logo

বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২০ | ৬ কার্তিক, ১৪২৭

header-ad

আপনি ক্যান্সারে আক্রান্ত না অন্তরীণ, জাতিকে স্পষ্ট করুন

ড. সরদার এম. আনিছুর রহমান | আপডেট: ০৪ অক্টোবর ২০১৭

সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় প্রকাশের পর সরকারের মন্ত্রী-এমপিদের বক্তৃতা-বিবৃতি থেকে আগেই কিছুটা আঁচ করা যাচ্ছিল প্রধান বিচারপতির জন্য সামনের পরিস্থিতি কেমন হতে পারে। তবে এতোটা লজ্জাস্কর পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হবে তা নিজেতো নই, গোটা দেশবাসীও কখনো ভাবতে পারেনি। এরপরও আজ তা কঠিন বাস্তবতা।

গত ৮ সেপ্টেম্বর যখন বিচারপতি সিনহা তার অসুস্থ্য মেয়েকে দেখতে কানাডা যান ওই সময়ই দেশে একটা রব উঠেছিল তিনি আর দেশে নাও ফিরতে পারেন। কিন্তু ওই গুজবকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে কানাডা থেকে জাপান হয়ে ২৩ সেপ্টেম্বর তিনি ফিরেন। বিদেশ সফরকালে কিংবা দেশে ফেরার পর সিনহা সাহেব সামান্যতম অসুস্থতা অনুভব করেছেন বলে কোনো তথ্য নেই। এমন কী দেশে ফিরেও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যোগ দিলেন। যথারীতি একজন সুস্থ মানুষ হিসেবে রাষ্ট্রপতির সঙ্গেও দেখা করলেন। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সর্ববৃহৎ অনুষ্ঠানেও গেলেন। হঠাৎ করেই সোমবার জানা গেল প্রধান বিচারপতি সিনহা অসুস্থতার কারণ উল্লেখ করে একমাসের ছুটি চেয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে চিঠি পাঠিয়েছেন। এই খবরটিও আবার প্রধান বিচারপতির দপ্তর, ব্যক্তিগত সহকারী কিংবা তার পরিবারের কোনো সদস্য দেননি। দিয়েছেন সরকারের আইনমন্ত্রী ও রাষ্ট্রের প্রধান আইন কৌশলী।

প্রথমে অসুস্থতার কথা জানানোর পর কিছুটা প্রতিক্রিয়া দৃশ্যমান হলে পরিস্থিতি মোকাবেলায় পরবর্তীতে আরেকটু এগিয়ে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক খবর দিলেন প্রধান বিচারপতি সিনহা ক্যান্সারে আক্রান্ত। এরপর যা হবার তাই হলো-রাতের আঁধারেই প্রজ্ঞাপন জারি করা হলো। মঙ্গলবার সকালেই আবার ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি বিচারকার্য পরিচালনা করলেন।

অন্যদিকে প্রধান বিচারপতি সিনহার অসুস্থতার খবর পেয়ে সোমবার বিকেলেই দেখা করতে তার বাসভবনের সামনে যান সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নেতারা। কিন্তু তাদেরকে ভেতরে প্রবেশে অনুমতি দেয়া হলো না। সেখানকার পরিস্থিতি এতোটাই কড়াকড়ি যে অন্য কাউকেও গত দুইদিন থেকে ভেতরে ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না বলে জানা যাচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বাসভবনটি ঘিরে খুবই সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

আরো বিস্ময়ের বিষয়- দেশের প্রধান বিচারপতির মতো একজন রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদের ব্যক্তি অসুস্থ হলেন আর সরকারের কেউ তাকে দেখতে গেলেন না। সরকারের প্রধান আইন কৌঁশলী এতো কাছাকাছি অবস্থানে থেকেও বললেন, বিচারপতি সিনহা কোথায় আছেন তা তিনি জানেন না!

আইনমন্ত্রীর মুখ থেকে যখন শুনলাম প্রধান বিচারপতি ক্যান্সারে আক্রান্ত সত্যিই তখন বিস্মিত হয়েছি। কেননা, একজন মানুষ হঠাৎ অসুস্থ হয়ে যেতে পারেন, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ক্যান্সারের মতো জটিল রোগে হঠাৎ করে আক্রান্ত হওয়া স্বাভাবিক নয়! তাও আবার প্রধান বিচারপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, যারা নাকি সবচেয়ে ভালো ভালো খাবার গ্রহণ করেন, সব ধরনের ক্যান্সারবাহী ক্ষতিকর খাবার-দাবার ও নেশা থেকে মুক্ত।

ধরেই নিলাম তিনি অসুস্থ এবং ক্যান্সারে আক্রান্ত। কিন্তু আইনমন্ত্রীর মুখ থেকে কেন এমন একটি ভয়ঙ্কর খবর শুনতে হলো দেশবাসীকে? দেশে কী কোনো বিশেষায়িত চিকিৎসালয় ও চিকিৎসক নেই। আর ক্যান্সারের মতো একটি প্রাণঘাতি রোগে আক্রান্ত হয়ে কেনইবা তিনি জরুরি ভিত্তিতে কোনো হাসপাতালে ভর্তি না হয়ে বাসভবনে অবস্থান নিলেন? এসব অনেক প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে জনমনে।

প্রসঙ্গত, এর আগে প্রধান বিচারপতি সিনহা এমন রোগে আক্রান্তের খবর কোনোদিন শোনা যায়নি। এমন কি বিচারপতি সিনহা দেশ-বিদেশের কোনো হাসপাতালে এমন রোগের চিকিৎসা নিয়েছেন কিংবা কোনো পরীক্ষায় এ রোগ তার শরীরে বাসা বেঁধেছে এমন তথ্যও কারো কাছে নেই। ক্যান্সার রোগটি এমন এক মরণব্যাধি যার তড়িত চিকিৎসা না করালে স্বল্প দিনের ব্যবধানেই মানুষ মৃত্যুকোলে ঢলে পড়েন। এমন এক জটিল রোগে আক্রান্ত হয়েও তিনি কোনো হাসপাতালে চিকিৎসা নিলেন না, এমন কী বিদেশে গিয়েও বিনা চিকিৎসায় ফিরে আসলেন! আবার দেশে ফিরে মাস খানেক সময় স্বাভাবিক চলাফেরার পর হঠাৎ করেই অসুস্থ। আবারো কোনো হাসপাতালে ভর্তি না হয়ে বাসভবনে অন্তরীণ দশা। এসব কিছু দেশবাসী সহজেই মেনে নিতে পারছেন না।

পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে প্রধান বিচারপতি সিনহা আজ কঠিন পরিস্থিতির শিকার। নিজের কী অবস্থা তাও কাউকে জানাতে পারছেন না। যদিও অসুস্থ থাকেন তাতেও এই অসুস্থ মানুষটির সঙ্গে কাউকে দেখা করারও সুযোগ দেয়া হচ্ছে না। ফলে সহজেই অনুমেয় পরিস্থিতি কতটা জটিল। কেউ স্বীকার করুক আর নাইবা করুক, এটা সত্য যে- প্রধান বিচারপতি আজ অন্তরীণ দশায় পড়েছেন। আবার শুনছি- অন্তরীণ অবস্থায় তাকে দু’একদিনের মধ্যে বিদেশে পাঠিয়ে দেয়া হতে পারে। আর এমনটি হলে যে- জাতির চরমদৈন্যতারই বহিঃপ্রকাশ ঘটবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

ধরেই নিলাম, প্রধান বিচারপতি সিনহা ক্যান্সারে আক্রান্ত। এর জন্য কী দেশ-বিদেশে কোনো চিকিৎসা নেই। এছাড়া সুদীর্ঘ জীবনে তার কী কোনো বন্ধু-বান্ধব ও স্বজন নেই, যারা তার শারীরিক অবস্থার খোঁজ নেয়ার অধিকার রাখেন? অবশ্যই আছে, কিন্তু সবই করা হচ্ছে শাসকগোষ্ঠীর ইশারায়।

ইতোপূর্বে আমরা ইয়াজ উদ্দিনকে অন্তরীণ করে রাখার ফকরুদ্দিন-মঈনুদ্দিনের রসায়ন দেখেছি। দেখেছি ৫ জানুয়ারির নির্বাচনী খেলা, দেখেছি আন্দোলন থামাতে বালুর ট্রাক দিয়ে খালেদাকে অন্তরীণ করে রাখার নাটক। আর দুলাভাই এরশাদকে তো সুইসাইড করতেও দেওয়া হয় নাই। ফলে বলা যায়- কাকে কিভাবে সোজা করতে হয় তা আমাদের শাসকগোষ্ঠীর ভাল করেই জানা আছে।

আজ প্রধান বিচারপতি সিনহার জন্য খুবই কষ্ট হয়। ‘সুখে খেতে ভুতে কিলায়’ বেচারা এমন পরিস্থিতি কেনইবা করতে গেলেন। দীর্ঘ ছয় দশকেরও বেশি সময়ের জীবন তো ভালই কাটছিল। একজন সাধারণ আইনজীবী থেকে দেশের বিচারবিভাগীয় সর্বোচ্চ পদে আসীন হলেন। দেদারছে যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি দিচ্ছিলেন! শাসন বিভাগের সঙ্গে বেশ উষ্ণ সম্পর্কও ছিল। সবকিছুই তো ভালই চলছিল। কেন যে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর মতো একটি রায় দিতে গেলেন। যাদের বদৌলতে এতো বড় আসনে আসীন, তাদের বিরুদ্ধেই রায়, তাদের সরকারের বৈধতা নিয়েই কথা, এ আবার কেমন কথা! স্বাভাবিক কারণেই শাসকগোষ্ঠীর তা মেনে নেয়া কষ্টকর।

আর রায় দিলেন তো ভাল কথা, এখন আবার কাপুরুষের মতো লুকোচুরি খেলছেন কেন? এ পরিস্থিতি আপনার নিজের জন্য যেমনটি ভাল হচ্ছে না তেমনি জাতির জন্যও নয়। বাংলা সাহিত্যে একটি বহুল প্রচলিত প্রবাদ আছে- ‘যার শেষ ভালো তার সব ভালো’। ফলে এখনো কয়টা দিন বাকী আছে আপনার ঘুরে দাঁড়ানোর।

ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ রায় দিয়ে যে ভূয়সী প্রশংসার কুঁড়িয়েছিলেন তা বজায় রাখার। দেশের ইতিহাসে এই ‘ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী রায়ের’জন্য নিজের নাম নতুনভাবে লিপিব্ধ করার। সাহস থাকলে বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে জাতির সামনে কথা বলুন, নিজে সুস্থ না অসুস্থ,ক্যান্সারে আক্রান্ত না শাসকগোষ্ঠীর চাপে মানসিক রোগী তা জাতির সামনে পরিস্কার করুন। অন্যথা গোটা জাতিকে অন্ধকারে রেখে আপনি যাই করুন না কেন, তা জাতির সঙ্গে মোনাফিকী হবে। এতে ভবিষ্যতে ইতিহাসের পাতায় আপনার নাম লিখা হবে জাতীয় বেঈমান হিসেবে। ফলে এখন আপনাকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে আপনি কোনটা চান। গোটা জাতি তাকিয়ে করছে আপনার দিকে।

সিনহা সাহেব, আপনার তো স্মরণ থাকার কথা- পাকিস্তান আমলের বিচারপতি মোর্শেদের কথা। যিনি শাসকগোষ্ঠীর রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে যুগান্তকারী রায় দিয়ে ইতিহাসের পাতায় নিজের নাম লিখিয়ে গেছেন। তিনি তো সেদিন কোনো আপোস করেননি। তার প্রবাদসম সাহসিকতা ও প্রচণ্ড সাহসী রায় তৎকালীন সরকারকে ঘাবড়িয়ে দিয়েছিল। তাই সরকার বিভিন্নভাবে তার ওপর চাপ সৃষ্টি করে যাচ্ছিল। কিন্তু বিচারপতি মোর্শেদ ছিলেন প্রচণ্ড ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ও বিবেকবান মানুষ। যখন দেখেছেন তিনি বিবেক দ্বারা তাড়িত হয়ে বিচার করতে পারছেন না, প্রধান বিচারপতির পদ থেকে নিজেই পদত্যাগ করে ১৯৬৭ সালের ১৬ নভেম্বর দেশের গণমানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। সিনহা সাহেব, আজ আপনার সঙ্কটকালে বিচারপতি মোর্শেদ আপনার অনুপ্রেরণা হতে পারে।

এখন আপনার সামনে দুটি পথই খোলা আছে- নির্বাহী বিভাগের সঙ্গে আপস করে নতি স্বীকার করা কিংবা কোনো ধরনের চাপে নতি স্বীকার না করে দেশের বিচারবিভাগকে অনন্য মর্যাদায় মর্যাদাশীল করা।

যে যাই বলুক, বর্তমান পরিস্থিতিটা শুধু বিচারপতি সিনহার জন্যই জটিল নয়, এটা গোটা জাতির জন্য টার্নিং পয়েন্ট। কেননা, প্রধান বিচারপতি সিনহার ওপরই নির্ভর করছে আগামী দিনে দেশের বিচার বিভাগের প্রতি দেশবাসীর আস্থা থাকবে কি থাকবে না, দেশে আইনের শাসন থাকবে কি থাকবে না। গোটা জাতি তা দেখতে এখন অধীর অপেক্ষায়।

সবশেষে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান রাখবো- এই অপ্রত্যাশিত রায়ের জন্য ক্ষুব্ধ হলেও প্রধান বিচারপতির এই সঙ্কটকালে সব ভুলে গিয়ে অন্তত তাকে বাঁচার সুযোগ দিন। ক্যান্সারের মতো মরণঘাতি রোগের চিকিৎসা নিতে সুযোগ দিন, অন্তরীণদশা থেকে পরিত্রাণ দিয়ে জীবনমৃত্যুর এই সন্ধিক্ষণে অন্তত তার সঙ্গে স্বজন ও সহকর্মীদের দেখা করার সুযোগ দিন। সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হকের মতো ১০ লাখ টাকা দিতে না পারলেও প্রধানমন্ত্রীর তহবিল থেকে অন্তত ২-১ লাখ টাকা দিয়ে তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করুন, তার জীবন বাঁচান। আর তাও না পারলে তাকে অন্তরীণ অবস্থা থেকে মুক্তি দিন আমরা দেশবাসী চাঁদা দিয়ে বিচারপতি সিনহার চিকিৎসার ব্যবস্থা করবো। এটা দেশবাসীর গুরু দায়িত্ব, অন্যথা প্রধান বিচারপতি সিনহা বিনা চিকিৎসায় ক্যান্সারে মারা গেলে আমরা সবাই দায়ী থাকবো।

লেখক: শিক্ষা, সমাজ ও রাজনীতিবিষয়ক গবেষক।