logo

মঙ্গলবার, ২৪ এপ্রিল ২০১৮ | ১০ বৈশাখ, ১৪২৫

header-ad

মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তি জেগে উঠুক

প্রকৌশলী ড. জ্ঞান রন্জন শীল | আপডেট: ০৭ জানুয়ারি ২০১৮

যে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার দৃঢ় প্রত্যয় আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে আমরা স্বাধীনতা লাভ করেছি তা কতটুকু সার্থকতা লাভ করছে? আমরা কি দেখছি বাংলাদেশে ? সাম্প্রদায়িকতার ঘৃণ্য ছোবলে দংশিত হচ্ছে বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকা। হিন্দু , বৌদ্ধ , খ্রিস্টান কেউ বাদ যাচ্ছে না। একটি সঙ্ঘবদ্ধ শক্তির কি উন্থান ঘটছে বাংলাদেশে? তারা কারা?

তারা কি করেছিল আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে। আমাদের কারা ধরিয়ে দিয়েছিল আর মা-বোনদের ইজ্জত কারা লুটেছিল? তা কি আমরা ভুলে গেছি? না, ভুলিনি। সেই রাজাকার, আল-বদর বাহিনীর দোসররা এখনও বাংলাদেশে বহাল তবিয়তে রয়েছে, আর সোচ্ছার হচ্ছে- তীব্র গতিতে। সংগঠিত হচ্ছে ওই জঙ্গী সংগঠন। যদিও একে একে ধরা পডছে, কিন্তু বন্ধ হয়নি ওদের আস্ফালন। কে বা কারা এদের মদদ দিচ্ছে? কারা পেছন থেকে সমর্থন দিচ্ছে তা জানা প্রয়োজন।

সম্প্রতি রংপুরের গঙ্গাচডার ঠাকুরপাডায় সংখ্যালঘুদের ওপর কি ঘটনা ঘটলো তা তো আমরা দেখেছি। এখন চলছে- এক দল আরেক দলের দোষারূপ দেয়া। আসলে কি হামলা বন্ধ হচ্ছে? হবে, এ দেশে কবে? এর আগে আমরা, কি দেখেছি- নাসির নগরে হামলা, বান্দরবন খিস্টানপল্লীতে আক্রমণ। এই ডিজিটাল বাংলাদেশের সুবিধা নিয়ে, ফেজবুকে পোস্ট করে দিল! অন্যের নামে! আর তারপর কি বিভর্ষতা! হায়েনার দল, কীভাবে ওঠে-পড়ে লেগেছিল। তা আমরা দেখেছি। কীভাবে হাজার হাজার মানুষকে মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে একত্র করেছিল? আর হামলা করেছিল- নিরীহ সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠির ওপর। ধর্মীয় উপাসনাগারকে কেন্দ্র করে হিন্দু বাড়ি-ঘর কীভাবে জ্বালিয়ে-পুডিয়ে দিয়েছিল, তা যে আমরা ভুলিনি। ভুলবো কেমন করে?

কাউকে দোষ দেয়ার সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, এখন দেখি। একদল অন্য দলের দোষ দেয়। এক পার্টি, অন্য পার্টির। আ হা! কি বিচিত্র এই দেশ! কি চেতনার কথা বলি আমরা? আমরা স্বাধীন হয়েছি মুক্তিযুদ্ধের চেতনায়। সেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আজ কোথায়? ওরা যে বুলি আওড়াতো মুক্তিযুদ্ধের সময়, গনিমতের মাল, মালাউন? আ হা! ওরা কি জানে মালাউন কারা? আর গনিমতের মাল কারা? সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠিকে ওরা এভাবে আক্রমণ করে।

স্বাধীনতাকালে দেখেছি প্রথম ধাক্কাটা সংখ্যালঘু হিন্দুদের উপরেই এসেছিল। এরা দল ভারী করার জন্য এ সুযোগ কাজে লাগায়। তারপর ওদের টার্গেট ধরে কাজ সম্পন্ন করে। আল-বদর, রাজাকাররা যেভাবে এগিয়ে ছিল। এখন তারাও সেভাবে এগুচ্ছে। এই বাংলায় ওদের ঠাঁই হবে না। মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তির উত্থান ঘটেছে বাংলাদেশে। এই দেশে ওদেরকে জায়গা দেয়া কি উচিত? এই প্রশ্ন এখন সবার বিশেষ করে আমাদের যুব সমাজ, তারাই আমাদের ভবিষ্যৎ। তাদেরকে জাগ্রত করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তির উত্থান ঘটাতে হবে। তাহলেই বাংলাদেশ মাথা উঁচু করে জেগে উঠবে।

আমরা কি দেখি? ৭৫-এর পট্ পরিবর্তনের পর যে 'জয় বাংলা ' ছিল, আমাদের মুক্তিযুদ্ধের স্লোগান। তা নিষিদ্ধ হল। যে ৭ মার্চের ভাষণ ছিল আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম, আমাদের মুক্তির সংগ্রাম এর মূলমন্ত্র। আজ তার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি মিলল। মহান হাইকোর্টে রিট করা হল 'জয় বাংলা'কে স্বীকৃতি প্রদানের জন্য। আ হা! কি বিচিত্র সেলুকাস। যে বঙ্গবন্ধু ডাকে আমরা স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েছিলাম, তা এখন বাক্সবন্দী করতে চায় ওরা!

আমাদের জাতির জনক, মহান স্বাধীনতার স্থপতি, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙিলি, অবিস্মরণীয় মহান নেতা বঙ্গবন্ধুকে এখনও ওরা মানতে পারছে না। এখনও অনেকে গণতন্ত্রের দোহাই দেন? সেই ৭৫-এর পর কোথায় ছিল আপনার এই তথা কথিত গণতন্ত্র? মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা শুধু মুখে বললেই হবে না। স্বীকার করতে হবে- কীভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা এসেছে। কারা একে এখনও স্বীকার করতে পারে না।

ওই পাকিস্তানের স্বপ্ন দেখে তারা! স্বাধীনতার পর মাত্র সাডে তিন বছর পরেই তারা ওই পরিবর্তনকে স্বাগত জানিয়েছিল। আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র, দেশীয় দুষমন- মোনাফেকরাই তখন সায় দিয়েছিল। সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছিল। কি অন্যায় করেছিল তার পরিবারের অন্য সব সদস্য? আসলে যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে স্বীকার করতে পারেনি তারাই এসেছিল ক্ষমতায়!

আমরা ওই সময় কি দেখলাম? স্বাধীনতা-বিরোধীরা এক জোট হল। সাথে যোগ দিল লুকিয়ে থাকা বর্ণচোর অনেকেই। আমরা হারিয়ে গেলাম। জয় বাংলার পক্ষের কোনো সহযোগিতা মিলল না। অনেকটা ভয়ে চুপ হয়ে গেলেন অনেকেই। কি আর করা? অপেক্ষা করাই বুদ্ধিমানের কাজ মনে করে থেমে গেলেন অনেকে।

আজ আর থেমে থাকা বুদ্ধিমান কাজ নয়। রুখে দাঁড়াতে হবে। দাঁত ভাঙ্গা জবাব দিতে হবে। আমাদের স্বাধীনতাকে অক্ষুন্ন রাখবো- এই দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সামনে রেখে এগিয়ে যেতে হবে। মনে রাখতে হবে যে, স্বাধীনতার জন্য আমাদের ৩০ লাখ শহীদ হয়েছেন, ৩ লাখ মা-বোনের ইজ্জত নষ্ট হয়েছে; তাকে রক্ষা করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।

২১ বছর পরে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ ক্ষমতায় এলে দেশে একটি গুনগত পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেল। এরপর গণতন্ত্রের কথা বলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ধারনা এল। কিন্তু কাঠামোগত কোনো পরিবর্তন হল না। যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা আমরা বলছি- তা না এলে এভাবে সরকার পরিবর্তনে কি লাভ হবে?

আমরা যদি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা রক্ষা না করি- ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানে যে চার মূলনীতি বিদ্যমান ছিল তা পরিবর্তন করে হবে না। কোনোরকম জোড়াতালি দিয়ে হবে না। ধর্মনিরপক্ষতা কোথায় যাবে? এই ধর্মনিরপক্ষতাকে নিয়েই আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছিলাম। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তা কি এই ধর্মনিরপেক্ষতা বাদ দিয়ে? হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, মুসলিম সবাইকে নিয়ে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছিলাম।

এই ধর্মনিরপেক্ষতা ছিল আমাদের মনে, প্রাণে স্বত্বফূর্তভাবে। আমরা ধারণও করেছিলাম। কিন্তু কোথা থেকে ৭৫-এর পট-পরিবর্তনের ফলে আমরা হারিয়ে ফেলেছি এই চার মূলনীতি! স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি আজ দ্বিধাগ্রস্ত! তারা ভয় পান ওই সাম্প্রদায়িক শক্তিকে।

ভয় পাচ্ছেন ওই রাজাকার, আল-বদর, পাকিস্তানি পরাজিত ওই শক্তিকে। মৌলবাদী চক্র আমাদের স্বাধীনতার স্বপ্নকে দ্বিধাগ্রস্ত করে ফেলেছে। আজ আমরা ভয় পাই সাম্প্রদায়িক শক্তিকে। একদিন আমরাই এই দেশের কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র- জনতা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মুক্তিযুদ্ধ করে এ দেশের স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছি।

কত অত্যাচার, নির্যাতন সহ্য করছি আমরা। বাংলার নয়নমণি বঙ্গবন্ধুর ডাকে আমরা মুক্তিযুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েছিলাম। আর দীর্ঘ নয় মাসের যুদ্ধে কতজনকে যে হারিয়েছি। ৩০ লাখ শহীদ আর ৩ লাখ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে অর্জিত এ স্বাধীনতা কি আমরা ওই মৌলবাদীদের ভয়ে আর তথাকথিত গণতন্ত্রের মুখোশধারী নিরপেক্ষ সরকারের দাবির কাছে মাথানত করবো? মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নের স্বার্থে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে এই দেশ শাসনের অধিকার দিতে হবে- এটাই আমাদের দাবি।

লেখক, অতিরিক্ত সচিব, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয
ফেমাসনিউজ২৪/এফএম/এমএম