logo

শুক্রবার, ২০ জুলাই ২০১৮ | ৫ শ্রাবণ, ১৪২৫

header-ad

আমি বাংলায় গান গাই

রায়হান উল্লাহ | আপডেট: ১০ জানুয়ারি ২০১৮

বাংলা ভাষা দক্ষিণ এশিয়ার বঙ্গ অঞ্চলের স্থানীয় ভাষা। অঞ্চলটি বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে গঠিত। এ ছাড়াও ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য, আসাম রাজ্যের বরাক উপত্যকা এবং আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে বাংলা ভাষাতে কথা বলা হয়। এই ভাষার লিপি হল বাংলা লিপি। এই অঞ্চলের প্রায় বাইশ কোটি স্থানীয় মানুষ ও পৃথিবীর মোট ৩০ কোটি মানুষ এই ভাষায় কথা বলে। বাংলা বিশ্বের সর্বাধিক প্রচলিত ভাষাগুলির মধ্যে চতুর্থ। বাংলাদেশ, ভারত ও শ্রীলঙ্কার জাতীয় সংগীত এবং ভারতের জাতীয় স্তোত্র এই ভাষাতেই রচিত। দক্ষিণ এশিয়ায় এই ভাষার গুরুত্ব অত্যাধিক।

বর্তমানে, বাংলা ও তার বিভিন্ন উপভাষা বাংলাদেশের প্রধান ভাষা এবং ভারতে দ্বিতীয় সর্বাধিক প্রচলিত ভাষা। ১৯৫১-৫২ খ্রিস্টাব্দে পূর্ব পাকিস্তানে সংগঠিত বাংলা ভাষা আন্দোলন এই ভাষার সঙ্গে বাঙালি অস্তিত্বের যোগসূত্র স্থাপন করে।

বর্তমানে সারা বিশ্বে প্রচলিত প্রায় সাড়ে তিন হাজার ভাষার মধ্যে বাংলা ভাষা অন্যতম স্থান দখল করে আছে। বাংলা ভাষা বাঙালি জাতির কাছে শুধু একটি ভাষাই নয়, এর সঙ্গে মিশে আছে বাঙালি জাতির ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি সবকিছু।

অধিকাংশ ভাষাতাত্ত্বিকের মতে গৌড়ী প্রাকৃত ভাষা থেকে বাংলা ভাষার উদ্ভব হয়েছে। কিন্তু ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে গৌড়ী প্রাকৃতের পরবর্তী স্তর গৌড় অপভ্রংশ থেকে বাংলা ভাষার উৎপত্তি।
ইতিহাস বলে, বাংলা ভাষা প্রায় ১৫০০ বছর পথ অতিক্রম করে আজকের এই আধুনিক পর্যায়ে এসেছে। প্রাচীন কালের বাংলা সাহিত্যের নিদর্শনস্বরূপ চর্যাপদ, মধ্যযুগে শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, মনসামঙ্গল, চণ্ডীমঙ্গলসহ নানা সাহিত্যকর্ম রয়েছে।

পরবর্তী সময়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ইশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, কাজী নজরুল ইসলাম, উইলিয়াম কেরী, প্রমথ চৌধুরীসহ খ্যাতনামা সাহিত্যিক, লেখক ও কবির কৃতিত্ব, প্রচেষ্টা ও অসামান্য অবদান বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করেছে।

বাংলা ভাষার সংগ্রামের ইতিহাস বলছে, ১৯৪৮ সালে পাকিস্তান সরকার ঘোষণা করে উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। এ ঘোষণার প্রেক্ষাপটে পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থানকারী বাংলাভাষী সাধারণ জনগণের মধ্যে গভীর ক্ষোভ ও বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। বাংলাভাষার সমমর্যাদার দাবিতে পূর্ব পাকিস্তানে আন্দোলন দ্রুত দানা বেঁধে ওঠে। আন্দোলন দমনে পুলিশ ১৪৪ ধারা জারি করে ঢাকা শহরে সমাবেশ-মিছিল ইত্যাদি বেআইনী ও নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি (৮ ফাল্গুন ১৩৫৮) এ আদেশ অমান্য করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু সংখ্যক ছাত্র ও প্রগতিশীল কিছু রাজনৈতিক কর্মী মিলে মিছিল শুরু করেন। মিছিলটি ঢাকা মেডিকেল কলেজের কাছাকাছি এলে পুলিশ ১৪৪ ধারা অবমাননার অজুহাতে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলিবর্ষণ করে। গুলিতে নিহত হন রফিক, সালাম, বরকত-সহ আরও অনেকে। ক্রমবর্ধমান গণআন্দোলনের মুখে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার শেষ পর্যন্ত নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয় এবং ১৯৫৬ সালে সংবিধান পরিবর্তনের মাধ্যমে বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি প্রদান করে। ১৯৯৯ সালে ইউনেসকো ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। ফলশ্রুতিতে ২০০০ সাল থেকে পৃথিবীর প্রায় সব স্বাধীন দেশ ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে উদযাপন করে আসছে।

এর মাঝেও একটি তথ্য দিতে হয়, পাকিস্তান গণপরিষদে প্রথম বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার একটি প্রস্তাব করে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। প্রস্তাবটিতে তিনি বলেন, উর্দু ও ইংরেজির সঙ্গে বাংলাকেও গণপরিষদের অন্যতম ভাষা হিসেবে ব্যবহারের অধিকার থাকতে হবে।

বাংলা ও বাঙালির এমনসব ইতিহাস, ত্যাগ, সংগ্রাম ও আনন্দের খবর প্রায় সবার জানা। আধুনিকতার পরশে একটু খোঁজ নিলেই এসব পাওয়া যায়। কথা থাকে এত গৌরব, অহমিকা ও সমৃদ্ধি আমরা কতটুকু ধরে রেখেছি। পাকিস্তানের ক্রুদ্ধ ও জিঘাংসার দৃষ্টিকে উপেক্ষা করে যারা আমাদের মায়ের বুলিকে স্বীকৃতির পথ করে দিয়েছেন তাদের এবং বাংলার মর্যাদা কতটুকু রাখতে পেরেছি আমরা? এসব প্রশ্ন পেণ্ডুলামের মতো দুলছে। সমান্তরালে দুলছে বাংলাকে হেয় করার প্রবণতা। এখন রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক অনেক স্থানে বাংলা সঠিক মর্যাদা পাচ্ছে না। এই স্বাধীন দেশে এটি হওয়ার কথা ছিল না।

একুশ শতকের আধুনিকতা আমাদের বাঙালিকেই নামে বাঙালি করে রেখেছে। আমরা এখন বিদ্যা শিখি না। যা কিছু শিখি তা বাঁচার তাগিদে উপার্জনের জন্য। ফলে আমাদের সঠিক ও শুদ্ধরূপে বাংলা শিখা হয় না। বৈশ্বিক অস্থিরতায় এখন খুব সহজেই সব ভাষা গুবলেট হয়ে যাচ্ছে। আর এ সুযোগে এখনকার ছোট শিশুটির কানের কাছে ভাসছে নানা ভাষার উচ্চারণ। ফলে সে বুঝছে না কোথায় তার সংস্কৃতি। এক সময় সে সহজেই এমন কিছু বলে ফেলছে যা জাতির হিসেবে পূর্ব প্রজন্ম, অভিভাবক বা বাবা মায়ের লজ্জার। কিন্তু এ লজ্জা আমরা মাখছি না। সবাই ছুটছি বেঁচে থাকার কৌশল খোঁজায়। এ খোঁজাখুঁজি আমাদের নিয়ে যাচ্ছে অন্য অস্থিরতায়। আমাদের চারপাশে এখন দুলছে অসংখ্য ফাঁদ। যা গ্রাস করছে সংস্কৃতিকে। আমরা বুঝছি না খুব নিকটেই বা বর্তমানেও আমাদের উত্তর প্রজন্ম ‘আমার সোনার বাংলা’ বা ‘দাম দিয়ে কিনেছি বাংলা’ বা ‘আমি বাংলায় গান গাই’ এমনসব শিকড়ের গান বা নিজের সত্তা ভুলে অন্য কিছু গাবে।

যুগের অস্থিরতা বা চলমানতায় আমরা দেখছি নির্ভরযোগ্য কিছু ক্ষেত্রেও এখন বাংলা অবহেলিত। এর মাঝে আছে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ দফতর; আছে গণমাধ্যম। সামাজিক ক্ষেত্রেও বাংলা অবহেলিত। পরিতাপের বিষয় গণমাধ্যম এখন গুবলেট বাংলিশ বলছে। সহজ-সরল বাংলা ব্যবহার না করে তারা নানা ভাষার শব্দের মধ্যে মাধুর্যতা খুঁজছে। আর এ খোঁজাখুঁজির বেলায় এখন আমরা ফেব্রুয়ারি এলেই বাংলার শরনাপন্ন হচ্ছি। দিবসের মতো বাংলা এখন বাৎসরিক হয়ে যাচ্ছে। কষ্টের বিষয় তাও বছরে একবার এক মাসের জন্য। তাতেই হাসফাস করছি আমরা অনেকে। পুরো একমাস বাংলাপ্রেমিক হতে হয় লোক দেখানো চলে। অন্যেরা কী বলবে?- এ ভাবনার আশ্রয়ে! এ সময় আমরা হুমরি খেয়ে পড়ছি বাংলাকে ভালোবাসার প্রবণতায়। বাকিটা সময় পুরোটা জীবন আমরা এগুচ্ছি অন্য ভাষার হাত ধরে। ভাষার প্রতি ভাষার কোনো ঈর্ষা বা বিদ্বেষ নেই। তারপরও যখন নিজেরটা ভুলে যাই তখন পরের ওপর দোষ চাপবেই।

আমাদের চারপাশে এখন অন্য ভাষার ছড়াছড়ি। কিছুক্ষেত্রে উপহাসের মতো বাংলার নামকে অন্য ভাষায় চিহ্নিত করে রাখছি আমরা। আমরা বিশ্বের সঙ্গে সমানতালে এগুব, কিন্তু বাংলাকে বাদ দিয়ে নয়। এখন আমাদের প্রজন্ম চিনে না অতুলপ্রসাদ, প্রতুল মুখোপাধ্যায়কে। তারা ঠিকই চিনে অন্য অনেককে। আমরা কোথায় এগুচ্ছি?

পৃথিবীর কোনো জাতি নিজ শিকড় কেটে ফেলছে না। আমরা কাটছি। কাটছি যে তাই বুঝছি না। বিষয়টি এমন- গাছে উঠে আপনার আকড়ে ধরা ডালই আপনি কাটছেন। বুঝতে পারছেন না। যখন কিছুই করার থাকবে না তখন বুঝবেন। বুঝেও তখন লাভ নেই।

আমাদের গণমাধ্যমের অনেক শাখায়, সচরাচর পারস্পরিক কথোপকথনে এমন কিছু বলছি যাকে ঠিক কোনো ভাষাই বলা যাবে না। একে বলা যাবে সব ভাষার অস্থিরতা। এমন অস্তিরতার খোঁজ দিতে রক্ত দেননি সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ নাম না জানা বীরেরা। প্রাণের ভয় না করে রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে নিজের মায়ের বুলিকে পাকিস্তানীদের কাছে তুলে ধরেননি একজন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত।

এমন করে আমরা কী পেলাম? যেখানে বর্তমান গণমাধ্যমের আসংখ্য শাখায় এমন উচ্চারণ ও শব্দ ব্যবহার হচ্ছে যাতে মনে হবে এরা এ যুগের নূরুল আমিন। দুঃখের বিষয় তার বাড়িও ছিল বাংলাদেশে। আমরাও এদেশের হয়ে, নিজের আশ্রিত ডাল কোপাচ্ছি। যখন দপাস করে ভুতলে পড়ব তখন চেতনা ফিরবে কী করলাম?

আমাদের শেখার জায়গাটি ছোট করে ফেলছি আমরাই। আমরা এখন আর গান করি না; সং করি। ফলে আমরা সঙ সেজে বসে আছি। আমাদের শিল্পীরা এখন হয়ে যাচ্ছেন আর্টিস্ট। পরীক্ষা হয়ে যাচ্ছে এক্সাম। বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে যাচ্ছে ভার্সিটি। আমরা হয়ে যাচ্ছি অদ্ভুত পিপল। যে পিপল ফুড খাই। ভাতকে বাত বলে ভাষার রোগ সৃষ্টি করছি। আমাদের বর্তমান প্রজন্ম আর পড়ে না ‘বাঁশ বাগানের মাথার উপর...’। তাদের আমরা জীবিকা নামক আজব জুজুতে চাপিয়ে দিচ্ছি ‘হিং টিং ছট’। বর্তমান প্রজন্মকে এখনই বাংলার কোনো শব্দকে ইংরেজির আশ্রয়ে বুঝাতে হয়। তাদের বলতে হয় রুম মানে কক্ষ। লিসনার মানেই শ্রোতা। টিচারই হলেন শিক্ষক।

তারা অন্যেরটা আগে জানছে। কিছু ক্ষেত্রে কোনোটাই জানছে না। ফলে কথা বলছে অনেক ভাষার মিশ্রণে। একেই এরা যুগের আধুনিকতা হিসেবে জানছে। তারা যোগ্য হচ্ছে না কিছুর। তারা স্মার্টনেসের আশ্রয়ে ব্যক্তিত্ব খুঁজে বেড়ায়। তারা প্রজন্ম হিসেবে জেনারেশনে কমফোর্ট ফিল করে। তবুও নিজের ও অভিভাবকের অযোগ্যতায় স্বাচ্ছন্দ বোধ করে না। অভিভাবক কি তা তারা বুঝে না। বুঝে গার্জিয়ান। আর অভিভাবকও গার্জিয়ান হয়ে থাকছেন। মা-বাবার পর প্রথম আশ্রয় শিক্ষক এখন আর তাদের চোখে আপা নন। হয়ে গেছেন ম্যাম। বিদ্যালয় বা পাঠশালাও তারা চিনে না। তারা চিনে স্কুল। নিজেরটা চিনে সব না চিনলেও দোষের ছিল না। অথচ তারা নিজের পরের কিছুই চিনছে না। সৃষ্টি করছে ভাষার জঞ্জাল। তৈরি হচ্ছে জিএফ, ওএমজির মতো উদ্ভট সব কথামালা। কথামালা অবশ্য তাদের বোঝানো হয় নাই। তারা কনভারসেসনে বিশ্বাসী। তারা বিশ্বাস রাখে না। রাখে বিলিভ।

রাষ্ট্র, সমাজ ও উত্তর প্রজন্মের অক্ষমতায়, যুগের ভুল আশ্রয়ে তারা এখন কী রাখে প্রশ্নসাপেক্ষ। অবশ্য প্রশ্ন ও উত্তর তারা দিতে প্রস্তুত না। তারা কোশ্চেন ও আনসারে সীমাবদ্ধ। এমন করে তাদের ও তাদের পরবর্তী প্রজন্ম কোথায় ঠেকছে ও ঠেকবে তা ভাবা দুষ্কর। তাদের চোখে তারা এমন জেনারেশন যাকিছু দুঃসাধ্যকে ডিফিকাল্ট দেখে। বিনিময়ে অসংখ্য অক্ষমতা নিয়ে আমরা দেখি একজন ধীরেন্দ্রনাথের দুঃখ। সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারের আজন্ম কষ্ট।

আমরা তাদের মুখে কী তুলে দিচ্ছি? তাদের কোন অনাগত গালাগালিতে রেখে যাচ্ছি? দৃষ্টতা ঠেকলেও বলি, বাঙালি হয়ে বাংলার আশ্রয় নিতে না পারাদের গালাগালিই দেয়া শ্রেয়। এবং তাদের মুখে কথোপকথন না হয়ে যে খিচুরি কনভারসেসন হয় তাকেও গালাগালিই বলা উত্তম!
এমন উত্তমের বেলায় ওল্ড জেনারেশন হিসেবে বলছি, সব নিয়েও- আমি বাংলায় গান গাই, আমি বাংলার গান গাই। আমি, আমার আমিকে চিরদিন এই বাংলায় খুঁজে পাই...।

লেখক : কবি ও সাংবাদিক

ফেমাসনিউজ২৪/আরইউ