logo

সোমবার, ১৭ ডিসেম্বর ২০১৮ | ৩ পৌষ, ১৪২৫

header-ad

চাঁদ সুরুজও দেখছে তামাশা

শামীমুল হক | আপডেট: ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

নিরাশার চোরাবালিতে ডুবছে মানুষের আশা। ভরসার জায়গা হারিয়ে যাচ্ছে গভীর সমুদ্রে। চাঁদ-সুরুজ দু’ভাই দূর দেশে বসে দেখছে তামাশা। নিত্যনতুন কৌশলে ফায়দা লুটার ব্যর্থ চেষ্টা দেখে ভেংচি কাটছে পাখিরা। আর জীবজন্তুরা বনে বসে ধ্যান করছে, প্রার্থনা করছে সুমতি দেয়ার। তবুও কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছেই আজান দিয়ে। ঘোষণা দিয়ে। আর এর পক্ষে সাফাই চলছে সমানে।

মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঝড় উঠছে। শিক্ষা সচিব বলেছেন, প্রশ্ন ফাঁস রোধ তাদের দ্বারা সম্ভব নয়। পরীক্ষা শুরুর আগে মন্ত্রী বলেছেন, প্রশ্ন ফাঁস প্রমাণ হলেই পরীক্ষা বাতিল। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, আধাঘণ্টা আর একঘণ্টা আগে প্রশ্ন ফাঁস হলে, সেই প্রশ্নের উত্তর মাথায় নিয়ে পরীক্ষা দেবে- এমন ট্যালেন্ট শিক্ষার্থী কেউ আছে এটা বিশ্বাস করি না।

সব জায়গা থেকেই স্বীকার করে নেয়া হচ্ছে- প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছে। এটা রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। অভিভাবকরা এখন হতাশায় নিমজ্জিত। কোথায় যাবে তারা? এরই মধ্যে শুদ্ধি অভিযান শুরু হয়েছে ঢাকা শিক্ষাবোর্ডে। একদিনেই ত্রিশের অধিক কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে ঢাকার বাইরে। বলা হচ্ছে আরো চমক আছে।

আফসোস স্বাধীনতার ৪৭ বছর পর এসেও দেশ একটি পরিপূর্ণ শিক্ষা ব্যবস্থা পেল না। দেশের সবচেয়ে বাজে অবস্থা চলছে শিক্ষাক্ষেত্রে। যেখানে নিয়মের কোনো বালাই নেই। পত্রিকায় প্রায়ই খবর বেরোয় জাল সনদে কমপক্ষে ৫০ হাজার শিক্ষক চাকরি করছেন মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে। তদন্তে প্রমাণ পেলেও তাদের কিছু হচ্ছে না।

মাউশি তদন্ত করে রিপোর্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। মন্ত্রণালয় ম্যানেজ হয়ে যায় সহজেই। জাল সনদে শিক্ষক হয়ে তিনি কী পড়াবেন? তিনিতো সময় কাটানোর জন্য বিদ্যালয়ে যান। মাস শেষে এমপিও'র টাকা ব্যাংক থেকে তুলেন। ক্লাসে গিয়ে শিক্ষার্থীদের বলেন, রিডিং পড়ে যাও। তিনি চেয়ারে বসে ঘুমান। কিংবা রাজনীতিতে ব্যস্ত থাকেন।

যদি ক্লাসে সঠিকভাবে পড়া নেয়া হতো, দেয়া হতো তাহলে শিক্ষার্থীরা চাপে থাকতো। লেখাপড়া করতো। তারা প্রশ্ন ফাঁসের দিকে তাকিয়ে থাকতো না। অথচ পরীক্ষা পদ্ধতি বদল করা হয় নকল এড়াতে। শিক্ষার্থীদের যেন গোটা বই পড়তে হয়। কিন্তু ভাবনা এক, হয়েছে আরেক।

আশির দশকে দেশে নকলের বন্যা বয়ে যায়। ১৯৮৬ সালে শিক্ষক ধর্মঘটের মধ্যেই এসএসসি পরীক্ষা নেয়া হয়। সে সময় নকল করতে গিয়ে কেন্দ্রে কেন্দ্রে পুলিশের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষ হয়। শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে পুলিশ গুলিও চালায়। গত দশকে সরকারের কঠোর মনোভাবে নকল শূন্যের কোটায় চলে আসে। এখন নকল নেই সেভাবে। তবে প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছে।

এটাও একদিন বন্ধ হবে। কিন্তু এখন প্রশ্ন ফাঁস নিয়ে কে কি বলছেন নিজেই হয়তো জানেন না। বুদ্ধির খেলা খেলতে গিয়ে কখনও কখনও কেউ কেউ হাসির পাত্রে পরিণত হচ্ছেন। আমরা বিশ্বাস করি- সবকিছুর যেমন শুরু আছে, তেমন শেষও আছে। পৃথিবীর সৃষ্টি যেমন আছে, এর ধ্বংসও আছে। মানুষের জন্মতে যে সৃষ্টি, মৃত্যুতে তার শেষ।

এভাবে প্রশ্ন ফাঁসও একদিন বন্ধ হবে। তবে এর জন্য নিতে হবে সঠিক সিদ্ধান্ত। ইতিহাসে দেখা যায়, আবিষ্কারের নেশায় যে বিজ্ঞানী দিন-রাত কঠোর শ্রম দিয়েছেন, আবিষ্কারের মাধ্যমে সে বিজ্ঞানী নিজের নেশার ধ্বংস করেছেন। এ ধ্বংসের মাধ্যমেই মানুষ সভ্য জগৎ পেয়েছে। আধুনিক যুগ পেয়েছে। প্রযুক্তির মাধ্যমে পৃথিবীকে হাতের মুঠোয় এনেছে।

প্রশ্ন জাগে, এত উন্নতি যাদের, তাদের আবার পেছন ফিরে তাকাতে হয় কেন? আদিম যুগে মানুষ যেভাবে গোষ্ঠীবদ্ধ হয়ে জীবনকে এগিয়ে নিয়েছে, প্রযুক্তির যুগে কি সেভাবে এগিয়ে নিতে পারছে? যদি উত্তর- না হয়, তাহলে কেন? কি কারণে? এর জন্য দায়ী কে? রাজা- বাদশাহ, উজির-নাজিরের যেসব গল্প এখনও গ্রামবাংলার মানুষের মুখে মুখে, সেসব কাহিনী কি বর্তমান সমাজকে উদ্বুদ্ধ করতে পারছে?

অনেকে অনেক কথাই বলতে পারে। বাস্তবতা বড়ই কঠিন। বাস্তবতা বড় নির্মম। আমরা ক্ষ্যাপা বামুনের মতো শুধু বলেই যাই। যে বলাতে শিক্ষা নেয়ার কিছু থাকে না। কেউ শিক্ষা নিতেও পারে না। ফলে যা হওয়ার তা-ই হচ্ছে। আগাগোড়া সব সমান। আগা থেকে যে কথার শুরু তা শেষ হয় গোড়ায় গিয়ে। এর হেরফের হয় না। সবাই চেঁচায় একদিকেই।

এ প্রথা থেকে ফিরে আসা উচিত। মানুষ নিরাশার চোরাবালিতে আর ডুবতে চায় না। তারা আশারবাণীও শুনতে চান না। তারা চান সত্য ও সুন্দরকে আগলে ধরে এগিয়ে যেতে। প্রশ্ন ফাঁস রোধে ঢাকা শিক্ষাবোর্ড থেকে যে শুদ্ধি অভিযান শুরু হয়েছে আশা করি তা সবক্ষেত্রেই চলবে।

আর এমনটা হলে আশা করা যায়- সব অমঙ্গল দূর হবে। শিক্ষাক্ষেত্রে সব অনিয়মকে পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার এখনই সময়। মনে রাখতে হবে- শিক্ষাই জাতীর মেরুদণ্ড। বিষয়টি মাথায় রেখে এগিয়ে যেতে হবে। সফলতা আসবেই।
ফেমাসনিউজ২৪/এফএম/এমএম