logo

বুধবার, ২৩ মে ২০১৮ | ৯ জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৫

header-ad

কোটা সংস্কার আন্দোলন এবং শিহাবের স্ট্যাটাস

শামীমুল হক | আপডেট: ২৩ মার্চ ২০১৮

আমার পাশের ফ্ল্যাটে বসবাস করেন সিদ্দিকী পরিবার। আব্দুল হাই সিদ্দিকী। তার দুই পুত্র। দুজনই সরকারি চাকরি করেন। একজন ব্যাংকার। অন্যজন পুলিশ ক্যাডারে। প্রায় পাঁচ বছর ধরে একসঙ্গে বসবাস করছি পাশাপাশি ফ্ল্যাটে। আব্দুল হাই সাহেবও চাকরি করেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। পাঁচ বছর আগে যেদিন প্রথম বাসায় উঠেন সেদিন দরজায় একটি নেমপ্লেট দেখি। সেখানে লেখা ....সিদ্দিকী। সহকারী সচিব, আইন মন্ত্রণালয়। ভালোই লাগলো।

খোঁজ নিয়ে জানলাম সিদ্দিকী সাহেবের ছোট ছেলের নেমপ্লেট এটি। বছর খানেক যেতে না যেতেই দেখি নেমপ্লেট নেই। কি ব্যাপার। জানতে পারলাম সিদ্দিকী সাহেবের ছোট ছেলে মন্ত্রণালয়ের চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন। তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকে চাকরি নিয়েছেন। এভাবে আরও কিছুদিন গেল।

হঠাৎ একদিন সিদ্দিকী সাহেব আমার বাসায় এলেন। সঙ্গে তার ছোট ছেলে। মিষ্টি নিয়ে এলেন। জানালেন, তার পুত্র বিসিএস দিয়ে পুলিশ ক্যাডারে সুযোগ পেয়েছে। ক'দিনের মধ্যেই সারদায় ট্রেনিংয়ে যাবেন। স্বাগতম ও শুভেচ্ছা জানালাম পিতা এবং পুত্রকে। বিদায় দিয়ে ভাবতে লাগলাম কি মেধাবী তার সন্তানরা! তারা আরও এগিয়ে যাক।

কিন্তু ক'দিন পরই আমার ভুল ভাঙলো। সিদ্দিকী সাহেব আবার এলেন। এবার জানালেন তিনি মুক্তিযোদ্ধা। আর মুক্তিযোদ্ধা কোটায় তার ছেলে ক্যাডারে সুযোগ পেয়েছে। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয় থেকে ছাড়পত্র না দিলে সংস্থাপন মন্ত্রণালয় পরিপত্র জারি করছে না। এ ব্যাপারে পরামর্শ ও সহযোগিতা চাইলেন।

তাকে বিদায় দিয়ে বুঝলাম একের পর এক চাকরি ছাড়া এবং চাকরি পাওয়ার মহাত্ম। কোটায় চাকরি সহজে মিলে। তাই ইচ্ছে হলেই ছেড়েও দিতে পারে। অন্যদিকে হাজারো মেধাবী বেকারের যন্ত্রণা নিয়ে ধুকে ধুকে মরছেন। কোনো চাকরি পাচ্ছেন না। এইতে ক'দিন আগে সারাদেশে পুলিশের কনস্টেবল নিয়োগ করা হয়েছে। আমার জানা মতে, ছয়টি সংসদীয় আসন নিয়ে একটি জেলায় ১৬০ জন কনস্টেবল নেয়া হয়েছে।

এর মধ্যে একটি আসন এরিয়া থেকে নেয়া হয়েছে মাত্র চারজন। কারণ এ আসনের এমপি জাতীয় পার্টির। তার প্রভাব কম। আর প্রভাবশালী একটি আসনের এমপির প্রভাবে সেখান থেকে নেয়া হয়েছে ৬৬ জন। ওই আসনের এমপি আবার মন্ত্রীও। ফলে আসনওয়ারী ভাগেও কুপ দিচ্ছেন প্রভাবশালী এমপি, মন্ত্রীরা।

মেধাবীরা এখানেও পিছিয়ে পড়ছেন চাকরি থেকে। প্রভাবশালী এমপি কিংবা মন্ত্রীর সঙ্গে যারা যোগাযোগ করতে পারছেন তারা চাকরি ভাগিয়ে নিতে পারছেন। অন্যরা ব্যর্থতার গ্লানিতে নিজেকে নিংশেষ করে দিচ্ছেন। যন্ত্রণার আগুনে দগ্ধ হচ্ছেন। উন্মুক্ত প্রথায় চাকরি হলে এমনটা হয়তো হতো না। শুক্রবার ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র শিহাব। তার স্ট্যাটাসে কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে জীবনের বাস্তবতার বিষয়টি এমনভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন তিনি যা পড়ে গা শিহরে ওঠে।

শিহাব লিখেছেন- “২০১৩ সাল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক ছাত্র কোটা সংস্কার আন্দোলনে নামে। শাহবাগে মানববন্ধন করে। তাদেরকে শায়েস্তা করার জন্য হল থেকে আমাদের পাঠানো হয়। আমরা একঝাঁক টগবগে তরুণ শায়েস্তা করতে যাই। সঙ্গে অন্য হলের অনেক ছেলে। আমাদের দেখে আন্দোলনকারীরা ভয় পেয়ে যায়। অনেকে দৌড়ে কিংবা নীরবে রাস্তা ছাড়ে। কয়েকজনকে ধরে আমাদের কেউ কেউ পিটুনি দেয়। আমাদের সাথেই ছিল ধ্রুব (ছদ্মনাম)।

আমাদের হলের এক বড় ভাই আন্দোলনে যোগ দেন। তাসনিম ভাই। তাকে দেখেও আমরা কয়েকজন না দেখার ভান করি। হঠাৎ লক্ষ্য করলাম, তাসনিম ভাইয়ের কলার ধরে আছে ধ্রুব। ঠাস, করে তাসনিম ভাইয়ের গালে চড় মেরে বসল ধ্রুব। সঙ্গে গালি। আমাদের চোখ ছানাবড়া। ধ্রুব তখন খুবই তেজি। নিজেকে সবখানে শো' করতে চায়। নিজেকে নিবেদিত প্রমাণ করতে মরিয়া।

তার এমন কান্ডে থ বনে গেলাম। বললাম, এ কী করলি তুই? উনি তো আমাদের হলের বড় ভাই। ভদ্র মানুষ। অনেকদিন থেকে চিনি। তার গালে তুই চড় দিলি? ধ্রুব গালি দিয়ে বলে ওঠে, শালা শিবির করে। তা না হলে কি এই আন্দোলনে আসে? কোটা সংস্কার চায়? তাসনিম ভাইয়ের দিকে তখন তাকাতে পারিনি লজ্জায়। দেখলাম, মাথা নিচু করে চোখ ডলতে ডলতে হলের দিকে ফিরছেন।

এরপর হলে আমার মুখোমুখি হলে তিনি পথ এড়িয়ে যেতেন। লজ্জা পেতেন। হুট করে একদিন দোকানের সামনে দেখা। চুপচাপ মানুষটি আমাকে না দেখার ভান করলেন। আমি পাশে গিয়ে বললাম, ভাই। বললেন, ও তুমি? কেমন আছ? বললাম, ভাই রাগ করবেন না। ধ্রুব কাজটা ঠিক করেনি। এ কথা শুনেই তিনি আনমনে হয়ে গেলেন।

আমাকে ডেকে দোকানের পেছনে নিয়ে গেলেন। মুহূর্তে তার চোখ লাল হয়ে উঠল। চোখের পানি সংবরনের ব্যর্থ চেষ্টা করতে লাগলেন। টলমল করে উঠেছে চোখের জল। ফোটা হয়ে গড়িয়ে নিচে পড়ার আগেই দুই হাতের তালু দিয়ে চোখ মুছে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করলেন। আমি তখন নির্বাক।

ভাই শুধু বললেন, ছোট ভাইয়ের হাতে চড় খাওয়ার মতো লজ্জা পৃথিবীতে নেই। তার প্রতি আমার কোনো ক্ষোভ নেই, কষ্ট নেই। আমি যে আন্দোলনে কেন গিয়েছিলাম তা তোমরা এখন বুঝবে না। তবে একসময় বুঝবে। ধ্রুবও বুঝবে। তোমরা সবাই বুঝবে। ভাইয়ের কষ্টমাখা হৃদয় নিংড়ানো কথাগুলো আমাকে চিন্তায় ফেলে দেয়। কিছুদিন পর ভাই হল ছাড়েন......।

এখন ২০১৮ সাল। কেটে গেছে চার বছর। সেই ধ্রুব এখনো হলে থাকে। দেশব্যাপী কোটা সংস্কারের আন্দোলন চলছে। সেই ধ্রুবই এখন আন্দোলনে সামনের কাতারে থাকে। দীর্ঘদিন পেরিয়ে গেলেও তার চাকরি হয়নি। গত রাতে ছাদে গিয়ে দেখি, ধ্রুব একাকী চুপচাপ বসে আছে। চেহারায় দুশ্চিন্তার গভীর ছাপ। মনের আকাশে কালো মেঘ স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। আমাকে দেখে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করল।

মনমরা হয়ে থাকার কারণ জিজ্ঞেস করার পর বুকের ভেতরের সব ব্যথা উগরে দিতে থাকল। এক পর্যায়ে বলল, ২০১৩ সালের কথা তোর মনে আছে? তাসনিম ভাইয়ের কথা মনে আছে? আমি তাকে মেরেছিলাম তা মনে আছে? কোটা সংস্কার আন্দোলনের আমার একটা ছবি গতকাল পত্রিকার পাতায় এসেছে। আমি আন্দোলনের সামনের কাতারে। সেই তাসনিম ভাই ছবিটা দেখে আমাকে চিনতে পেরেছেন।

ফেসবুকে খুঁজে ইনবক্সে আজ আমাকে নক করেছেন। লিখেছেন, ছোট ভাই, ধ্রুব। আমি তাসনিম। নন ক্যাডারে জয়েন করেছি। পত্রিকায় তোমার আন্দোলনের ছবি দেখে অবাক হয়েছি। তবে খুশি হয়েছি। তোমাদের জন্য শুভ কামনা। তোমাদের হয়তো অনেকে শিবির বলবে। তবে তোমরা শিবির না- তা আমরা জানি। তোমরা এগিয়ে যাও। শুভকামনা রইলো। ভালোবাসা নিও। এ কথা বললে বলতে ধ্রুব'র চোখ দেখি ভিজে এসেছে। চোখ লাল হয়ে উঠেছে।

টলমলে অশ্রু গড়িয়ে পড়ার আগেই দেখলাম, দুই হাত দিয়ে মুছে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করছে। চার বছর আগে তাসনিম ভাই যেমন করেছিলেন ঠিক তেমন......। ধ্রুব হাহাকার করে বলল, আমার অভিশাপ লেগেছে রে, অভিশাপ লেগেছে....। তাসনিম ভাইয়ের অভিশাপ লেগেছে.......। আমাকেও এখন অনেকে শিবির বলে অভিযোগ দেয়.....।

শিহাবের এ লেখা পড়ে মনটা খারাপ হয়ে গেল। দেশের হাজার হাজার বেকার যুবকের হাহাকার যেন কান ভারি করে তুলছে। ঘরে ঘরে বেকার যুবকদের আকুতি বাতাসে মিলিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে সিদ্দিকী সাহেবের সন্তানরা একের পর এক চাকরি ধরে আর ছাড়ে। কারণ তাদের হাতের মুঠোয় আছে ‘কোটা’।''
ফেমাসনিউজ২৪/এফএম/এমএম