logo

শুক্রবার, ২০ জুলাই ২০১৮ | ৫ শ্রাবণ, ১৪২৫

header-ad

আপনি আমাদের মুগ্ধতা প্রিয়ভাষিণী

প্রতীক ইজাজ | আপডেট: ০৬ মার্চ ২০১৮

আপনার সাথে কত স্মৃতি, কত ঘোরাঘুরি, কত গল্প! কত আনন্দময় সময় আপনাকে ঘিরে আমাদের! আপনার ছায়ায় ছায়ায় কত দিন বেঁচে থাকা আমাদের। কতদিন কত বছর কত কাল!

আপনার ভালোবাসা মায়া সরলতা সকালের আলোর মতো, রোদ্দুরজলে ধোয়া শুভ্র সকালের আলো। আমরা মুগ্ধ হয়ে যেতাম। আপনি হাসলে জোস্না ঝরতো, গান গাইতো বাতাস কানে কানে। আপনি কথা বললে শব্দগুলো ফুল হয়ে যেত, প্রজাপতি হয়ে যেত, রঙ ছড়াতো। আমরা উড়তাম মেঘে মেঘে, আনন্দে আনন্দে।

আপনি হাসতেন; ভুবন ডাঙ্গার হাসি। কী সরলতা সে হাসিতে। কী সহজ সরল সে হাসি! আপনি সামনে এসে দাঁড়ালে, হাত রাখলে মাথায় পিঠে, আমরা আরো বেশি শক্তি পেতাম, সাহসী হয়ে উঠতাম। আপনি আমাদের মুগ্ধতা প্রিয়ভাষিণী।

আমরা আপনার সাথে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার গঠনে দেশ চষে বেড়িয়েছি। জামায়াত অধ্যুষিত শক্ত ঘাঁটিগুলোতে আপনি আঘাত হেনেছেন। বক্তৃতা দিয়েছেন। পরিকল্পনা এঁটেছেন। আমাদের সাহস জুগিয়েছেন। বয়স, রোগব্যাধি, শারীরীক অবস্থা— আপনাকে ন্যুনতম টলাতে পারেনি পথ চলায়। আমরা আপনার থেকে বেঁচে থাকার সাহস নিতাম; স্বপ্ন বুনতাম শুভ শক্তির সরকার ও রাষ্ট্র গঠনে।

নিশ্চয় আপনি জানেন, দেখেও গেছেন, আপনাকে কী ভীষণ ভালোবাসতাম আমরা। শেষবার, গত বছর যখন আপনার ইন্টারভ্যু নিতে গেলাম, আপনি অসুস্থ ছিলেন, আমি চলে এসেছি, নেওয়া হয়নি। আমি নেইনি। কারণ আমাদের আপনাকে দরকার। আপনার বেঁচে থাকাটাই আমাদের মূল মুখ্য। আপনি হাসলে কথা বললে তবেই তো যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়া আমাদের।

একবার আমরা খুলনা গেছি। একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মুল কমিটির ট্যুর। পথে বিরতি। খাবার রেস্টুরেন্টে আপনি হঠাৎ অসুস্থবোধ করলেন। সোফায় হেলান দিয়ে বসে রইলেন অনেকক্ষণ। আপনি কী জানেন, সেবার কী ভীষণ উদ্বিগ্ন হয়েছিলাম আমরা। শাহরিয়ার ভাই (লেখক সাংবাদিক শাহরিয়ার কবীর) ও মুকুল ভাইকে (কাজী মুকুল) সেদিনই প্রথম দেখলাম কেমন পাগল পাগলভাব, দুশ্চিন্তাগ্রস্ত, অস্থির। শেষ অবধি অবশ্য আপনি উঠেছিলেন, আমাদের সাথে নাস্তা করেছেন, হেসেছেন। আমাদের যাত্রা শুভ হয়েছে।

আপনি যে বড় লাল টিপ দিতেন কপালে, পাথরের মালা পড়তেন গলায়, চোখে কাজল আঁকতেন মোটা করে; তার রঙ রূপ ছটা এখন আমাদের চোখে জল ঝরায়। আপনাকে ভুলব কী করে বলুন? আপনি তো কেবল একজন সাহসী মুক্তিযোদ্ধা বীরাঙ্গনাই নন; আপনি আমাদের মা। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে আপনি চোখের জলে আমাদের জন্ম জন্মান্তরের ঋণী করেছেন। সর্বস্ব খুইয়ে আমাদের মুক্তি দিয়েছেন, মুক্ত করেছেন, মা মাটি দেশ দিয়েছেন। একজনমে কী আপনার ঋণ শোধ হয় বলুন!

আপনাকে কাছে থেকে, নিবিড়ভাবে দেখেছি। আপনার সান্নিধ্য পেয়েছি। বারবার আপনি আমাদের মৃতপ্রায় স্বপ্নে প্রাণ দিয়েছেন, জাগিয়ে তুলেছেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, ঘাতক জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি ও নির্বাচন নিষিদ্ধ, ব্যক্তি থেকে সামাজিকভাবে বয়কট; কী সরল সহজভাবে বোঝাতেন সবাইকে, বলতেন। আপনি ঠিক গুছিয়ে কথা বলতে পারতেন না। শিশুর মতো বলতেন। আপনার সেই শিশু-শিশু অগোছালো শব্দমালাই বেদবাক্য হয়ে আমাদের বুকে কানে মননে গেঁথে যেত। আমরা উদ্দীপ্ত হতাম। অচেনা অশিক্ষিত গ্রামের সরল মানুষগুলো আপনাকে বিশ্বাস করত, গ্রহণ করত।

আপনাকে ঘিরে অনেক গল্প আমার, আমাদের। কত জেলা গ্রাম ঘুরে বেড়িয়েছি আমরা। কত রাত হোটেল কক্ষে, ভ্রমণপথে, কত গল্প শুনেছি আপনার। আপনি সামান্য অসুস্থ হলেই আমাদের গোটা দলের ঘুম উধাও। আমরা আপনার কক্ষের বাইরে উদ্বেগ নিয়ে জাগতাম ঘণ্টার পর ঘণ্টা। আপনার ধানমন্ডির বাসায় গেছি। ফুলে লতাপাতায় ভাস্কর্যে আপনাকে দেখেছি। বহুদিন মুক্তিযুদ্ধে আপনার স্মৃতি শুনে আমরা চোখের জল ফেলেছি। এই যেমন এখন ফেলছি। এ জল কষ্টের বেদনার মনোতাপের। এ জল শুধুই আপনাকে মনে করে। আপনাকে আমরা ভুলতে পারবো না। ভোলা যায় না। রাষ্ট্র স্বাধীনতা মুক্তিযুদ্ধ; আপনি তো ইতিহাসের পরতে পরতে, অলিন্দে অলিন্দে বহমান।

আপনাকে তো ওরা মেরেই ফেলেছিল একাত্তরে। কী পিশাচ নির্মম মর্মন্তুদ ছিল দিনগুলো। আমরা মনে করতে চাই না। কিন্তু ওরা পারেনি। আপনার অবদম্য সাহস, দেশপ্রেম, স্বজাত্যবোধ, আপনাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। আপনি ব্যক্তি থেকে আমাদের হয়েছেন, সামষ্টিক হয়েছেন। সংসার পরিজন ছাড়িয়ে আপনি ইতিহাস হয়েছেন, সাহসের ইতিহাস। এ রাষ্ট্র, বিশ্বময় সভ্যতা, মুক্তিপাগল মানুষের অদম্য পথচলা যতদিন থাকবে; ততদিন আপনি বেঁচে থাকবেন প্রিয়ভাষিণী।

আপনার কাছে আমাদের ঋণ জন্ম-জন্মান্তরের। আপনি আমাদের সশ্রদ্ধ অর্ঘ্য নেবেন।

লেখক : সাংবাদিক, কবি ও সংস্কৃতিকর্মী।

ফেমাসনিউজ২৪/আরইউ