logo

মঙ্গলবার, ২৩ জানুয়ারি ২০১৮ | ১০ মাঘ, ১৪২৪

header-ad

রোহিঙ্গা সংকট, প্রয়োজন ধারাবাহিক পররাষ্ট্রনীতি

ফিরোজ আহমেদ | আপডেট: ০৭ জানুয়ারি ২০১৮

চীনের চাপে বাংলাদেশ সম্প্রতি একটা অনির্দিষ্ট চুক্তি করেছে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বিষয়ে, যেখানে ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটিরই উল্লেখ নেই! বরং এখনই অনুকূল সুযোগ ছিল রোহিঙ্গা প্রশ্নে গোটা দুনিয়ার যে ইতিবাচক মনোভাব, তাকে কাজে লাগিয়ে চীনের চাপকে মোকাবেলা করা এবং মিয়ানমারকে বাধ্য করা এই শরণার্থীদের জীবন, সম্পদ ও মর্যাদার অধিকারসহ পূর্ণ নাগরিকত্ব প্রদান করে ফিরিয়ে নেওয়া। একই সঙ্গে সম্ভব ছিল যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবি করে মিয়ানমারের কাছ থেকে যথাসম্ভব বেশি কিছু আদায় করা। এই কাজে বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত ব্যর্থ।

রোহিঙ্গাদের নৃতাত্ত্বিক পরিচয়

সীমান্তে আবারও রক্তাক্ত রোহিঙ্গা শরণার্থী। প্রশ্ন আসে, রোহিঙ্গা কে? তার নৃতাত্ত্বিক পরিচয় কী?

আলাওল রোসাঙ্গ বা আরাকানে বসে বাংলা কবিতা লিখেছিলেন, কিন্তু তার জন্ম ফরিদপুরে, সতেরো শতকে মগ জলদস্যুরা তাকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল আরাকানে। এই সূত্রেই তো জানা যায়, নিছক জলদস্যুতার সূত্রে বহু মানুষকে আরাকানে যেতে হয়েছিল। তখনকার পর্যটক, পর্তুগীজ পাদ্রীরা উল্লেখ করেছেন বাংলা থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া দাসদের ইউরোপে বিক্রি হওয়ার কথা, আরাকানেও বিক্রি হওয়ার কথা।

উনিশ শতকেও মনিপুর লণ্ডভণ্ড করার সময়ে বার্মার রাজা বিপুল পরিমাণ মুসলমান কারিগরকে (পাঙ্গাল- প্রধানত বস্ত্র কারিগর, বাংলা থেকে অভিবাসী হয়েছিলেন মনিপুরে) বন্দি করে নিয়ে যান বার্মায়। আরাকানও ইতোমধ্যেই বার্মার দখলে চলে গিয়েছিল। কৃষি কাজেও এই মানুষদের চাহিদা বার্মায় ছিল তুলনামূলকভাবে অগ্রসর কৃষিপ্রধান অঞ্চল থেকে আসার কারণে। এর বাইরেও বিপুল পরিমাণ মানুষ সেখানে গিয়েছেন গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র বলে। বৃটিশ আমলে তারা গিয়েছেন কৃষক হিসেবে। ব্যবসায়ী হিসেবে। বহু সূত্রেই তারা আরাকানের বাসিন্দা হয়েছেন, কখনো নিরুৎসাহিত করার সংবাদ আমরা পাই না।

এই যাওয়া ঘটেছে আসামে। এই যাওয়া ঘটেছে বিহারে, উড়িষ্যায়। নানা কারণেই বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি এবং এর রাজনৈতিক প্রভাব সৃষ্টি হয়েছে এই গোটা অঞ্চলে। তার প্রভাব সর্বদা ভালো হয়েছে তা নয়। কিন্তু রোহিঙ্গাদের ভাষার সঙ্গে চট্টগ্রামের ভাষা, চাকমা জাতির ভাষার সাদৃশ্য বলে দেয় রোহিঙ্গারা এই বৃহত্তর সংস্কৃতির অংশ। এই সাংস্কৃতিক ঐক্যের সূত্র ধরেই তাদের সাহায্য দেওয়ার দাবি করি না। দাবি করি সে আমাদের নিকটতম বিপন্ন প্রতিবেশী বলে, এই সাহায্য তার ন্যায্য পাওনা। কিন্তু রোহিঙ্গা কবে আরাকানে গিয়েছে, সেটা নিছকই ফালতু প্রশ্ন। যেমন ফালতু প্রশ্ন আদিবাসীরা বাঙালির আগে এসেছে কি না। একটা জনগোষ্ঠী প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে একটা অঞ্চলের কৃষি-শিল্প-প্রতিবেশ-অর্থনীতি নির্মাণ করেছেন, এটাই সেখানকার আদিবাসী হওয়ার জন্য যথেষ্ট ন্যায্য দাবি। এই সূত্রেই সাঁওতাল-মার্মা-চাকমা-মান্দি বাংলাদেশের আদিবাসী। এই সূত্রেই রোহিঙ্গা রাজনৈতিকভাবে মিয়ানমার ভূখ-ের বাসিন্দা এবং এই অধিকার ক্ষুণ্ন করে মিয়ানমার রাষ্ট্র হিসেবে তার নৈতিক বৈধতা ধ্বংস করছে- এই ঘোষণাই আমাদের দিতে হবে।

বাংলাদেশের করণীয় কী? রোহিঙ্গা যদি আজ মৌলবাদী হয়, তার কারণ তার বেঁচে থাকার সংগ্রামকে আমরা গণতান্ত্রিক পথে চালাইনি, গোপনে কিংবা প্র্রকাশ্যে আমরা তাকে কখনো মৌলবাদের জালে সমর্পণ করেছি, কখনো ঠেলেই দিয়েছি। প্রতিবেশী যেহেতু আমি বাছাই করতে পারবো না, এই জাতিগত সহিংসতার ধাক্কা আমাদের ঘাড়ে আসছেই, সেটাকে যেন আমরা সবচেয়ে ন্যায্য এবং গণতান্ত্রিক পথে চালাতে পারি- সেই চেষ্টাটা আমাদের থাকা উচিত ছিল। সেই কাজটি আমরা করিনি। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই বিষয়টি যেভাবে তুলে ধরা উচিত ছিল, সেই কাজে আমরা চরমতম অবহেলা দেখিয়েছি। এরই ফল মিয়ানমারের বেপরোয়া আচরণ, ফলে শরণার্থী বাড়ছেই এবং স্বীকৃত পথে না নেওয়ার কারণে ভবিষ্যতে এদেরকে মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে প্রমাণ করাও কঠিন হবে।

অন্যদিকে, আশ্রয় না দেওয়ার আরেকটা যুক্তি হলো জনসংখ্যার চাপ। আবারো বলছি, বাস্তবতা যেহেতু আমরা বেছে নিতে পারি না, আমরা যদি বৈধপথে আশ্রয় না দেই, অবৈধ পথেই তা আসবে। অনিয়ন্ত্রিতভাবে আসবে। তারা গোণার বাইরে থাকবে, নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকবে। মাফিয়াদের শিকারে পরিণত হবে। কিংবা নৌকাডুবিতে লাশ হবে এবং গণতান্ত্রিক শক্তিগুলো তাদের সংগ্রামের ভাষা না দিলে, সহায়তা না করলে তারা আরও বেশি করে মৌলবাদী উগ্রপন্থি রাজনীতির শিকার হবে। হয়তো সরকার এবং আন্তর্জাতিক কোনো কোনো মহল তাই চাইছে।

রোহিঙ্গাদের আশ্রয় না দেওয়ার কোনো নৈতিক অধিকার বাংলাদেশের নেই। যে বাংলাদেশের এক কোটি মানুষ একাত্তরে শরণার্থী হিসেবে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। মিয়ানারের মতো অজস্র জাতিতে বিভক্ত এবং হানাহানিতে লিপ্ত দমনমূলক একটি সরকারের দেশে বাংলাদেশ যদি বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতো, মিয়ানমারই বরং তটস্থ থাকতো এবং রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জীবন ও মর্যাদার নিরাপত্তা নিশ্চিত করে তাদের ফেরত পাঠানো সম্ভব হতো। মানবতার প্রতি এই ন্যূনতম কর্তব্য-কর্মটুকু না করে বাংলাদেশ সরকার জনগণের মাঝে মৌলবাদি আর সাম্প্রদায়িক অনুভূতিগুলোকেই প্রণোদনা দিচ্ছে, বুদ্ধিজীবীদের একাংশ তো এই অপরাধে অপরাধী হয়ে থাকলেন। অথচ ধর্ম কিংবা সম্প্রদায়ের বিবেচনা বাদ দিয়েই আমরা প্রতিবেশীর বিপদে অগ্রসর হতে পারতাম, জনগণকে মানবিকতার উচ্চতর একটা চেতনায় রঞ্জিত করতে পারতাম।

মিয়ানমারের রাষ্ট্র হয়ে ওঠার দুর্বলতা

মিয়ানামার আমাদের এক অস্থির প্রতিবেশী। এর অর্থনৈতিক রূপান্তরের প্রতিটি স্তরে প্রতিটি পর্বে তার অভ্যন্তরীণ সংঘাত নিত্যনতুন চেহারা পাবে। দেশটির প্রায় প্রতিটি জাতির মাঝে কেন্দ্রের প্রতি ঘৃণা এত প্রবল এবং বলপ্রয়োগের চিহ্নগুলো দূর করে কোনো পারস্পরিক স্বার্থ ও যৌথ আকাক্সক্ষার ভিত্তিতে রাষ্ট্রগঠনের প্রক্রিয়াটাকে দেশটি সাবলীল করতে সক্ষম হয়নি বলেই সামরিক বাহিনী সেখানে একমাত্র বন্ধনশক্তি।

রোহিঙ্গা দমননীতি বার্মাতে সামরিক জান্তার একটা কৌশলের অংশ, যে শয়তানি বুদ্ধির সাহায্যে তারা বার্মার রাজনীতিতে সামরিক বাহিনীর আধিপত্য টিকিয়ে রাখতে চায়। রাষ্ট্রজুড়ে যত সামরিকায়ন, তত সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা।

তবে বহু ক্ষেত্রে এই সস্তা কৌশলটি আত্মঘাতী হয়ে দাঁড়ায়। আপাতত এই মুহূর্তে রোহিঙ্গার পক্ষে শক্তিশালী কোনো স্বার্থ নেই, ফলে গণহত্যাটি নিশ্চিন্তে চালনা করা যাচ্ছে। কিন্তু বহু জাতি আর জনগোষ্ঠীতে অধ্যুষিত মিয়ানমার কোনো অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গড়ে না তুললে এই অসন্তোষ সর্বদাই বার্মিজ বাদে বাকি জাতিগুলোর মাঝে বিদ্রোহের ধোঁয়া কমবেশি জারি রাখবে। মিয়ানমার ভারত-চীন- এই দুই ধুরন্ধর প্রতিবেশীর মাঝে অবস্থিত, দেশটির অজস্র ভিন্নমতাবলম্বী রাজনৈতিক কর্মী, বুদ্ধিজীবী এখনো থাইল্যান্ডে নির্বাসিত।

বিপুল সম্পদের অধিকারী হলেও যে কোনো কার্যকর গণতান্ত্রিক সংস্কার শুরু হলে জাতিগুলোর রেষারেষি ও দাবির চাপ মোকাবেলা গণতান্ত্রিক ও প্রতিনিধিত্বশীল সরকারের পক্ষে খুব কঠিন হবে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকার তার জন্য এটিই দেশটির জন্য একমাত্র পথ। আরাকানে এমনকি রাখাইন জগোষ্ঠীর মাঝেও সুদীর্ঘ ক্ষোভের স্মৃতি আছে দখলদারিত্বের। এটাকে চাপা দিতেই রাখাইন-রোহিঙ্গা দ্বন্দ্ব সামরিক বাহিনীর সহজ কৌশল হিসেবে কাজ করে।

ভারতের মতো বহু জাতিগোষ্ঠী অধ্যুষিত রাষ্ট্রে একটা ভারসাম্যমূলক ব্যবস্থা রাখতে হয়েছে শাসনতন্ত্রে, শত দুর্বলতা সত্ত্বেও ভারতের টিকে যাওয়ার রহস্য এটাই। এই ভারসাম্যের খানিকটা অভাব পাকিস্তানে সামরিক প্রভুত্বের আদি কারণ। কিন্তু মিয়ানমারের বার্মিজ আধিপত্যের সঙ্গে এদের কারও তুলনা হবে না, মিয়ানমারে রাষ্ট্রবিকাশে সবচেয়ে বড় দুর্বল দিক আবার এটিই। সু চি শুরুতে বিপুল আশা জাগিয়েও শেষ পর্যন্ত জাতিদম্ভী পথেই হাঁটছেন। এটা তার জন্য আপাতদৃষ্টিতে নিরাপদ। জাতিগত সংঘাতের ধূ¤্রজালে, কয়েক দশকে ধরে বিশ্ববিদ্যালয়-আমলাতন্ত্র-প্রাতিষ্ঠানিক সকল পরিসর থেকে রোহিঙ্গাদের ঠেলে প্রান্তে পাঠানোর পরিণতিতে এবং রোহিঙ্গাদের দিক থেকেও যতই দুর্বল হোক কিছু প্রত্যাঘাতের পরিণতিতে রোহিঙ্গার প্রতি ঘৃণার পরিমাণটা বিপুলই হওয়ার কথা, বার্মার প্রচার মাধ্যম থেকে তা পরিষ্কার বোঝা যাবে। বহু জাতি অধ্যুষিত, আধুনিক শিল্পকারখানাহীন, বিদেশি বিনিয়োগের জন্য উন্মুখ মিয়ানমারের সংকটগুলো খেয়াল করলেই বোঝা যাবে, শুধু বিদ্রোহ সম্ভবত এর সমাধান এক্ষেত্রে অন্তত আনবে না। এটা মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর হাতকেও শক্তিশালী করবে। এই রকম একটা বিদ্রোহ বাইরের কোনো শক্তিশালী পক্ষের সক্রিয় সহযোগিতা ছাড়া সফল হয় না। সেটা করার মতোও কেউ নেই। এমনকি আরাকানেও রোহিঙ্গারা সংখ্যালঘুই। বড়জোর হয়তো একটা মুক্তাঞ্চল গড়ে তুলতে পারেন তারা, তবে তার টিকে থাকার বা দীর্ঘমেয়াদে সম্ভাবনা বেশ কম। তবে প্রতিরোধের পথ ঠিক করার এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার মালিক তারা নিজেরাই।

কখনো কখনো হত্যাযজ্ঞের শিকার মানুষদের সামনে অর্থহীন প্রতিরোধও একমাত্র করণীয় হয়। তাছাড়া এটা শক্তিশালী থাকলে অন্য রাজ্যগুলোতেও যে ন্যায্য ক্ষোভ ও বিদ্রোহ আছে, সেগুলো হয়তো উৎসাহিত হবে। সমন্বিত বিরোধিতার মুখে পড়লে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ছাড় দিতে বাধ্য হতে পারে- এমনটাও খুবই সম্ভব। যতই সম্ভাবনাময় হোক, বার্মার অর্থনৈতিক রূপান্তরকে শ্লথ করে দিয়েছে এই দ্বিমুখী সংকটটিই- জাতিগত সংঘাত শিল্পায়নকে অনুৎসাহিত করবে, গণতান্ত্রিক সংকট জাতিগুলোর দাবি-দাওয়ার প্রকাশ ও জোট বাধাকে উৎসাহিত করবে। মিয়ানমারকেই এর উপযুক্ত রাজনৈতিক প্রক্রিয়া ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বন্দোবস্ত করতে হবে, অন্যথায় চির অশান্তির দেশে থেকে যেতে হবে।

প্রতিবেশী হিসেবে আমাদের দিক থেকে মিয়ানমারে বিনিয়োগে আগ্রহী খনিজ প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক প্রচারণা, তাদেরকে বিব্রত করা, মিয়ানমারে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী দেশগুলোতে প্রচার চালানো, এমনকি রাষ্ট্রীয়ভাবে সু চির ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হলে সেগুলো আন্তর্জাতিক প্রচার মাধ্যমে বিপুল গুরুত্ব পেতো। এই বিনিয়োগের শর্ত হিসেবেই আন্তর্জাতিক তদারকি, জাতিসংঘের প্রতিনিধি দলের পর্যবেক্ষণ, মানবাধিকর সংস্থার উপস্থিতি যুক্ত করা সম্ভব। বহুদেশেই এই প্রক্রিয়াগুলো নিপীড়িত ক্ষুদ্র জাতিগুলোর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করেছে।

বাংলাদেশের দিক থেকে সামরিক ব্যবস্থা ভাবাটা একদমই কার্যকর হবে না, যদিও সেই আগ্রহ সংখ্যায় কম হলেও কেউ কেউ প্রকাশ করেছেন। যুদ্ধটুদ্ধ বাদ, যুদ্ধের আগ্রহের প্রকাশেও মিয়ানমারের জান্তার চেয়ে বেশি খুশি কেউ হবে না। কিন্তু রোহিঙ্গারা পরিত্যজ্য নয়, এই মনোভাব প্রকাশ করাটা এবং এই তাদের নাগরিকত্ব-নিরাপত্তা-মর্যাদার দাবি উত্থাপন করাটা বাংলাদেশের কর্তব্য। আন্তর্জাতিক কোনো আইন ও প্রথাতেই যে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে একটা দেশে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর নাগরিক অধিকার অস্বীকার করা যায় না, রোহিঙ্গার পরিচয় বাঙালি না মুসলিম, না হিন্দু- সেই প্রশ্নের নিরর্থকতা তুলে ধরতে হবে এবং বাংলাদেশে রোহিঙ্গা প্রশ্নকে কেন্দ্র করে যেন কোনো সাম্প্রদায়িক জাতিবিদ্বেষী উস্কানির জন্ম না হয়, সেটাও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

কোনো ধারাবাহিক নীতির প্রতিফলন নেই

মিয়ানমার নিয়ে আমাদের সবচেয়ে বড় শিক্ষাটা কী? সেটা সম্ভবত এই যে, মিয়ানমার বিষয়ে আমাদের কোনো নীতি নেই। কার্যত অস্থায়ী ভিত্তিতে আমাদের সবচেয়ে অস্থির প্রতিবেশীটার সঙ্গে আমরা লেনাদেনা করছি। আমাদের সকল কাজ প্রতিক্রিয়া, আমরা কখনো ক্রিয়া করিনি।
প্রতিবেশী আমরা বাছাই করতে পারবো না। চাইলেই শান্তিপূর্ণ আঞ্চলিক পরিবেশ আগে থেকে কেউ আমাদের বানিয়ে দেবে না। বরং অন্যভাবে, প্রতিটি দেশের ভেতরেই থাকে যেমন নিজস্ব সব বিকাশের সংগ্রাম, তেমনি থাকে প্রতিবেশীদের সঙ্গে জটিলতা। কোনো দেশই তো বাইরের এই সংঘাতের হাত থেকে মুক্ত না, প্রত্যেকেরই তাই থাকে নিজস্ব নীতি, কীভাবে তার মুখোমুখি হবে তার কর্মকৌশল।

মিয়ানমারের ঘটনা প্রবাহ প্রথম থেকে যদি আমরা খেয়াল করি, দেখতে পাবো রোহিঙ্গাদের ঠেলে গণহত্যার মুখে ফেরত পাঠানো ছিলো বাংলাদেশের অবস্থান। এই অবস্থান অমানবিক, একই সঙ্গে অকার্যকরও। কেননা, লক্ষ লক্ষ প্রাণভয়ে ভীত মানুষকে বৈধ পথে আসতে না দিলে তারা অবৈধ পথে আসবেই। অন্তত বাংলাদেশে সেটা ঠেকাবার উপায় নেই। রোহিঙ্গাদের প্রতি সহানুভূতি হোক, মানুষ পাচারের বাণিজ্য হোক, তাদেরকে অবৈধ পথেই বাংলাদেশে নিয়ে এসেছে সরকারের এই বাধা।
দ্বিতীয়ত, আমরা দেখলাম, রোহিঙ্গাদের প্রতি বাংলাদেশের রাষ্ট্রনৈতিক নীতি কতখানি ধোঁয়াশাচ্ছন্ন। গণহত্যার তীব্রতম সময়ে বাংলাদেশ প্রস্তাব করলো যৌথ অভিযান চালিয়ে সন্ত্রাসীদের দমনের। বাংলাদেশ বার্তা দিলো, মিয়ানমার সরকারের প্রতি তাদের সমর্থন অটুট আছে।

তৃতীয়ত, আমরা আরও দেখলাম, চাল নিয়ে চালাচালি- রক্তের হোলি খেলা চলছে যে দেশটিতে, সেই সরকারটিকে আরও বেপরোয়া করলো, উৎসাহিত করলো এই হাস্যকর কাজটি।

চতুর্থত, শরণার্থীরা প্রাণ বাঁচাতে দেশের ভেতরে আসবেই, অতীতের এতগুলো অভিজ্ঞতায় এটা জানার পরও আমরা বিনা নিবন্ধনেই তাদের ঢুকতে দিলাম, কিংবা নিবন্ধনের কাজ শুরু করলাম অনেক পর।

পঞ্চমত, কূটনৈতিক পর্যায়ে এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা, মানবাধিকার, উদ্বাস্তু ও এ সংক্রান্ত সংগঠনগুলোকে নিজেদের উদ্যোগে আমরা যুক্ত করতে পারিনি। আমাদের তো প্রয়োজন ছিল এতগুলো দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি অতগুলো গুরুত্বপূর্ণ দেশে যাচ্ছেন, গণমাধ্যম ও বিভিন্ন স্তরে কথা বলছেন, তাদের তথ্য দিচ্ছেন, উৎসাহ দিচ্ছেন এমন একটা দৃশ্য দেখার। এখন হয়তো কাজটা হবে কিন্তু একটা আনুষ্ঠানিক নীতি থাকলে একটা স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়াতে এটা চলতো। শরণার্থীদের পেছনে খরচ এবং তা উসুলের এক বাস্তবসম্মত হিসেবও সকলের সামনে হাজির থাকার কথা ছিল।
ষষ্ঠত, শরণার্থীদের জন্য ন্যূনতম কোনো ব্যবস্থাপনা না করতে পারা। টানা কয়েকদিন হেঁটে বাংলাদেশে আসা মানুষগুলোর জন্য না আছে কোনো তাৎক্ষণিক খাদ্য-পানি, না আছে তাদের জন্য ন্যূনতম প্রাথমিক চিকিৎসা ও মহামারী রোধের ব্যবস্থা। আমাদের একটা দল সেখানে শৌচাগার নির্মাণের কাজ করছে, তারা খুবই অপ্রতুল চিকিৎসা সেবার কথা জানিয়েছে।

সপ্তমত, রোহিঙ্গা প্রশ্নে দেশের ভেতরে সাম্প্রদায়িক উস্কানির বাস্তবতা, বিশেষ করে বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর প্রতি হুমকি বিষয়ে কোনো বাস্তব পদক্ষেপ ও সতর্কতা গ্রহণ। কিন্তু এসব কিছুর বাইরে আসল কথা হলো, মিয়ানমারকে বার্তা দেওয়া: রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জীবন ও মর্যাদা কোনোভাবেই বিপদাপন্ন করা চলবে না- এটা বুঝিয়ে দেওয়া। এই কাজটি কখনোই করা হয়নি। বরং আমরা রোহিঙ্গাদের চিত্রিত করেছি সন্ত্রাসী ও জঙ্গি হিসেবে, যা মিয়ানমারের সামরিক জান্তার কথার থেকে একদমই ভিন্ন কিছু হয়নি।

প্রধানমন্ত্রীকে আমরা ধন্যবাদ জানিয়েছি বিলম্বে হলেও রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রতি মানবিক আশ্রয় প্রদানের জন্য। কিন্তু বলতেই হচ্ছে, এই কাজটিও করা হয়েছে একটা উপস্থিত সিদ্ধান্ত থেকেই। কোনো ধারাবাহিক নীতির প্রতিফলন এখানে নেই। শুরু থেকে বাংলাদেশের চেষ্টাটি ছিল দায় এড়াবার। এই রকম দায়িত্বহীনতা বৈশ্বিক স্তরে আমাদের পেছনেই ঠেলে দেয়। বরং সংকটকে মোকাবেলা করার চেষ্টার মাঝেই থাকে নিজেদের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার, যোগ্যতর করে তোলার সম্ভাবনা। রোহিঙ্গা সংকট কোনো তুচ্ছ ঘটনা নয়। এটা আরও বহু কিছুর সঙ্গে মিলে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে বদলে দেবে, অজস্র নতুন টানপড়েন তৈরি করবে। বাংলাদেশ চাক বা না চাক, ঘটনাপ্রবাহের মাঝে আমরা ঢুকে পড়েছি।

বাংলাদেশের নদী-কৃষি-শিল্প-জ্বালানি-উপকূল-পরিবহন-ব্যাংক-শিক্ষা এমনকি শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার নীতি পর্যন্ত নানা আন্তর্জাতিক সংস্থা ও দেশ নিয়ন্ত্রণ করে। তাদের বাণিজ্যিক স্বার্থ অনুযায়ীই আমরা চলি, যাকে বলে ‘যেমনে নাচাও তেমনি নাচি, পুতুলের কি দোষ’!
রোহিঙ্গা সংকটও সেই দৃশ্যপট আমাদের সামনে আবার হাজির করেছে। আমরা পরিস্থিতির মোকাবেলার যোগ্যতা অর্জন করবো, না কি পরিচালিত হতে থাকবো- সেটাই নির্ধারণ করবে আমাদের দেশটাকেও আমরা নিজেরা চালাবো নাকি অন্যরাই চালাতে থাকবে- সেটাও।

লেখক : প্রাবন্ধিক, অনুবাদক এবং রাজনৈতিক কর্মী। সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন। 

ফেমাসনিউজ২৪/আরইউ