logo

সোমবার, ১৯ নভেম্বর ২০১৮ | ৫ অগ্রহায়ণ, ১৪২৫

header-ad

বকশীবাজারে মিলবে সরল অংকের ফল

বিপুল হাসান | আপডেট: ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

একটা সরল অংক মেলাতে পারছি না, জটিল লাগছে। কেউ কি মেলাতে পারেন? অংকটা তুলে ধরার আগে একটা আলোচিত ঘটনার কথা বলি।

বুড়ো বয়সে রেলমন্ত্রী মুজিবুল হকের বিয়ের অনুষ্ঠানটি ঘিরে দেশের মানুষের আগ্রহ ছিল তুঙ্গে। এই মন্ত্রী বরাবরই নিজেকে সাধারণ একজন মধ্যবিত্ত শ্রেণীর আইনজীবী হিসেবে দাবি করতে পছন্দ করেন। আলোচিত এ বিয়ের অানুষ্ঠানিকতায় যোগ দেওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। মাইগড, একজন মধ্যবিত্ত মন্ত্রীর পক্ষে বিয়ের এমন রাজকীয় আয়োজন কী করে সম্ভব? রেলমন্ত্রীর গ্রামের বাড়ি চৌদ্দগ্রামে বৌভাতের অনুষ্ঠানে যে প্যান্ডেলটি করা হয়েছিল তার আয়তন ছিল মিরপুর স্টেডিয়ামের সমান, অবস্থা বুঝে নেন এবার।

মন্ত্রীর ঘণিষ্ঠজনরা বলাবলি করছিলেন, বিয়ের আনুষ্ঠানিকতায় খরচ হয়েছে কমপক্ষে ২০ কোটি টাকা। ওরে বাপ, এত টাকা? মুজিবুল হকের ঘণিষ্ঠরাই জানান, ওই টাকা মন্ত্রীকে উপহার হিসেবে দিয়েছেন।

এবার আসা যাক মূল অংকে। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া দুইটি পূর্ণ মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। সেই বেগম জিয়াই এতিমদের জন্য বিদেশ থেকে আসা ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৭১ টাকা তার বড় ছেলে তারেক রহমান, দুই প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী কাজী সালিমুল হক কামাল ওরফে ইকোনো কামাল ও শরফুদ্দীন আহমেদ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক সচিব ড. কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী ও প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়ার ভাগ্নে মমিনুর রহমানকে নিয়ে আত্মসাৎ করেছেন। কোনো মন্ত্রী যদি তার বিয়েতে অন্যদের কাছ থেকে ২০ কোটি টাকা উপহার আদায় করতে পারেন, তাহলে একজন প্রধানমন্ত্রীর ইশারায় কতো কোটি টাকা নিজ তহবিলে আসতে পারে? মোট ছয়জন যদি আত্মসাৎ করা ওই টাকা ভাগাভাগি করে নিয়ে থাকেন তাহলে জনপ্রতি গড়ে কতো টাকা করে পেয়েছেন?

সরল অংক স্কুলে একসময় করেছি সবাই, জানি এটি নামে সরল হলেও এতোই গড়ল হয়ে ওঠে যে মিলানো যায় না কিছুতেই। কেউ যদি এই অংকটি কষে একটা ফলাফল দাঁড় করাতে পারেন তাহলে উত্তর মিলিয়ে দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে আর মাত্র কয়েকঘণ্টা। আপনার অংক কষা সঠিক নাকি ভুল, তা জানতে হলে চোখ রাখতে হবে বকশীবাজারে।

মাহেন্দ্রক্ষণ এসে গেছে। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে বহুল আলোচিত জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার রায় ঘোষণা করা হবে পুরান ঢাকার বকশীবাজারের কারা অধিদফতরের মাঠে স্থাপিত বিশেষ আদালতে। মামলার রায় নিয়ে দেশের মানুষের আগ্রহ এখন তুঙ্গে। গত কয়েকদিন ধরেই সর্বত্র আলোচিত হচ্ছে এই প্রসঙ্গ, সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী দণ্ডিত হবেন নাকি খালাশ পাবেন? সবার মুখে মুখে এই প্রশ্ন।

এই রায়কে ঘিয়ে জল্পনাকল্পনা পাশাপাশি উদ্বেগ-উৎকণ্ঠাও ছড়িয়ে পড়েছে। ঢাকায় মিছিল-সমাবেশ নিষিদ্ধ হলেও দুই প্রধান দলের পাল্টাপাল্টি ঘোষণায় নিরাপত্তা নিয়ে রয়েছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। রাজধানীতে বিজিবি টহল দিচ্ছে। সতর্কাবস্থায় রয়েছে পুলিশ-র‌্যাব। 

সেনাসমর্থিত ওয়ান ইলেভেন সরকারের আমলে ২০০৮ সালের ৩ জুলাই রমনা থানায় এতিমদের জন্য বিদেশ থেকে আসা ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৭১ টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগে জিয়া অরফানেজ মামলাটি করে দুদক। ২০০৯ সালের ৫ আগস্ট দুদক আসামিদের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে। দীর্ঘ ১০ বছরের আইনি প্রক্রিয়া শেষে মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের ৩২ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ, আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থন ও উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে বিশেষ জজ আদালত-৫ গত ২৫ জানুয়ারি রায় ঘোষণার জন্য ৮ ফেব্রুয়ারি (আজ) দিন ধার্য করে। বকশীবাজার আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে স্থাপিত বিশেষ আদালতের বিচারক ড. মো. আখতারুজ্জামান রায় ঘোষণা করবেন।। দোষী সাব্যস্ত হলে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে খালেদা জিয়ার।

সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর জন্য তৈরি রাখা হয়েছে দুই কারাগারের দুটি সেল। একটি হলো নাজিমউদ্দিন রোডের পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগার, অন্যটি হলো গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগার। এই প্রস্তুতির কারণে বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া নিশ্চিত সাজা পাচ্ছেন।

বিএনপি চেয়ারপারসনে বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগে ৩৭টি মামলার মধ্যে এই প্রথম কোনো মামলার রায় ঘোষণা হতে চলছে। তার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলোতে দুর্নীতি, হত্যা, নাশকতা, মানহানি ও রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ আনা হয়েছে। খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দায়ের ২১ মামলার বিচার প্রক্রিয়া এখনো শুরু হয়নি। এরমধ্যে চার্জশিট দাখিল হলেও তদন্তাধীন আছে বেশ কিছু মামলার কার্যক্রম।

খালেদা জিয়ার ১৪টি মামলার কার্যক্রম এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে বকশীবাজারের বিশেষ আদালতে স্থানান্তর করেছে। ৫ ফেব্রুয়ারি এই আদালত তার বিরুদ্ধে দায়ের করা রাষ্ট্রদ্রোহসহ ১১টি মামলার শুনানি পিছিয়েছে। মামলাগুলোর মধ্যে রাজধানীর দারুসসালাম থানার নাশকতার ৮ মামলার শুনানির জন্য আগামী ১২ মার্চ এবং যাত্রাবাড়ী থানায় দুটি ও রাষ্ট্রদ্রোহের অপর একটি মামলার শুনানির জন্য আগামী ১০ এপ্রিল দিন ধার্য করেছেন আদালত।

বকশীবাজারে স্থানান্তর হওয়া বাকি মামলাগুলোর মধ্যে দুর্নীতির মামলা তিনটি- গ্যাটকো, নাইকো ও বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি দুর্নীতির মামলা। অবশ্য এই সবগুলো মামলা হয়রানিমূলক ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা।

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে তৈরি হয়েছে উৎকণ্ঠা-উদ্বেগ। সবার মনেই কাজ করছে নানা আশঙ্কা-ভীতি। আশঙ্কা আমাদেরও রায় যায় হোক না কেন, সাধারণ মানুষ কেউই অশান্তি-উদ্বেগ চায় না।

আমরাও চাই, শুরুতে বলা সরল অংকটি যেন একদম খাপে খাপে মিলে যায়। আদালতকে সবসময় ন্যায়-বিচারের পথে দেখতে চাই।

(লেখকের একান্ত নিজস্ব মতামত)

লেখক : কবি ও সাংবাদিক

ফেমাসনিউজ২৪/আরএ/আরইউ