস্তানকে স্বাধীনতাকামী বাঙ্গালিদের দমন করতে ও মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা করতে। চীন এখন নীরব রোহিঙ্গা ইস্যুতে।

আমাদের সচেতন হতে হবে, সতর্ক থাকতে হবে। বাংলাদেশ জঙ্গীবাদের ঘাটির জন্য একটি বিশেষ স্থান হিসেবে বিবেচিত না হয়। এখান থেকে মিয়ানমারে ও ভারতে জঙ্গী হামলা চালানো যায়। আন্তর্জাতিক রাজনীতি বড়ই জটিল।

অনেকে ফেসবুকে না বুঝে অনেককিছু লিখে, তাদের সতর্ক হতে হবে। আমরা যেন মানবতা রক্ষার নামে জঙ্গীবাদকে উস্কে না দেই। ইতিহাস জানুন, তারপর মতামত দিন। আবেগপ্রবণ হয়ে কিছু লিখবেন না।

স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান-এর সুযোগ্য কন্যা জননেত্রী ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে দরজা উন্মুক্ত করেছেন। প্রধানমন্ত্রী মানবতার রক্ষায় এগিয়ে এসেছেন। তাঁর উদ্যোগের ফলে লাখ লাখ রোহিঙ্গা জীবন ফিরে পেয়েছে। তাঁকে লন্ডনভিত্তিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম চ্যানেল ফোর টেলিভিশন মাদার অব হিউমেনেটি (মানবতার জননী) হিসেবে আখ্যায়িত করে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রবেশ করেন, আনাস নামের আহত রোহিঙ্গা শিশুর সাথে কথা বলেন। এরপর সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন।

একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে চ্যানেল ফোর, তা দেখেছে তাৎক্ষণিক প্রায় ৮০ হাজার মানুষ। সেখানে ওয়াই ওয়েন্সটন মিন নামের এক নারী লিখেছেন, ‘না বাংলাদেশ তোমরা কোনোভাবেই গরীব নও, বরং তোমরা হৃদয়ের দিক থেকে অনেক ধনী। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে কথিত ধনী রাষ্ট্রগুলোর শিক্ষা নেয়া উচিত।’

শুন হে মানুষ ভাই সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই। তাই রোহিঙ্গারা মানুষ, তাদের রক্ষা করা মানবিক দায়িত্ব সবার। আমরা রোহিঙ্গাদের জন্য কী করতে পারি। তারা ভিটে মাটি সহায় সম্বল সব ছেড়ে জান বাঁচাতে অনেকে এক কাপড়ে বর্ডার পার হয়ে চলে এসে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছে।

আমরা সাধারণ মানুষ যা করতে পারি-

১. নিজের সামর্থ অনুযায়ী অর্থ সাহায্য দিতে পারি, কোনো বিশ্বস্ত সংগঠন বা সংস্থাকে। ২. নিজের অব্যবহৃত ভালো মানের পরিধেয় সামগ্রি দিতে পারি। তা হতে পারে জুতা, জামা শাড়ী, প্যান্ট, শার্ট, বাচ্চাদের কাপড় ইত্যাদি। ৩.  রোহিঙ্গাদের জন্য সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করতে পারি।

আমরা আজ মানুষ সত্যকে প্রাধান্য দিতে চাই। রাখাইনের রোহিঙ্গাদের ভাষা ও চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা একই ঢংয়ের। তাদেরকে নিজের ভেবে মানবতার জয়ে এগিয়ে যেতে পারি। 

আমি ১৯৯৫ সালে মিয়ানমারের রাজধানী ইয়াংগুনে (রেঙ্গুনে) ছিলাম ২১দিন। Asia YMC-এর একটি সামাজিক নেতৃত্ব বিষয়ক ট্রেনিং এ যোগদান করতে। তখন আমি চট্টগ্রাম ওয়াই এমসিএ’র এডমেনেট্রিটিভ সেক্রেটারি। সেই সুবাদে ট্রেনিং এ অংশগ্রহণের সুযোগ আসে। সেই সময় মিয়ানমারে সামরিক বাহিনীর তৈরি সরকারের শাসন। অং সান সু চি মিয়ানমার ডেমোক্রেডিক পার্টির লিডার। তিনি গৃহবন্দী। কোথাও যেতে পারেন না। আমাদের ট্রেনিং-এর শেষদিকে একদিন শনিবার আমরা ট্রেইনিরা রেঙ্গুন বিশ্ববিদ্যালয় দেখতে গেলাম। একজন বার্মিজ ইয়ানগুন ওয়াইএমসিএ স্টাফের সাথে আমি সুসম্পর্ক তৈরি করি। তার মাধ্যমে অং সান সু চির বাসার গেইটে যাই। গিয়ে দেখি রাস্তায় অনেক লোক বসা। দু পার্শ্বের রাস্তার একপাশ বন্ধ। একটু পরে মিয়ানমারের গণতন্ত্রের নেত্রী অং সান সু চি এলেন একটি জিপ গাড়িতে। জিপ গাড়ির পিছনে দাঁড়িয়ে তিনি ভাষণ দিলেন বার্মিজ ভাষায়। কিছুই বুঝলাম না। আসার আগে ওনাকে হাত উঠিয়ে অভিবাদন জানালাম, সাথে বললাম বাংলাদেশ। ছবি তোললাম। পরে ওয়াইএমসিএতে আসার পর আমাকে মিয়ানমার ওয়াইএমসিএ’র জেনারেল সেক্রেটারি বললেন বিদেশি হিসেবে যাওয়া ঠিক হয়নি। কারণ সামরিক সিভিল সরকারের ৩ স্তরের ইন্টেলিজেন্স সব মুভমেন্ট নজরে রাখে। তিনি সন্দিহান আমাকে কেউ ফলো করেছে কি না, তবে কিছুই হয়নি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষণে অং সান সু চি মিয়ানমারের আর্মির বাইরে কোনো কথা বলতে পারছেন না। প্রশাসনে ঘাপটি মেরে থাকা আর্মিরা আবার সচল। সু চি ক্ষমতায় গিয়ে নিজের দলের লোকদের প্রশাসনে বসাতে পারেনি। যেটাকে বলে রিফরমেশন, তা করতে পারেনি সু চি। এ ছাড়া মিয়ানমারে বিভিন্ন প্রদেশে বিদ্রোহী দলগুলো সু চির প্রতি একাত্নতা প্রকাশ করেনি। সু চি এখনও আর্মির হাতের পুতুল। আমাদের দেশে প্রশাসনে ঘাপটি মেরে থাকা দেশের শত্রদের কি সম্পূর্ণ চিহিৃত করা গেছে।

সবশেষ বলব, রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে জঙ্গীবাদ যেন প্রাধান্য না পায়, ধর্মের নামে কোনো ইস্যু তৈরি না হয়, মানবতার যেন জয় হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। বিশ্বে এটা প্রমাণিত হোক বাংলাদেশের মানুষ নিম্নমধ্য আয়ের দেশের হলেও সকলের হৃদয়ে আছে বিশাল মানবতা।

লেখক : সাংবাদিক

ফেমাসনিউজ২৪/আরঅ্যা/আরইউ