logo

রবিবার, ১৭ ডিসেম্বর ২০১৭ | ৩ পৌষ, ১৪২৪

header-ad

টিকিট কেটে হেঁটে আসা এবং কাওয়া চালাক

শামীমুল হক | আপডেট: ০৫ ডিসেম্বর ২০১৭

লোকটি খুবই খুশি মনে বাড়ি ফিরলেন। স্ত্রীকে ডেকে বললেন, তোমরা আমাকে বোকা বলো। আমি নাকি সব জায়গায় ঠকে আসি। কিন্তু আজ আমি ঠকিনি। ঠকিয়ে এসেছি। স্ত্রী জানতে চাইল- কাকে ঠকিয়েছো? কিভাবে ঠকিয়েছো? লোকটির উত্তর- ট্রেনের টিকিট কেটে হেঁটে বাড়ি এসে পড়েছি। একেবারে ট্রেনওয়ালাদের ঠকিয়ে এসেছি। স্ত্রীকে বলল, কেমন হলো বলতো? স্ত্রীতো একেবারে থ’। সমাজে ওই ভদ্রলোকের মতো অনেকেই আছেন যারা অন্যকে ঠকাতে গিয়ে নিজে ঠকেন। তারপরও নিজে নিজে আত্মতৃপ্তিতে লাফান। অবশ্য কেউ বুঝে এটি করেন। কেউবা না বুঝে।

ধরা যাক, রাজনীতির কথাই। রাজনীতিতে হার-জিত, লাভ-লোকসান হিসাব করেই এগুতে হয়। প্রতিপক্ষের সঙ্গে কখনো কখনো লুকোচুরি খেলায় নামতে হয়। এ খেলায় প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার চেষ্টাও থাকে নিরন্তর। তাহলে প্রতিপক্ষও কি বসে থাকবে? না তারাও নামবে খেলায়। সাবধানে সে খেলায় চাল চালতে হয়। তবে খেয়াল রাখতে হবে খেলতে গিয়ে প্রতিপক্ষের হাতে যেন অস্ত্র তুলে দেয়া না হয়। যে অস্ত্র উল্টো এসে নিজের বুকেই না বিধে। শুধু রাজনীতিই বলি কেন? সমাজের সবক্ষেত্রেই এমন খেলায় মত্ত অনেকেই। কিন্তু খেলতে নেমে নিজেকে জয়ী ঘোষণা দেয়ার অভ্যাস রয়েছে অনেকেরই। অথচ নিজেও জানেন তিনি জয়ী হননি। হেরে বসে আছেন। কিন্তু হার বলতে তার যত আপত্তি। তাই জয় বলতেই হবে। জোর করে হলেও অন্যকে দিয়ে বলাতে হবে। ওই যে কাওয়া চালাকের মতোই।

গ্রামে-গঞ্জে আগে খড়ের ঘর ছিল প্রচুর। কাক মানে কাওয়া কোথাও থেকে কোন কিছু ছোঁ মেরে ঠোঁটে করে নিয়ে আসতো। তারপর গিয়ে বসতো এক খড়ের ঘরের চালায়। ঠোঁটে থাকা সেই বস্তু খড়ের কোনায় গুঁজে রেখে দিতো। এ সময় কাক তার নিজের চোখ বন্ধ করে কাজটি করতো। নিজের চোখ বন্ধ থাকায় পৃথিবী অন্ধকার লাগে নিজের কাছে। এটা দেখে কাক ভাবে কেউ দেখেনি। সমাজে এমন কাক-চালাক মানুষের বসবাস কম নয়।

আবার দেখা যায়, প্রতিপক্ষ এক কথা বলল তো এর বিরোধিতা করতেই হবে। কাজেই প্রতিপক্ষ যা বলেছে তার বিপরীত চলতে হবে। উল্টো দিকে হাঁটতে হবে। এই উল্টো হেঁটে কেউ কেউ পা ভেঙে ফেলে। তখন বলে কপালে ছিল করবো কি? চলতে ফিরতে এমনটা হয়েই থাকে। তারপরও বিরোধিতা করতেই হবে।

এমনও দেখা গেছে, প্রতিপক্ষ ভালো কোনো পরামর্শ দিলেও মনে করে সেটা করা যাবে না। নিশ্চয় এরমধ্যে কোনো মতলব আছে। এভাবেই গর্তে পড়ে। ফাঁদে পড়ে। তাৎক্ষণিক হয়তো তিনি বুঝতে পারছেন না। কিন্তু যখন বুঝতে পারেন সত্যিই প্রতিপক্ষ যে পরামর্শ দিয়েছিল সেমতে চললেই ভালো হতো। তখন আর কিছুই করার থাকে না। আবার এমনও দেখা যায় সমাজে সন্দেহের বাতিক বেশিরভাগ লোকের মাঝে। কোনো কাজ করলেই মনে মনে ভাবে অমুকে করেছে, তমুকে করেছে। এ নিয়ে হয়ে যায় অনেক সময় রক্তারক্তিও। কিন্তু শেষমেশ জানা যায়, যাকে সন্দেহ করা হচ্ছে তিনি কিছুই জানেন না। আসলে সন্দেহ একটি মানসিক রোগ। এ রোগ একবার যাকে কাবু করে তার আর রক্ষা নেই। তিনি এ সন্দেহ রোগ থেকে বেরিয়ে আসতে পারবেন না। আবার হিংসাও আরেক রোগের নাম। এ রোগ ক্যানসারের মতো সমাজকে নষ্ট করে দিচ্ছে। আর পরনিন্দা যার অভ্যাস তার আর রক্ষা নেই। কোনো জায়গায় বসলেই তিনি অন্যের পরনিন্দায় মত্ত হয়ে পড়বেন। তিনি একবারও ভাবেন না তাকে নিয়েও তো এমন পরনিন্দা অন্য কেউ করতে পারেন।

শেষ করতে চাই সম্প্রতি বাংলাদেশ সফর করে যাওয়া পোপ ফ্রান্সিস-এর একটি কথা দিয়ে। তিনি খৃস্টান ক্যাথলিকদের উদ্দেশ্যে দেয়া বক্তৃতায় পরনিন্দা ও পরচর্চা থেকে বিরত থাকতে বলেছেন সবাইকে। পোপের কথা, পরনিন্দা-পরচর্চাও এক ধরণের সন্ত্রাসবাদ। এতে মানব সম্প্রদায়ের শান্তি বিনষ্ট হয়। মানুষ যখন অন্যদের নিয়ে খারাপ কথা বলে, তারা সেগুলো বলে তাদের পেছনে। এটা ওই সন্ত্রাসীদের মতো যারা বলে না যে তারা সন্ত্রাসী কিন্তু পেছনে রেখে যায় প্রাণঘাতী বোমা। এরপর অপর আরেকজন ফের ওই একই পরনিন্দা শুরু করে।

পোপ বলেন, অন্যদের নিয়ে বাজে কথা বললে অবিশ্বাস ও বিভক্তি সৃষ্টি হয়। যা এক পর্যায়ে শান্তি বিনষ্ট করে। পোপ প্রত্যেককে সংযমি হতে এবং যে কোন সমস্যা সমাধানের জন্য সততার সঙ্গে ও খোলামেলা কথা বলার পরামর্শ দেন। বলেন, নিজেদের জিহ্বা সংবরন করুন। চেষ্টা করুন আনন্দ ও শান্তির উদ্যোম ধারণ করার। আসলে মনটা পরিষ্কার করা দরকার সবার আগে। মন পরিষ্কার হলে সামনে সবকিছু দেখা যাবে একেবারে ফকফকা।

ফেমাসনিউজ২৪.কম/এস/এস