logo

শনিবার, ২১ এপ্রিল ২০১৮ | ৮ বৈশাখ, ১৪২৫

header-ad

  যুব সম্পদ ও মাদকাসক্তি

আলী ইদ্রিস | আপডেট: ০৬ এপ্রিল ২০১৮

মাদকের দুর্বার নেশা, মাদকদ্রব্যের ব্যবসা করে রাতারাতি বিত্তবান হওয়ার দুর্দমনীয় লোভ ও নেশার ছোবলে হিতাহিত জ্ঞান হারানো যুবসমাজ তথা মধ্যবয়সী নারী-পুরুষ এখন সমাজকে ধ্বংস করছে। মানবতা, মানবিকতাকে পায়ে দলে নেশাখোররা জঘন্য অন্যায়, অবিচার ঘটিয়ে সমাজকে অন্ধকারে নিমজ্জিত করছে।

নারায়নগঞ্জের একটি মর্মান্তিক ঘটনা প্রমাণ করে নেশাসক্ত মানুষরা কত হৃদয়হীন, দয়ামায়াহীন অমানুষ। মাদকাসক্ত এবং মাদক ব্যবসায়ী উঠতি বয়সের এক বাবা নিজের স্ত্রীকে নির্যাতন করার পর শ্বাসরোধ করে হত্যা করে দেড় বছর বয়সী নিজের ঔরসজাত বাচ্চাকে লাশের পাশে ফেলে দরজা তালাবদ্ধ করে চলে যায়।

তিনদিন তিন রাত বাচ্চাটি মৃত মায়ের আঙ্গুল চুষে অলৌকিকভাবে বেঁচে ছিল, তৃতীয় দিনে বাচ্চাটির অবিরাম কান্না শুনে প্রতিবেশীরা দরজার তালা ভেঙে শিশুটিকে উদ্ধার করে এবং পুলিশকে খবর দেয়। পুলিশ এসে দুর্গন্ধময় লাশ মর্গে পাঠায় ( মানবজমিন ২৯ মর্চ, ২০১৮)।

ঝিকরগাছায় মাদকাসক্ত ছেলে (৩৫) নেশার টাকা দিতে অস্বীকার করায় বয়োবৃদ্ধ (৭০) বাবাকে কুপিয়ে হত্যা করেছে (মানবজমিন ৩০ মার্চ, ২০১৮)। এরকম মর্মান্তিক ঘটনা প্রায় প্রতিদিন খবরের কাগজে ছাপা হয়ে থাকে। কখনও মাকে, কখনও ভাইকে, কখনও বোনকে নেশাখোর হত্যা করে পরিবারকে আর্থিক ও মানসিকভাবে ধ্বংস করে দেয়। নেশার অর্থ যোগাড় করতে গিয়ে পরিবারের বাইরেও এরা চুরি, ছিনতাই, পকেট মারা এমনকি খুন করতেও দ্বিধা করে না।

দেশের প্রায় ৭০ লাখ যুবক-যুবতী মাদকাসক্ত। জাতিসংঘের এক জরিপ অনুযায়ী, ২০০৯ সালে বাংলাদেশে মোট মাকদাসক্তের সংখ্যা ছিল ৬৫ লাখ, তন্মধ্যে দেড় লাখ নারী ছিল যাদের অধিকাংশই যুবতী। বর্তমানে মাদকাসক্তের সংখ্যা প্রায় ৭০ লাখ, তন্মধ্যে প্রায় ৮০% পুরুষ এবং ২০% নারী।

এদের বয়স ১৮ বছর থেকে ৩০ বছর। প্রায় ৬৫% মাদকাসক্ত অবিবাহিত এবং ৫৬% বেকার অথবা শিক্ষার্থী। এরা প্রতিদিন মাদকদ্রব্য কিনতে প্রায় ৭০ কোটি টাকা ব্যয় করে। সে হিসাবে বছরে দেশে প্রায় ২৫,৫০০ কোটি টাকা সর্বনাশা মাদক বা নেশাদ্রব্য ক্রয়ে ব্যয় হয়। মাদকাসক্তির চিত্রটি বিভিন্ন দৃষ্টিকোন থেকে পর্যবেক্ষণ করলে একটি ভয়াবহ অবস্থা দৃষ্টিগোচর হয়।

সংবাদপত্রের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে গত পাঁচ বছরে ইয়াবার ব্যবহার বেড়েছে ৭ গুণ এবং আটকের পরিমাণ বেড়েছে ৫০ গুণ। মাদসাক্তদের একটি বড় অংশ এখন ইয়াবা সেবনে অভ্যস্ত। ২০১০ সালে দেশে বছরে চার কোটি ইয়াবা চোরাই পথে আসতো। এখন বছরে আসে ২৮ কোটি।

২০০৯ সালে ইয়াবা আটকের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ২৯ হাজার, আটকের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬৫ লাখ ১২ হাজার। মাদকদ্রব্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইয়াবার পাশাপাশি মারজুয়ানা, হিরোইনের ব্যবহারও বেড়েছে। যে পরিমাণ ইয়াবা ধরা পড়ে তার চেয়ে ৪২ গুণ মাদক ক্রেতা/নেশাখোরদের হাতে পৌঁছে যায়।

২০০৮ সাল থেকে তুলনামূলকভাবে এখন পর্যন্ত ৭৭ গুণ অধিক ইয়াবা আটক করা হয়েছে। একটি ইয়াবার খুচরা গড় মূল্য ৩০০ টাকা ধরলে প্রায় ৮,২০০ কোটি টাকার ইয়াবা নেশাখোরদের নেশা মেটাতে খরচ হয়। তবে অভিযানের সময় বা দুষ্প্রাপ্যতার সময় ঢাকা শহরে ইয়াবার দাম ১,০০০ টাকাও ওঠে।

যুবসমাজ বাংলাদেশের একটি শক্তি ও সম্পদ। দেশের অভ্যন্তরে যেমন তারা শ্রমশক্তি হিসেবে কাজ করে, দেশের বাইরেও তেমনি দক্ষ ও অদক্ষ শ্রম বিক্রি করে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে সহায়তা করে। বর্তমানে প্রবাসীরা প্রায় ১,৩০,০০০ কোটি টাকা প্রতিবছর দেশে পাঠায়।

এই জনশক্তি তথা যুবশক্তি দেশের সবচে’ বড় রপ্তানিযোগ্য সম্পদ। ১৬ বছর পর হয়তো দেশের গ্যাস রিজার্ভ ফুরিয়ে যাবে। গ্যাস রিজার্ভ ফুরালে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমবে, শিল্প-কারখানা, যানবাহন, ঘরের চুলা, সবখানে খরচ বাড়বে। তৈরি পোশাকসহ অনেক পণ্যের রপ্তানি হয়তো কমবে, কিন্তু জনশক্তি রপ্তানি কখনও হ্রাস পাবে বলে মনে হয় না।

কারণ, পাশ্চাত্যসহ প্রাচ্যের কিছু কিছু দেশেও জন্মহার কম থাকায় কর্মক্ষম যুবক-যুবতীর সংখ্যা যথেষ্ট বাড়ছে না। অন্যদিকে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে শিল্প-কারখানায়, ব্যবসায়ে, কৃষিকাজে, গৃহকর্মে কর্মক্ষম জনশক্তির ঘাটতি পূরণ করতে সেসব দেশকে বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশ থেকে জনবল আমদানি করতেই হবে।

সুতরাং এ দেশের জনশক্তি রপ্তানি বাড়বে বই কমবে না। সৌদি আরব, মালয়েশিয়া এরই মধ্যে যেভাবে ডিমান্ড জানাচ্ছে তাতে শিগগিরই আরও জনশক্তি রপ্তানির উজ্জ্বল সম্ভাবনা দেখা যায়। বাংলাদেশ এখন ইয়াবার অন্যতম বৃহৎ বাজার। পাশের দেশ মিয়ানমার থেকেই অধিকাংশ ইয়াবা চোরাই পথে এ দেশে প্রবেশ করে।

উঠতি বয়সের তরুণরা এখন গাঁজা, ফেনসিডিল, চরস, হিরোইনের চেয়ে ইয়াবাকেই বেশি পছন্দ করে। যুবসমাজের এ অবক্ষয় ও অর্থের অপচয় পরিবারের জন্য, সমাজের জন্য এবং দেশের অর্থনীতির ঘাড়ে বোঝাস্বরূপ জেঁকে বসেছে। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে নেশা ছড়িয়ে পড়েছে।

কেউ জীবনের প্রতি বিতশ্রদ্ধ হয়ে, কেউ সখের বশে, কেউ বা সঙ্গদোষে বাধ্য হয়ে, কেউ নতুনত্ব পেতে নেশাকে বেছে নিয়েছে। শুধু রাস্তার বেকার, ভবঘুরে, চোর-চামার, ছিনতাইকারী বা টোকাই নয়, এখন রিকশাওয়ালা, ফেরিওয়ালা, গাড়িচালক, সিএনজিচালক, ট্রাকচালক, দিনমজুর অনেক পেশার লোকেরা নেশার ছোবলে আক্রান্ত।

এদিকে ছাত্রসমাজও বসে নেই। স্কুল থেকে শুরু করে কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা নেশায় অভ্যস্ত হয়ে লেখাপড়া গোল্লায় পাঠাচ্ছে। সবচে' বড় দুঃসংবাদ হলো- যারা নেশাখোর ও মাদক ব্যবসায়ীদের গ্রেপ্তার করবে তাদের কেউ কেউ নিজেরাই মাদক পাচারকারী এবং নেশাগ্রস্ত।

নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানার এএসআই সোহরাওয়ার্দী আলম রুবেলের বাসা থেকে ৪৯ হাজার পিস ইয়াবা ও নগদ ৫ লাখ টাকা উদ্ধার করে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ হওয়ার সুবাদে তিনি চোরাচালানিদের কাছ থেকে উদ্ধারকৃত ইয়াবার ভাগ পেতেন এবং তা খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করে দিতেন (দৈ: মানবজমিন ৩ মার্চ, ২০১৮)।

বাংলাদেশ রেলওয়ের চট্টগ্রাম পরিবহন বিভাগের প্রধান বখতিয়ার হোসেন উচ্চ পর্যয়ের কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে ইয়াবার সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন। তিনি নিজেও নেশাখোর, ব্যবসার আধিপত্য বিস্তারে মারামারিতে হাত ভেঙে হাসপাতালে বসেও তিনি ইয়াবা ব্যবসা চালাচ্ছিলেন, অবশেষে ধরা পড়েন ( দৈঃ মাঃ জঃ ৩ এপ্রিল,২০১৮)।

সংবাদপত্রের খবরে উচ্চ পর্যায়ের কোনো কোনো জনপ্রতিনিধিকে মাদক ব্যবসায় জড়িত বলে শুনেছি। পান সিগারেটের মতো আজকাল গাঁজা সেবন নাকি অনেক ভদ্রলোকের এবং ভদ্র পরিবারের ছেলেমেয়েদের ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে।

মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর প্রায়ই বর্ষপূর্তির দিনে নেশাখোর, মাদক ব্যসায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করবে বলে জনগণকে আশ্বস্ত করে। পুলিশ ও র‌্যাব বাহিনীও বিভিন্ন সময়ে তালিকাভুক্ত মাদক চোরাচালানিদের গ্রেপ্তার করবেন বলে ঘোষনা দেন।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত ফলাফল খুব দৃশ্যমান ও আশাব্যঞ্জক বলে মনে হয় না। মাদক গ্রহণ, মাদক চোরাচালান, পরিবহন ও বিক্রয় যে গতিতে চলে নির্মূল ও নিয়ন্ত্রণ অভিযান সে গতিতে এগোয় না। ফলে নেশাখোরদের সংখ্যা ও নেশা গ্রহণের পরিমাণ দিন দিন বেড়েই চলছে।

অল্প পুঁজিতে বহুগুণ মুনাফা অর্জনের এই ব্যবসা যত ধ্বংসাত্মকই হোক কেউ ছাড়তে রাজি নয়। তাই রাজনৈতিক সদিচ্ছাসহ রাষ্ট্রীয় কঠোর নীতি অবলম্বন এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সর্বশক্তি নিয়োগ নিশ্চিত করা সরকারের অবশ্য করণীয়। ভবিষ্যতের শক্তি ও সম্পদ যুবশক্তিকে রক্ষা করতে হলে দোষীদের ওপর আইনের প্রয়োগ ও বিলম্বহীন শাস্তি নিশ্চিত করাই মাদক নির্মূল করার একমাত্র উপায় বলে মনে হয়।
ফেমাসনিউজ২৪/এফএম/এমএম