logo

রবিবার, ১৭ ডিসেম্বর ২০১৭ | ৩ পৌষ, ১৪২৪

header-ad

এখন আর গরুর মতো হাঁটতে হয় না মেয়েদের

শামীমুল হক | আপডেট: ২২ নভেম্বর ২০১৭

বদলে গেছে সবকিছু। বদলে গেছে প্রেম-ভালোবাসা। বদলে গেছে রীতিনীতি, আদব-কায়দা। বদলে গেছে আচার-আচরণও। বদলে গেছে গ্রামীণ সংস্কৃতি এবং নিয়মকানুনও। আগে ঘর থেকে বেরুতে গিয়ে হোঁচট খেলে মুরব্বিরা বলতেন, একটু বসে যাও। মানে আবার ঘরে কিছুক্ষণ বসে বের হতে হতো। ধারণা ছিল হোঁচট মানে কোনো অলক্ষণ। আবার কাউকে কাউকে দেখা গেছে হোঁচট খাওয়া জায়গাকে হাত দিয়ে সালাম করতে। এমন কী সকালে মুচির মুখ দেখলে বেজার হতো সবাই। ভাবতো কি অঘটন জানি সামনে অপেক্ষা করছে। ভয় পেলে নিজের বুকে নিজের থুথু ছিটানোও ছিল একরকম বাধ্যতামূলক। আর চোখ লাফালেও চোখে হাত ছুঁয়ে সেই হাত মুখে চুমো দিতো। এতে নাকি বিপদ কেটে যায়।

আগে মুরব্বিদের দেখেছি, সমাজ অনুযায়ী বসার আসন দিতো। কেউ বাড়িতে এলে দেয়া হতো চেয়ার। আবার কেউ পেতেন পিঁড়ি। আবার কেউ মাদুর। এভাবেই সমাজ পরিচালিত হতো। আগে গ্রামে জিয়াফত কিংবা কোনো অনুষ্ঠানে খাবার দেয়া হতো মাটির বাসনে। আর বসার জন্য উঠানে সারি করে রাখা হতো বাঁশ। সেই বাঁশে বসে জিয়াফত খেতো সবাই। তবে এখানেও ছিল ব্যতিক্রম। কিছু কিছু মানুষকে ঘরের মধ্যে চৌকিতে বসিয়ে আদর করে খাবার দিতো। তাদের জন্য থাকতো কাঁচের প্লেট।

আগেকার দিনে বেশিরভাগ মানুষ খুতখুতে ছিলেন। বউ-ঝিরা বাড়ির বাইরে যাবে- এমন সাধ্য ছিল না। ফকির এলেও দরজার আড়াল থেকে দেয়া হতো ভিক্ষা। নানা নিয়মের বেড়াজালে বন্দি ছিল সমাজ ব্যবস্থা। রাত-বিরাতে বাড়ি থেকে বের হতেও ছিল বিধি-নিষেধ। ভূত-পেত্নির ভয় ছিল সর্বত্র। এমনও শোনা গেছে, এলাকার কেউ মাছ ধরতে গেছেন। রাতে বিলে নেমে হাত দিয়ে মাছ ধরছেন। আর সেই মাছ রাখছেন নির্দিষ্ট একটি মাছ রাখার বাক্সে। অনেক মাছ ধরার পর ওই বাক্সে হাত দিয়ে দেখেন একটিও মাছ নেই। কিন্তু কিছু চুল হাতে লাগে। সেই চুল শক্ত করে ধরা মাত্রই চিৎকার- আমাকে ছেড়ে দাও। আর মাছ খাবো না। রাগে-ক্ষোভে মাছ ধরা ব্যক্তি তাকে টানতে টানতে বাড়ি পর্যন্ত এনেছে।

আরো শোনা যায় বাঁশঝাড়ের পাশ দিয়ে রাস্তা বয়ে গেছে। গভীর রাতে সেই রাস্তা দিয়ে বাড়ি যাচ্ছে এক যুবক। দেখে একটি বাঁশ রাস্তায় পড়ে আছে। যেই মাত্র বাঁশটি ডিঙিয়ে পার হতে যাচ্ছে অমনি বাঁশ সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গেছে। ওই যুবকও বাঁশের আগায়। এসব নাকি ভূতের কাজ। পরে তার চিৎকারে লোকজন এসে তাকে নামিয়ে বাড়ি নিয়ে যায়। রাতেই গরম পানি করে গোসল করানো হয়। এরপর ঘরে নেয়া হয়। কথায় কথায় জিনে ধরা গ্রামে কোনো ব্যাপারই ছিল না। জিনে ধরার পর হুজুরের কাছে নিয়ে গেলে হুজুর তার আঙ্গুলের গিরায় চাপ দিয়ে ধরে দোয়া পড়তেন। অমনি জিন চিৎকার করে উঠতো- আমাকে ছেড়ে দাও। আমি আর কোনোদিন আসবো না। কেন এসেছে, কিভাবে এসেছে সব বলার পর তাকে ছেড়ে দেয়া হতো। তবে যাওয়ার আগে প্রমাণস্বরূপ পাশের কোনো এক গাছের ডাল ভেঙে যেতে হবে। তাই হতো।

বিয়ে-শাদিতে নাইওরি আসতো দলে দলে। কেউ নিয়ে আসতো পিঠা। কেউ শখের নানা জিনিস। বিয়ে-বাড়িতে থাকতো মাসব্যাপী উৎসব। কিন্তু তার আগে বউ দেখা নিয়ে হয়ে যেতো নানা কাণ্ড। আগে থেকেই জানানো হতো বউ দেখতে যাওয়ার তারিখ। নির্দিষ্ট তারিখে ছেলেপক্ষ থেকে লোকজন যেতেন কনের বাড়িতে। এ দলে থাকতো ছেলের দাদা, নানা, চাচা, ভাই আবার বোন, ভাবিসহ অনেকেই। মিষ্টি নিয়ে হাজির হতো কনের বাড়িতে। আপ্যায়নের পালা শেষে সবার সামনে গোমটা দেয়া কনেকে আনা হতো। সঙ্গে থাকতো ভাবি সম্পর্কীয় কেউ। সেখানে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখা হতো কনেকে। প্রথমে দেখা হতো চুল। কত লম্বা চুল তা পরীক্ষা করা হতো। এরপর দাঁত দেখা। নাক লম্বা না গোল তাও পরীক্ষা করা হতো। পায়ের গোড়ালি মোটা না চিকন তারও চুলচেরা বিশ্লেষণ হতো। এরপর সর্বশেষ যে কাজটি হতো তাহলো- ছেলের দাদা বা নানা বলতো বোন তুমি একটু হাঁট তো। কথা অনুযায়ী কনের সঙ্গে থাকা ভাবি তাকে নিয়ে হাঁটা প্রতিযোগিতায় নামতো। ঘরের এ মাথা থেকে ও মাথা পর্যন্ত হাঁটতো। এরপর ভাবি বলতো আমার ননদিনী খুব সুন্দর হাঁটে। এরপর মেয়ের হাতে তার স্থায়ী ঠিকানা লিখিয়ে তা পকেটে নিতো ছেলেপক্ষ। এ হাতের লেখা নিয়ে বাড়ি গিয়ে হবে আরেক দফা কথাবার্তা।

এসব দেখে মনে পড়তো গরুর বাজারে কোরবানির গরু কিনে আনার কথা। ব্যাপারীরা গরু নিয়ে আসে হাটে। ক্রেতারা একের পর এক গরু দেখছে। প্রথমেই প্রশ্ন কয়টা দাঁত উঠেছে। এরপর রং কালো না হয়ে লাল ভালো হতো। উঁচা-লম্বা পরীক্ষা শেষে বলা হতো একটু হাঁটাও তো গরুকে। ব্যাপারী সামান্য একটু হাঁটিয়ে দেখাতো ক্রেতাকে। এরপর হতো দরদাম। আগেকার দিনের কনে দেখা আর গরু কেনার মধ্যে কোনো পার্থক্য ছিল না। গরুর মতো কনেকেও হাঁটতে দেখা দৃষ্টিকটুই মনে হতো। এখন অবশ্য দিন বদলেছে। মন-মানসিকতা বদলেছে। এখন গ্রাম কিংবা শহর সব জায়গায়ই ছেলেমেয়ের পছন্দকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়। শহরে কোনো চাইনিজ রেস্টুরেন্ট কিংবা পার্কে নির্দিষ্ট দিনে ছেলেমেয়ে এক হয়। তারা নিজেরা কথা বলে পরিবারকে পছন্দ জানায়। তারপর অভিভাবকরা পদক্ষেপ নেন। তাই এখন আর মেয়েদের গরুর মতো হাঁটতে হয় না।

ত্রিশ বছর আগের কথা। এক পরিচিত জনের কনে দেখার সঙ্গী ছিলাম আমি। যথারীতি কনের বাড়িতে গিয়ে সবকিছু খুঁটিয়ে দেখা হলো। তারপর হাঁটা, পা, চোখ, মুখ, নাক সবই দেখা হলো। সবশেষ জানতে চাওয়া হলো তুমি কতটুকু পড়েছো? কনের উত্তর কাস ফাইভ পর্যন্ত। ঠিক আছে তোমার বাড়ির ঠিকানা লিখে দাও। কনের সামনে খাতা-কলম আনা হলো। কিন্তু কনের লিখতে খুব কষ্ট হচ্ছিল। এ নিয়ে নানাজনে নানা কথা বলছে। এ সময় কনের সঙ্গে আসা তার ভাবি বলে ওঠে ‘আজ সকালেও তোকে এত কষ্ট করে ঠিকানা লেখা শিখালাম এখনই ভুলে গেছোস।’ কথা শুনে উপস্থিত সবাই হেসে উঠেন।

ফেমাসনিউজ২৪.কম/এস/এস