logo

বুধবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৮ | ২৮ অগ্রহায়ণ, ১৪২৫

header-ad

বরং মানুষই নিষিদ্ধ হোক, ফানুসের ঝামেলাও রইবে না

প্রতীক ইজাজ | আপডেট: ১১ জানুয়ারি ২০১৮

উৎসব রঙ হারাচ্ছে। সংকুচিত হচ্ছে। মানুষের মিলন মেলা রুপ নিচ্ছে শঙ্কায়। আমরা পেছনে যাচ্ছি। আলো থেকে অন্ধকারে। বুঝতে পারছি না। চোখ বন্ধ করে আছি। দায়িত্ব নিচ্ছি, পাচ্ছি। নিজের অক্ষমতা প্রকাশ করছি না। মন খুলছি না। কায়িক শ্রম দিচ্ছি নির্বুদ্ধের মতো। সৃজনশীলতা শিখছি না। সর্বজন উপেক্ষা করছি। সর্বমত গ্রাহ্য করছি না। সময় পার করছি মাত্র, যাপন করছি না। সুন্দর শোভন স্বপ্ন চাষ করছি না। ফসল বুনছি না। বৃক্ষ-বৃন্তহীন শুষ্ক এক টুকরো ভুমির দিকে হাঁটছি কেবল।

রাজনীতি এখন সব আমাদের। রাজনীতি-ই অগ্রগণ্য। রাজনীতির সালুতে আচ্ছাদিত আমি আমরা দেশ। রাজনীতির বাইরে কোন কথা নেই। রাজনৈতিক আজ্ঞায় শিরোধার্য। যখন যে ল ক্ষমতায়, দিকে প্রকরণে তারেই উত্থিত হাত; বিস্তৃত ডালপালা। ফুটপাতে চায়ের দোকান, প্রতিবেশীর সীমানা দেয়াল, মানুষে মানুষে সংঘাত, সংঘর্ষ, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদেশ- সবই রাজনৈতিক, রাজনীতির। নাগরিক তুচ্ছ, গৌণ। কোন স্বপ্ন সাধ নেই। সুবিধাভোগী আছে। প্রতিবাদ নেই, মিছিল নেই, স্লোগান নেই। গনতন্ত্রের বিকাশ নেই। এখনো নির্বাচন এলে নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে বাগ্বিতন্ডা বাধে।

শান্তি শৃঙ্খলা বা নাগরিক নিরাপত্তায় সৃজনশীলতা কাজে আসছে না। আমরা ভাবছি না। উৎসবমুখর মানুষকে উৎসবহীন করে তুলছি। মুক্ত হতে দিচ্ছি না। আনন্দহীন হয়ে পড়ছি। সরকারি আদেশ বিবৃতির আজ্ঞাবহ হয়ে উঠছি আমরা, আমাদের উৎসব, পার্বন, উল্লাস। অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতি, সর্বজনীন ধর্মের কথা বলছি। মুক্তবুদ্ধি চর্চার কথা বলছি। করছি না। করতে দিচ্ছি না। বারবার মুছে যাচ্ছে উৎসবের রঙ।

ঈদের আগের দিন চাঁদরাতে পাড়াসুদ্ধ মানুষ হুল্লোড় করে পটকা ফোটাতাম আমরা। দুই বছর আগেও ফুটিয়েছি। কেবল পটকা কেনার জন্যই আলাদা বাজেট থাকতো। নানা রকমের শব্দের পটকা। বাড়ির সামনের সড়কে, আশেপাশের বাড়ির ছাদে ভীড় জমতো। চাঁদ দেখার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হতো উৎসব। মুরব্বিরা মাঝে মধ্যে ধমক দিতো। কিন্তু নিবৃত করতো না আতশবাজি থেকে। এখন আর সে ঈদে পটকা ফোটাতে দেয় না পুলিশ।

আমি যখন প্রথম ঢাকায় আসি, শ্যামল রানাদের সঙ্গে চারুকলায় রাতের পর রাত কাটতো মুখোশ বানিয়ে। কত রকম রঙ নকশার মুখোশ। মুখোশই ছিল প্রতিবাদের ভাষা। যে কথা বলা হতো না, ভেতরে জমে থাকতো ক্ষোভ ঘৃণা, নানা আদলের নকশার মুখোশ অবলীলায় বলতো সে কথা। প্রতিবাদ করতো। উজ্জীবিত হতাম। নতুন করে মগ্ন হতাম সুন্দর শান্তি প্রেম সৃজনে, সৃষ্টিতে।

এখন সেই মুখোশও নিষিদ্ধ। বাঙালির প্রাণের উৎসব বর্ষবরণের মঙ্গল শোভাযাত্রায় এখন আর কাউকে মুখোশ পড়ে অংশ নিতে দেয় না রাষ্ট্র। নিষিদ্ধ ভুভুজেলাও। বিকেল পাঁচটার নিষিদ্ধ উন্মুক্ত স্থানে উৎসব বরণ। সন্ধ্যার মধ্যে খালি করতে হয় সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশের এলাকা।

২০০০ সালের বছরের শেষ রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের (টিএসসি) চত্তরে বাঁধন নামের একটি মেয়ে লাঞ্চিত হয়েছিল। সে ঘটনা খুবই মর্মপীড়ার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল আমারে।  প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছিলাম। বিচার চেয়েছিলাম। পাইনি। উল্টো হুট করে সিধান্ত দেয়া হলো রাত আটটার পরে টিএসসিতে কেউ থাকতে পারবে না। মাসতিনেক না যেতেই বললো চায়ের দোকান রাখা যাবে না। সেই থেকে নানা বিধিনিষেধের ঘেরাটোপে বন্দি হয় উৎসব। রঙ হারিয়ে এই রাত এখন প্রশাসনের দার্য়িত্ব পালনের অনুষঙ্গ মাত্র।

এবার নিষিদ্ধ হলো ফানুস। এখন থেকে আর কোন উৎসবে ফানুস উড়বে না আকাশে। পুলিশ বলছে, অনেক সময় আগুন নিভে যাওয়ার আগেই ফানুস নিচে পড়ে যায়। রাজধানী শহর ঢাকা ঘনবসতিপূর্ণ হওয়ায় এবং এই শহরে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা থাকায় ফানুস থেকে অগ্নিকাণ্ড ও বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে। নাশকতার আশঙ্কাও উড়িয়ে দিচ্ছে না পুলিশ। সে কারণেই এই নিষেধাজ্ঞা জারি।

আরো কড়াকড়ি হলো ইংরেজি বছরের শেষ রাতে নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর উৎসব। সে রাতে উন্মুক্ত স্থানে সমাবেশ, গান-বাজনা, আতশবাজি পোড়ানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। এমনকি ইংরেজি নববর্ষ উপলক্ষে কোনও উন্মুক্ত স্থানে বা বাড়ির ছাদে কোনও সমাবেশ বা গান-বাজনার আয়োজন করা যাবে না এবং কোনোভাবেই আতশবাজি পোড়ানো যাবে না। এমনকি চার দেয়ালের মধ্যে নববর্ষ উদযাপন করতে হলেও আগেই পুলিশকে জানাতে হবে। কেউ এই নির্দেশ অমান্য করলে তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ইংরেজি বছরের শেষ রাত তো আগেই হারিয়েছি আমরা। এবার হারালাম ফানুস। অথচ এই ফানুস নিষিদ্ধের পেছনে যে যুক্তির কথা বলা হচ্ছে, তা যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। কারণ ফানুস উড়ানো হয় অনেক আগে থেকেই। আজ অবধি কোন ক্ষয়ক্ষতির প্রমান মেলেনি। ফানুসের আগুনের চেরাগটি একটু ভেতরের দিকে থাকে, যাতে বাতাসে নিভে না যায়। যদি বাতাসে চেরাগ নিভে যায়, তাহলে ফানুসটি নিচে পড়ে যাবে। আবার ফানুসের তাবুটি আগুনে কুচকে যাবে কিন্তু গলবে না। তাই ফানুসে আগুন লেগে যাওয়ার তেমন ভয় নেই। আর চেরাগটি যদি কোনভাবে ফানুস থেকে খুলে যায় বা পড়ে যায় তাহলে চেরাগটি নিভে যাবে বাতাসে।

এ দেশে ফানুসের প্রচলন প্রাচীন। পৌষ সংক্রান্তি উৎসবে পুরনো ঢাকায় ঘুড়ির পাশাপাশি ফানুস বেশ জনপ্রিয়।  দেশে ফানুস ওড়ে ঐতিহ্য লালনের জায়গা থেকে। অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতি ও মুক্ত চিন্তাচর্চার তাড়না থেকে।

ফানুস বৌদ্ধ ধর্মের মানুষের কাছে একটা ধর্মীয় সংস্কার। প্রবারণা পূর্ণিমার দিন ফানুস ওড়ানো হয়। স্বর্গের দেবতারা দেবরাজ ইন্দ্র কর্তৃক স্থাপিত চুলামনি জাদীকে এখনো পূজা করেন বিধায় তারাও প্রবারণা পূর্ণিমার দিন ফানুস উড়িয়ে পূজা করেন। ফানুস উড়ানোর অর্থ ঐ চুলামনি জাদীর পূজা করা। প্রদীপ পূজা করা।

শান্তি ও সৌভাগ্যের প্রতীক ফানুস। রাতের আঁধার কেটে আকাশে উড়ে যায় ফানুস। অন্ধকার সরিয়ে আলোর বার্তা নিয়ে ছুটে যায় ঊর্ধ্বালোকে। বাতাসে ভেসে চলে যায় বহুদূর। তারায় আলোকময় রাতের আকাশ আরও আলোকিত হয়ে ওঠে। সুখশান্তিময় ভবিষ্যতের কামনা করি আমরা।

তবে এবারই প্রথম ইংরেজি বছরের শেষ রাতে এত ঘটা করে, ঝাকে ঝাকে ঢাকার রাতের আকাশে ফানুস উড়তে দেখলাম আমরা। এর আগে আর কখনোই এভাবে ওড়ানো হয়নি। এবার উড়লো প্রতিবাদ হয়ে। ক্ষোভ-বঞ্চনার বহি:প্রকাশ হিসেবে। আনন্দের উৎসব হয়ে। মানুষ আর সরকারের উৎসববিমুখ আচরণ মেনে নিতে পারছে না। পারছে না বলেই হঠাৎ করেই শেষ রাতে আকাশ জ্বলে উঠলো ফানুসে। এত ফানুস, এক সঙ্গে, এত উজ্জ্বল হয়ে, এর আগে আর কখনোই দেখিনি আমরা।

একের পর এক উৎসব অনুষঙ্গ, উপকরণ, প্রকরণ নিষিদ্ধ হচ্ছে। উৎসব এলেই মানুষকে জোর করে আটকে রাখা হচ্ছে ঘরে। অযৌক্তিক যুক্তি তুলে জারি হচ্ছে বিধিনিষেধ। উল্লাসে সামিল মানুষের নিরাপত্তায় বিকল্প ভাবা হচ্ছে না। পরিস্থিতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে যুক্ত হচ্ছে না উপযুক্ত উপযোগিতা। পথ আটকে দিচ্ছি। সময় বেধে দিচ্ছি। উৎসব কেন্দ্রগুলোকে ঢেকে দিচ্ছি অন্ধকারে। উৎসব রঙ হারাচ্ছে। উড়ছে মন খারাপের দেশে।

এর চেয়ে বরং মানুষই নিষিদ্ধ হোক; ফানুসের ঝামেলাও রইবে না; উৎসব নিয়েও ভাবতে হবে না বৈরি সময়কে।

লেখক: সাংবাদিক, কবি ও সংস্কৃতিকর্মী।

ফেমাসনিউজ২৪/এমএইচ/অারকে