logo

বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২০ | ৬ কার্তিক, ১৪২৭

header-ad

সুন্দরী প্রতিযোগীতাগুলো পুরুষের বাহুডোরে নারীদরে জাপটে রাখার কৌশল মাত্র

রেজওয়ান সিদ্দিকী অর্ণ | আপডেট: ০৫ অক্টোবর ২০১৭

এক : পশ্চিমা বিশ্বের অনুকরণ বাংলাদেশে গত কয়েক দশক ধরে বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতায় সুন্দরী প্রতিযোগীতা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। যদিও বিভিন্ন সময়ে এইসব প্রতিযোগীতা নানাভাবে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সবশেষ সেই বিতর্কে যুক্ত হয়েছে 'মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ'র নাম। অভিযোগ উঠেছে আয়োজক প্রতিষ্ঠান বিজয়ী নির্বাচনের ক্ষেত্রে পক্ষপাতিত্বের আশ্রয় নিয়েছে। মঞ্চে উপস্থাপিকা বিজয়ী হিসেবে যার নাম ঘোষণা করেছিলেন ঠিক কিছু সময় পর আয়োজক প্রতিষ্ঠানের প্রধান নাম বদলে অন্য একজনের নাম ঘোষণা করেন। তারপর থেকে আরম্ভ হয় সমালোচনা। মনে করা হচ্ছে বিশেষ কোনো কারণে বিজয়ীর নাম বদলে দেয়া হয়। যার সত্যতা পাওয়া যায় গণমাধ্যমে বিচারকদের বিভিন্ন মন্তব্যে থেকে।

আসলে কি এখানে পক্ষপাতিত্ব করা হয়েছে? মনের ভেতর এমন প্রশ্ন উঁকি দিলেও দিতে পারে। তবে এর উত্তর পেতে নিজের উপলব্ধি করার ক্ষমতাকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে কাজে লাগাতে হবে। এই লেখায় কে কার পক্ষ নিলো সে বিষয়ে কিছু বলা হবে না। তবে একই বিষয়ে ভিন্ন এক দিক এই লিখিত আলোচনার বিষয়বস্তু। বলা যায় বিষয়টি আজ এই সময়ে বেশ প্রাসঙ্গিক।

আমরা অনেক সময় নারী স্বাধীনতার কথা বলি। নারীদের অধিকারের কথা বলি। নারীদের উন্নয়নের কথা বলি। অথচ কখনো এইসব সুন্দরী প্রতিযোগীতার বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলি না। কখনো বলতে শুনিনা-সুন্দরী প্রতিযোগীতাগুলো নারীদের কেবলই পুরুষের বাহুডোরে জাপটে রাখার কৌশল মাত্র। সবার আগে সুন্দরী প্রতিযোগীতার বিরুদ্ধে জনমত গঠন করার প্রয়োজন ছিলো। শ্লোগান তোলা উচিত ছিলো-সুন্দরী প্রতিযোগীতাকে না বলি। তা না বলে আমরা চুপ থাকছি। বাহবা দিচ্ছি। আবার সঠিক বিচার হয়নি বলে সমালোচনা করছি।

তৃতীয় বিশ্বের একটি উন্নয়নশীল দেশ বাংলাদেশ-যেখানে চালের কেজি ৭০ টাকা, এখনো দু’বেলা মানুষ ঠিক মতো খেতে পারে না, বন্যা কিংবা ঝড় হলে বেঁচে থাকা নিয়ে সংশয় দেখা দেয়। আর রাজনৈতিক বিভাজন লেগে থাকাসহ বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত একটি দেশে সুন্দর দেহসৌষ্ঠবের নারী খুঁজে বের করছে জেনে আনন্দে আটখানা না হয়ে এর বিপক্ষে অবস্থান কেনো করছি? এই ধরনের প্রশ্ন হঠাৎ করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠলে উত্তর জানতে পুরো লেখাটি পড়তে হবে।

পুরো বিশ্ব আজ পুঁজিবাদীদের দখলে। তারাই বিশ্বকে হাতের মুঠোয় নিয়ে শাসন করছেন। যুগ যুগ ধরে এই পুঁজিবাদ চর্চা করে আসছে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো। এইসব বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান নারীদের পুঁজি করে পণ্যের প্রচার-প্রসারে ব্যবহার করছে। যেখানে নারীদের সুকৌশলে পণ্য হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রগতিশীল নারীরা অর্থ আর খ্যাতির লোভে নিজেদের ভোগ্যপণ্য হিসেবে মেনে নিতে আপত্তি করেন না। তাদের মতে এভাবেই একজন নারী অনেকদূর এগিয়ে যাবে। এভাবে এগিয়ে যাওয়া নারীদের কতোটা সম্মানিত করে সেটাই বড় কথা! আরো একটু বিস্তারিত বলা যেতে পারে। সুন্দরী প্রতিযেগীতায় হাজার হাজার মেয়ের মধ্য থেকে হাতে গোনা কয়েকজন সুন্দরী নির্বাচন করা হয়। তারা মোটা অংকের টাকা, গাড়ি পুরস্কার পাওয়ার সাথে পণ্যের বিজ্ঞাপনে মডেল হওয়ার সুযোগ পান। সাধারণ দর্শক হিসেবে সাদা চোখে দেখলে ইতিবাচক মনে হবে। একটু মস্তিষ্ক খাটিয়ে বিশ্লেষণ করলে বোঝা যাবে, সুন্দরী প্রতিযোগীতার মাধ্যমে নারীদের ফাঁদে ফেলানো হচ্ছে। ক্রমাগত তাদেরকে ভোগের বস্তু বানিয়ে বেনিয়া গোষ্ঠী স্বার্থ উদ্ধার করে থাকে। প্রতিযোগীতায় ব্যয় করা অর্থের কয়েকগুণ উঠিয়ে নেয় খুব সহজে।

একটি সুন্দরী প্রতিযোগীতায় যখন কোন নারী অংশগ্রহণ করে তখন তার মেধাশক্তি, দক্ষতার চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়ায় স্তন এবং নিতম্বের সৌন্দর্য্য। কে কতোটা স্বল্প বসনা পরে বক্ষ উঁচু করে নিতম্ব দুলিয়ে বিড়ালের মতো হাঁটতে পারে (ক্যাট ওয়াক) তার উপর নম্বর দেয়া হয়। নারীর দেহের স্পর্শকাতর অংশের আকার বিচারকদের মনঃপুত হতে হবে। নতুবা বাদ। সুতরাং বিখ্যাত হতে হলে পুরুষের লোলুপ দুষ্টিকে উৎসাহিত করতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রিন্সটোন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষনায় দেখা গিয়েছে- “স্বল্প বসনা পরহিত নারী বা যৌন উদ্দীপক নারীর ছবি দর্শনে পুরুষের মস্তিষ্কের যে অংশটি সক্রিয় হয় ,সেই একই অংশটি সক্রিয় হয় যখন কোন স্ক্রু ড্রাইভার বা সাঁড়াশি জাতীয় কোন যন্ত্র ব্যবহার করে। তাছাড়া এ ধরনের ছবি দেখলে মস্তিষ্কের যে অংশটি অপরের ইচ্ছা এবং আবেগ বিবেচনা করে সে অংশটি নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়।”

তাহলে এ থেকে বোঝা যায় স্বল্প বসনা পরিধান করে যৌন উদ্দীপনা ছড়িয়ে পুরুষের কামনা-বাসনার খোরাক হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন করে। যখন কোন বিজ্ঞাপনে কোন নারী মডেল যৌন উত্তেজক ভঙ্গিমার মাধ্যমে পণ্য প্রচারের প্রচেষ্টা চালায় তখন পুরুষের বোধশক্তি অকার্যকর হয়ে তাদের লুকায়িত মনের যৌনতাকে উসকে দেয়। আর এই উসকে দিতে পারাটাই তাদের সফলতা। এতে যে শুধু পুরুষ উৎসাহিত হচ্ছে তা নয়। নারীরাও রয়েছে। তারা কখনো কখনো সেটা অনুকরণ করতে গিয়ে পুরুষের কাছে নিজেকে যৌনতার প্রতীক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করে। তাদের সাজসজ্জা, পোষাক পরিধান-সবই পুরুষদের আকৃষ্ট করার জন্য। এমনকি নিজেদের কতোটা সুন্দরী লাগছে সেটার স্বীকৃতিও পুরুষদের কাছ থেকে নিয়ে থাকে। আয়নায় দেখা নিজের উপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে।

দুই : আরম্ভ করেছিলাম মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ প্রতিযোগীতা দিয়ে। সে বিষয়ে কিছু বলে আলোচনার ইতি টানবো। এভ্রিল নামে যে মেয়েটাকে চূড়ান্ত প্রতিযোগীতায় বিজয়ী ঘোষণা করা হয় সে মেয়েটি আসলে আয়োজক প্রতিষ্ঠানের পছন্দের কারণে বিজয়ী হয়েছেন। এমন অভিযোগ সবখানে। বিচারকের নম্বরের যে তালিকা প্রকাশ পেয়েছে তাতে এর সত্যতা পাওয়া যায়। বিচারকরা যাকে বেশী নম্বর দিয়েছে তাকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়নি। এর জের ধরে এভ্রিলের অতীত সামনে চলে আসে। সমালোচনার পালে আরো বেশী হাওয়া লাগে। অভিযোগ আরো মজবুত হয়। এভ্রিল বিবাহিতা ছিলেন। তবে তালাকপ্রাপ্ত। সেটা সে লুকিয়ে প্রতিযোগীতায় অংশগ্রহণ করেছে। প্রতিযোগীতায় অংশগ্রহণের প্রধাণ শর্ত ছিলো, অবিবাহিত হতে হবে। কোন সন্তান জন্ম দেয়া যাবে না। এখন কথা হলো, একজন নারী কি বিয়ের পর সুন্দরী হতে পারে না? নাকি বিয়ের পর নারীদের সৌন্দর্য্য হারিয়ে ফেলে? সুন্দরী প্রতিযোগীতায় সৌন্দর্য্যটাই প্রাধান্য পাওয়ার কথা। বিবাহিতা-অবিবাহিতা বিষয়টি মূখ্য হওয়ার কোন যৌক্তিকতা নেই। যে বিবাহিত নারী সন্তান জন্মদানের পরও নিজের সৌন্দর্য্যকে ধরে রাখতে পারে সেই তো প্রকৃত বিজয়ী। যদি সুন্দরী প্রতিযোগীতার মাধ্যমে অবিবাহিত নারীকে ভোগের বস্তু বানানোর ইচ্ছা থাকে তাহলে সেটা ভিন্ন কথা। অপ্রিয় হলেও সত্য, এসব ক্ষেত্রে অবিবাহিতা নারীদের বেশ চাহিদা থাকে।

এভ্রিল ভুল করেছেন যে, তিনি সত্য তথ্য গোপন করেছেন। হয়তো তিনি চেয়েছিলেন তথ্য গোপন করে আর্ন্তজাতিক পরিমন্ডলে নিজেকে পণ্য হিসেবে তুলে ধরতে। বিধি বাম হওয়ায় সত্যটা বেরিয়ে আসে। সত্য বেরিয়ে আসার পর তিনি বিয়ের কথা স্বীকার করলেও বাল্য বিবাহের কথা উল্লেখ করেন। জোর করে সেই বিয়ে দেয়া হয় সেটাও তিনি চোখের জলে একাকার হয়ে বলেন। যদিও তখনকার বিয়ের ভিডিও একটু ভালো করে বিশ্লেষণ করলে বোঝা যাবে তিনি বিয়ের সময় কতোটা উচ্ছ্বসিত ছিলেন। পুরো সত্য প্রকাশ হওয়ার পরও তিনি মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছেন। বিষয়টি লজ্জাজনক! এদিকে এভ্রিল একা দোষী তা নয়। এর দায়ভার আয়োজক প্রতিষ্ঠান এড়াতে পারবে না। তারা কিসের স্বার্থে, কেন এভ্রিলকে পক্ষপাতিত্ব করে বিজয়ী ঘোষণা করলেন সে বিষয়ে খতিয়ে দেখলে হয়তো কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে সাপ বেরিয়ে আসতে পারে।

তিন : এভ্রিল অবশ্যই একজন সুন্দরী মেয়ে। চট্টগ্রামের মফস্বল শহর থেকে এসে এতোদূর পথ পাড়ি দেয়া (যেভাবেই হোক) সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে। এজন্য সে বাহবা পেতেই পারেন। তবে এভ্রিল কিংবা এভ্রিলের মতো মেয়েরা কি কখনো ভেবে দেখেছেন-এই সুন্দরের ভবিষ্যৎ কি? যখন শরীর নামক পণ্যটার চাহিদা কমে যাবে তখন কি হবে? স্বপ্ন ভঙ্গ, একরাশ হতাশা আর গ্লানি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করবেন মিডিয়ার প্রতি। ফেসবুক লাইভ বা অন্য কোন মাধ্যমে বর্ণনা করবেন অন্ধকার জগতের কথা। ইদানিং সুন্দরী প্রতিযোগীতা থেকে আসা অনেকে এমনটি করছেন। ফেসবুক ঘুরলেই চোখে পড়বে। হাজারো স্বপ্ন নিয়ে সুন্দরী প্রতিযোগীতায় আসা মেয়েরা এসবকিছু থেকে শিক্ষা নিতে পারেন। সুন্দরী হতে সুন্দরী প্রতিযোগীতার প্রয়োজন হয় না। এই বিশ্বাস সবসময় নিজের ভেতর রাখতে হবে। সৌন্দর্য্য সবসময় আত্মকেন্দ্রিক। একে পুরুষের সামনে ভোগের বস্ত হিসেবে হাজির করে নিজেদের কুক্ষিগত করে রাখার মাঝে কোন কৃতিত্ব নেই। গিলবার্ট তাই যথার্থ বলেছেন- “নারীর রূপ তথা দৈহিক সৌন্দর্য্য নিঃসন্দেহে বিরাট এবং মনোহর এক ঐশ্বর্য, কিন্তু তাদের অন্তরের সৌন্দর্য্য আরো বেশী মূল্যবান।”

নারী এগিয়ে যাক মেধা আর দক্ষতা দিয়ে। পণ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে নয়। তারকাখ্যাতির জন্য এমন কিছু করা উচিত নয় যা নারীকে কেবলই অবদমিত করে রাখবে। এ বিষয়ে নারীদেরকে সচেতন হতে হবে। তবেই হবে নারীর জয়।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট