logo

শুক্রবার, ২২ জুন ২০১৮ | ৮ আষাঢ়, ১৪২৫

header-ad

আমাদের মুমিনুল ও হারানো দিনের হাথুরু!

সৈয়দ শিশির | আপডেট: ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

টেস্ট সেঞ্চুরিটা মুমিনুল হকের জন্য নতুন কিছু নয়। মঞ্চ যদি হয় চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়াম, তবে তো টেস্ট সেঞ্চুরি তার জন্য বেশ নিয়মিতই এক ব্যাপার। কিন্তু সেঞ্চুরির পর উল্লাস? আকাশে মুষ্টিবদ্ধ হাত ছোড়া? এসবই তো মুমিনুলের জন্য নতুন। মুমিনুলের এ রকম উদযাপন তো দেখা যায়নি আগের চার সেঞ্চুরির কোনোটিতেই! অথচ এই মুমিনুলকে কী করতে চেয়েছিলেন কোচ হাথুরু?

টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার পর ২০০০ সাল থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশের হয়ে টেস্ট খেলেছেন ৮৭ জন ক্রিকেটার। তাদের মধ্যে প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে একটি টেস্ট ম্যাচের দুই ইনিংসেই সেঞ্চুরি করার দারুণ কীর্তি গড়লেন টপ অর্ডার ব্যাটসম্যান মুমিনুল হক। সফরকারী শ্রীলংকার বিপক্ষে চট্টগ্রাম টেস্টের প্রথম ইনিংসে ১৭৬ রান করা মুমিনুল ৪ ফেব্রুয়ারি ম্যাচের শেষ দিনেও তুলে নিয়েছেন দারুণ এক শতক, করেন ১০৫ রান। আর এর মধ্য দিয়েই প্রথম বাংলাদেশি ক্রিকেটার হিসেবে এক টেস্টের দুই ইনিংসেই সেঞ্চুরি করার কীর্তি গড়েন তিনি।

নতুন এই কীর্তি গড়ার আগে চট্টগ্রাম টেস্টে অবশ্য আরেকটি বাংলাদেশি রেকর্ড নিজের করে নেন মুমিনুল। বাংলাদেশি ক্রিকেটার হিসেবে এক টেস্টে সবচেয়ে বেশি রানের রেকর্ডটি তামিমের কাছ থেকে নিজের করে নেন তিনি। এছাড়া এই ম্যাচেই টেস্ট ক্রিকেটে ২ হাজার রানের মাইলফলকও অতিক্রম করেন মুমিনুল। সব মিলিয়ে চট্টগ্রাম টেস্ট দারুণ এক পয়মন্ত ম্যাচ হয়েই ধরা দিয়েছে মুমিনুল হকের কাছে। চট্টগ্রাম টেস্ট খেলতে নামার আগে ২৫ টেস্টের ক্যারিয়ারে ৪৩.৮০ গড়ে মুমিনুলের রান ছিল ১ হাজার ৮৪০, যেখানে শতক ৪টি ও অর্ধশতকের ইনিংস ছিল ১২টি।

বলছি, শ্রীলংকার বিপক্ষে মুমিনুল যেন নিজেকে ফিরে পেলেন। যেন অনেক দিনের জমে থাকা হতাশা, নিজেকে প্রমাণের তাড়না, ক্ষোভ সব একসঙ্গে বেরোলো সেঞ্চুরির পরের ওই উদযাপনে। ‘ক্ষোভ’ শব্দটা দেখে অনেকের হয়তো খটকা লাগতে পারে। তবে মুমিনুলের প্রসঙ্গে এই শব্দটা বেশ ভালোভাবেই যায়।

আজ মনে পড়ছে-কিছুদিন আগে সাবেক অধিনায়ক ও ক্রিকেট অপারেশন্স কমিটির চেয়ারম্যান নাঈমুর রহমান দুর্জয় আফসোস করে বলেছিলেন, মুমিনুলের মতো প্রতিভাবান খেলোয়াড়ের ক্যারিয়ার ধ্বংস করে ছাড়ছেন হাথুরুসিংহে। শুধু দুর্জয় নন, সাবেক ক্রিকেটার থেকে ক্রীড়া সাংবাদিক, ক্রিকেটপ্রেমী সবারই ছিল একই অভিযোগ। তারপরও তখন স্বেচ্ছাচারী কোচের লাগাম টেনে ধরেনি বিসিবি!

বাংলাদেশ দলের সাবেক কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহে শ্রীলংকা দলের বর্তমান কোচ। বাংলাদেশের ক্রিকেটে হাথুরু-যুগের সময় যে কয়েকটা বিষয় আলোচনায় ছিল, তার একটা ছিল মুমিনুলের প্রতি হাথুরুর বিরূপ মনোভাব। দায়িত্ব নেওয়ার কয়েকদিন পর থেকেই মুমিনুলকে নিয়ে নিজের নেতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেন লংকান এই কোচ।

ওয়ানডে দল থেকে এক প্রকার বাতিল করে দেন, এমনকি টেস্ট দল থেকেও মুমিনুলের প্রথম বাদ পড়া হাথুরুর ‘কল্যাণেই’। শুরুতে লংকান এই কোচের দাবি ছিল, শর্ট বলে মুমিনুল বেশ দুর্বল। এরপর একটা সময় অফস্পিনেও মুমিনুলের দুর্বলতা খুঁজে পান হাথুরু। সঙ্গে তার ব্যাটিং নিয়ে অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা তো ছিলই।

২০১৩ সালে মুমিনুলের ক্যারিয়ার শুরু হয়েছিল বিশ্বকে ভালোভাবে জানিয়ে। অভিষেক টেস্টে সেঞ্চুরি। এরপর টানা ১১ টেস্টে হাফ সেঞ্চুরির রেকর্ড। ২০ টেস্ট খেলার পর তার ব্যাটিং গড় ৬০ এর বেশি। কিন্তু ২০১৪ সালে হাথুরু জামানা শুরু হওয়ার পর তার দুর্দিন শুরু। কেন যেন মুমিনলকে পছন্দ করেননি হাথুরুসিংহে। ২০১৪ সালের ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে হঠাৎ আবিষ্কার করে বসলেন, ‘শর্ট বলে মুমিনুল দুর্বল!’ বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছিল ওই অভিযোগ। মুমিনুলের ক্রিকেট গুরু ও কৃতি কোচ মোহাম্মদ সালাউদ্দিন যেন আকাশ থেকে পড়েলেন। কারণ তিনি জানতেন, মুমিনুল শর্ট বলে অনেক বেশি শক্তিশালী। হাথুরুর কেন এমন অভিযোগ করলেন কেউ তা বুঝে উঠতে পারেননি।

কোচের পক্ষ থেকে আসা ওই অভিযোগ অনেক বড় ধাক্কা ছিল মুমিনুলের জন্য।বিশেষ করে আত্মবিশ্বাসের ক্ষেত্রে। তবে এখানেই থেমে থাকেননি কোচ। মুমিনুলের জন্য আরও আঘাত অপেক্ষা করছিল। এবারের অভিযোগ, ওয়ানডে ম্যাচের উপযোগী নন মুমিনুল। এ ফরম্যাটে নিষিদ্ধ করে রাখা হলো তাকে। মুমিনুলের জন্য এটা ছিল সবচেয়ে বড় আঘাত। কারণ দুর্বল ঘরোয়া ক্রিকেট খেলে টেস্টে উপযুক্ত রাখা খুবই কঠিন কাজ। বছরে অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, ভারতের মতো ১০-১৫টি টেস্ট খেললে ভিন্ন কথা। বছরে ৩/৪টি টেস্ট খেলে বাংলাদেশ। তাই মুমিনুলের ক্যারিয়ারও সংকোচিত হয়ে আসে। এর প্রভাবও পড়ে তার ক্যারিয়ারে।

দেশসেরা টেস্ট ব্যাটসম্যানকে বাদ দেওয়া হয়েছিল দেশের শততম টেস্টে। এরপর দেশের মাটিতে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে তাকে বাইরে রেখেই দল ঘোষণা করা হলো। মিডিয়ার প্রচণ্ড চাপে অবশ্য দ্বিতীয় টেস্টে দলে নেওয়া হয় তাকে। কোচের ইচ্ছাতেই যে তাকে দলের বাইরে রাখেন তা প্রকান্তরে স্বীকারও করে নেন নির্বাচকরা।

হাথুরুসিংহে কোচ হওয়ার আগে মুমিনুলের টেস্ট গড় ছিল ৭৫.৫০। হাথুরুসিংহে জমানায় গড় ৩৫.৮৮। একজন ক্রিকেটার ভালো খেলেছেন মানে তার প্রতিভা ও সামর্থ্য আছে এই পর্যায়ে ভালো করার। হুট করে ফর্ম হারালে বা ভুল করতে থাকলে সেটি শোধরানোর মূল দায়িত্ব কোচের। কিন্তু কোচ সেটা না করে উল্টো নানা অভিযোগ জাহির করে আত্মবিশ্বাস নষ্ট করে দেন খেলোয়াড়ের। 

আজ হাথুরু নেই। মুমিনুলের ব্যাটে সেই ছন্দ। আবার সেই ক্লাসিক মুমিনুল। এমন বাস্তবতায় বলতে চাই-হাথুরুসিংহে গত জন্মে বিশ্বাস করেন কি-না জানি না। যদি বিশ্বাস করেন, তাহলে হতে পারে-তিনি ধরে নিয়েছিলেন গত জন্মে মুমিনুল তার শত্রু ছিল!

লেখক : কবি, কলামিস্ট ও সাংবাদিক, সম্পাদক, আড়াইলেন।

ফেমাসনিউজ২৪/আরইউ