logo

মঙ্গলবার, ১১ ডিসেম্বর ২০১৮ | ২৭ অগ্রহায়ণ, ১৪২৫

header-ad

নারী তো সর্বময়, সর্বমানুষে

প্রতীক ইজাজ | আপডেট: ০৮ মার্চ ২০১৮

আজ নারী বিশেষ যত্ন পাবে। অফিসে, পরিবারে, আড্ডায়। স্তুতি হবে। আলো ছড়াবে। তর্ক জুড়বে। গান হবে। হুল্লোড় বেধে রেস্টুরেন্টে খাওয়া হবে। খোলা উদ্যানে আঁচল উড়িয়ে ভাসবে নারী। হাঁটবে। ভাববে। মনস্থির হবে। বন্ধু সহকর্মীরা শুভেচ্ছা জানাবে। উপহার দেবে। যার জন্য আকুলি মন, সেও আসবে নিভৃতে, একা। বলবে সবাই— ভালো থেকো!

ভালো থেকো বন্ধুরা। ভালো রেখো। এই ছবি প্রতিদিনকার হোক। দেশে দেশে প্রতি নারীর হোক। ঘর থেকে বাহির, কর্মস্থল আড্ডা, চলতে ফিরতে, বাসে ট্রামে, সবখানে সম্মান শ্রদ্ধা পাক নারীরা। সর্বময় হোক নারীর প্রতি আপত্য ভালোবাসা আমাদের। দেখা কথায় নারীর প্রতি শোভন হোক দৃষ্টি। স্বস্তির হোক পরিবেশ নারীর জন্য।

যে মেয়েটি রোজ ঘর থেকে বের হয় কাজের জন্য; পায়ে হেঁটে, বাসে বা রিকশায় চলে; তার জন্য শুভ হোক যাত্রা। অসংখ্য সর্তক চোখ ওর নিরাপত্তা দিক। নিরুপদ্রুব রাখুক ওকে। রোদে পুড়ে ঘামে ভিজে কর্মক্লান্ত মেয়েটি নিরাপদেই ঘরে ফিরুক। ওই ঘরে ও শান্তি পাক। স্বামী ভাই স্বজনরা ওকে আদর দিক। ভালোবাসায় নিক।

একবার সোনারগাঁ লোকশিল্প জাদুঘরে গিয়েছিলাম। কারুশিল্প মেলা ছিল। মুন্সিগঞ্জ থেকে শীতল পাটি এনেছিলেন সাবিত্রী। কী নিখুঁত নকশা রঙ বুনন। আমি মুগ্ধ হয়েছিলাম। সাবিত্রীকে বলেছিলাম, খুব ভালো হয়েছে। মেয়েটি লজ্জা পেয়েছিল। ওর ওই লজ্জামুখ আমার এখনো চোখে ভাসে। আমি সাবিত্রীকে শ্রদ্ধা করি। সাবিত্রী নিছক নারী নন; সাবিত্রী শিল্পী, একজন কর্মক্ষম মানুষ।

আমি উৎসব ভালোবাসি। এই যে নারী দিবস, রঙ, হাসি, উচ্ছ্বলতা, দল বেধে প্রিয় সহকর্মীদের হুল্লোড়, বন্ধুদের আড্ডা; আমার সব ভালো লাগে। ভালো লাগে উচ্ছ্বলতা, প্রাণখোলা হাসি। দিন শেষে একটাই চাওয়া— এই উৎসব ব্যক্তি থেকে সামস্টিকে যাক; সর্বজনীন হোক; রাষ্ট্র থেকে কর্পোরেট, মূলধারার উৎসবে রূপ নিক।

নারীর অগ্রযাত্রায় স্বস্তি আছে। রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ কূটনীতি— সব জায়গায় এখন নারীর পদচারণা। স্পস্ট উচ্চারণ। দমন বা অবদমন; এখন ঠিক নারীর ক্ষেত্রে আলাদা করে ভাবার সুযোগ নেই। যোগ্য সম্মান না পেলে, কর্ম পরিবেশ বা ব্যক্তির আচরণ শোভন না হলে, মুখের ওপর ‘না’ বলার মত সাহস এখন নারীদের সহজাত। যুক্তি তর্ক দর্শন— পিছিয়ে নেই নারীরা।

আমি আমার মেজ আপাকে দেখেছি— কী দক্ষতার সঙ্গে সামাল দিতে সংসার। বাংলাদেশ ব্যাংকের বড় কর্মকর্তা। শ্বশুর বাড়ি রাজি না চাকরিতে। তাই অফিস যাওয়ার আগে ওদের জন্য রান্না করে যেতে হোত আপাকে। সন্ধ্যায় এসে রাতের রান্না করতো। নিজে পড়ালেখা করতো। বাচ্চাদের পড়াতো। অফিস শেষে প্রায়ই আমাদের বাড়ি আসতো। মার কোলে মাথা রেখে কাঁদতো। বাবা বলতো— তোমাকে হারলে চলবে না। সাহস রাখো। জিততে হবে।

আপা জিতেছে। একটা সময় পর ওই শ্বশুর বাড়িতেই তার জয় জয়কার। যে শাশুড়ি মুখ কালো করে বলতো— দেখতো তোর ভাবী কী করে? সেই শাশুড়িকেই একদিন বলতে শুনেছি— বৌ মা, খেয়েছো? কিছু লাগবে? আপা একটা গল্প হয়েছে। গল্পটা এক নারীর শ্রম মেধা ঘামের। কিন্তু সবার। সর্বজনের। কেননা নারী যখন মানুষ, তখন তো সর্বজনই সে, সর্বরূপের, সর্বময়।

আবার অস্বস্তিও কম না। দিবসের মাতামাতি আড়াল করতে চায় নারীর অস্বস্তিকর নানা প্রশ্ন। সরিয়ে রাখতে চায় নারীকে মূলধারা থেকে। সামাজিক-অর্থনৈতিক অধিকারের মুল যে প্রশ্ন, সুচতুরভাবে সেখান থেকে অদৃশ্য করতে চায় নারীকে। ভিন্ন কৌশল নেয়। ভুলিয়ে রাখা হয় মুল থেকে। ফলে নারীদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বঞ্চনা, ঘরে ও বাইরে নিপীড়ন এখনো কমেনি।

আইন যা-ই বলুক, আজও নারী-পুরুষ সমান কাজে সমান মজুরি পায় না। সম্পত্তির ভাগ থেকে এখনো নারীরা বঞ্চিত। পণ, গার্হস্থ্য নির্যাতন, ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতন কোনো কিছুই চোখে পড়ার মতো কমেনি। দেশ স্বাধীনের শুরুর দিকটায় যে বিষয়গুলো নারীর জন্য প্রাসঙ্গিক ছিল, সেগুলো এখনো প্রাসঙ্গিক, প্রয়োজনীয়।

অসত্যের ঘোর কাটাতে হবে নারীকে। মিথ্যের বেসাতির সওয়ার হওয়া যাবে না। প্রলোভন প্রবঞ্চনায় পড়া যাবে না। সৎ পথে সাহস রাখতে হবে। শক্তি রাখতে হবে। নারীর অধিকারের যে সংযোগ, নারীর প্রতিবাদ-প্রতিরোধের যে সংযোগ, সর্বোপরি নারীবাদের যে সংযোগ, সেখানে অটল থাকতে হবে। মুল হবে মেধা শ্রম সৃজনশীলতা।

মনে রাখতে হবে, নারীবাদ মানে নারীর সঙ্গে পুরুষের যুদ্ধ নয়; ক্ষমতাবানের সঙ্গে ক্ষমতাহীন, প্রাতিষ্ঠানিক অচলায়তনের বিরুদ্ধে মুক্ত চিন্তার লড়াই। নারীবাদ ক্ষমতার সোপানতন্ত্র ভাঙতে চায়। পুরুষে-নারীতে সাম্য আনতে চায় নারীবাদ। নারীবাদ মানুষ দেখে; আটপৌরে নারী নয়।

নারীর এই ক্ষমতা ও সমতার ভিত্তি হতে পারে নানা পরিচয়ে: লিঙ্গ, শ্রেণি, ধর্ম, জাতপাত, বর্ণ, যৌনতা, প্রতিবন্ধকতা, নানা নামে; মূল ভাবনা কিন্তু একটাই— বাঁধনমুক্ত। এমনকি নারীবাদ পুরুষকেও পিতৃতন্ত্রের বাঁধন থেকে মুক্তি দিতে চায়। সমাজ-নির্মিত পৌরুষের প্রাচীণ ধারণার বিরুদ্ধে সরব নারীরা। পিতৃ বা মাতৃতন্ত্র নয়; এসব প্রাচীন ধ্যাণধারণা, প্রথা ও তন্ত্রবিরোধী মানুষের উৎসব নারী দিবস। নারী তো সর্বময়, সর্বমানুষে।

সেই সর্বময় সর্বশ্রেণির সব নারীর প্রতি আমার শ্রদ্ধা। ভালোবাসা।

লেখক : সাংবাদিক, কবি ও সংস্কৃতিকর্মী।

ফেমাসনিউজ২৪/আরইউ