logo

মঙ্গলবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮ | ১০ আশ্বিন, ১৪২৫

header-ad

মালালা প্রশ্ন করুক, শিশু হত্যার বিক্ষোভে কেন কাঁদেনা বসুন্ধরা?

হেলাল মহিউদ্দীন | আপডেট: ০৭ এপ্রিল ২০১৮

বালিয়াড়িতে উপুড় মৃত শিশু আয়নাল কুর্দির আলোকচিত্রটি এখনো আমাদের স্মৃতিতে জ্বলজ্বল করছে, তাই না? ছবিটির সীমাহীন ফটো-ভ্যাল্যু, ক্যামেরা-ভ্যাল্যু ছিল। তাই আয়নালকে ভুলে গেলেও ফটোগ্রাফিটি আমরা ভুলব না।

‘বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি’ স্লোগান আঁকা পোস্টারগুলোর মোক্ষম মৃত মডেল হয়েছিল আয়নাল। এনজিওরাও পোসটারে বা রিপোর্টের কভারে আয়নালকে রেখে ফান্ড ডোনেশন পেয়েছে।

তার ছবির মডেল মূল্যমান বাড়ানোর জন্য একটি গল্পও জুড়ে দেয়া হয়েছিল। ক্যামেরার সমান ফোকাসছিল আয়নালের মাথার কাছে পড়ে থাকা একটি পুতুলের উপর। এটি ‘আয়নালের পুতুল’—ছবির গায়ে এমন গল্পও সেঁটে দেয়া হল। জুড়ে দেয়া গল্প ছবিটিতে একটি হৃদয়গ্রাহী ও উপভোগ্য মাত্রা এনে দিল।

চিন্তাশীল ব্যক্তি মাত্রই বুঝার কথা সাগরের ঢেউয়ের দায়িত্ব নয় আয়নালের পুতুলকেও তার মাথার কাছে পৌঁছে দেয়া।

অনেকেই বুঝতে পারেননি মৃত শিশুর গ্ল্যামারেরও বাজারমুল্য আছে! নির্মমতম সত্যটি হচ্ছে এই মৃত আয়নালই আদুরে জামা-জুতায় উপুড়ভঙ্গি না থেকে রোহিংগা শিশুর মত ময়লা পোশাকে পঁচাগলা শরীরে চিৎ হয়ে থাকলে মিডিয়া, সোস্যাল মিডিয়া, ক্যামেরা কোনো মাধ্যমেই বিশেষ পাত্তা পেত না। এমনই এক নষ্ট-ক্লিষ্ট সময়ে আমাদের বাস যখন মৃতেরও গ্ল্যামার থাকতে হয়, ক্যামেরা ভ্যাল্যু থাকতে হয়। ধিক! স্বীকার করতে দ্বিধা নেই এই লেখা লিখতে গিয়ে আমাকে কাঁদতে হচ্ছে। হাত-পা অবশ হয়ে আসছে। এলোমেলো আঙ্গুল পড়ছে ভুল কী-বোর্ডে।

দুঃখবোধটি এ’কারণে যে, আপাতজীবিত আসলে মৃত আরেকটি গ্ল্যামারগার্লও বুঝতে পারছে না সে খুনিদের হাতের পুতুল হয়ে মডেলিং করছে। মডেল সেই শিশুটি গুলিবিদ্ধ হলে তার বেঁচে থাকার জন্য আমরা প্রার্থনারত হয়েছিলাম। সে এখন তরুণী। নাম মালালা ইউসুফজাই। ইউনিসেফের দূত।

বিশ্বের শিশু অধিকার নিয়ে কথা বলার দায়িত্বপ্রাপ্ত। তাকে নিয়ে গান, গল্প, কবিতা, সিনেমা, ফটোগ্রাফি, ডকুমেন্টারি, পিএইচডি; তার নিজের আত্মজীবনী, নোবেল পুরস্কার অর্জন, বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রত্বপ্রাপ্তি কোনোটিই আর বাকি নেই।

মালালা বোকো হারামের স্কুলছাত্রী অপহরণের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকে, ফিমেল জেনিট্যাল মিউটিলেশন বন্ধের জন্য কাজ করে— আমরাও এসব কাজে তাকে সমর্থন দিই, দিচ্ছি এবং দেব। কিন্তু নির্বিচার শিশুহত্যার যে বীভৎস মচ্ছব তার প্রতিবাদে কেন তার কোনো দায়-দায়িত্ব নাই— এই প্রশ্নটি ছুঁড়ে দিতে আমাদের আর দেরি করার ফুরসত নেই।

মার্কিন যুদ্ধবিমানের গোলার আঘাতে বিদ্যালয়ের শ’খানেক শিশু হত্যার মত যুদ্ধাপরাধ তো পৃথিবীর ইতিহাসে আর কোথাও নেই। দুইটি বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস তন্নতন্ন করে ঘেঁটেও এমন নজির মিলবে না।

সারা দুনিয়ার আমি আপনি আপনারা ফেসবুক-ট্যুইটার সামাজিক মাধ্যমে সারাদিন-রাতভর লিখে যা কিছু করতে পারি তার হাজার ভাগের একভাগ চেষটায় তরুণী মালালা বিশ্বকে জানিয়ে দিতে পারে এবারই প্রথম নয়, ২০০৬ হতে এই পর্যন্ত আফগানিস্তানেই প্রায় চার হাজার শিশুকে হত্যা করা হয়েছে।

দ্যা ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম-দেখিয়েছে একই রকম হামলায় ২০০৬ সালেও একটি স্কুলে ৬৯টি এবং ২০১৫ সালে কুন্দুজে হাসঅপাতালে ৪৯টি শিশুকে হত্যা করা হয়। ২০১১ সালে ক্রিস ঊডের লেখায় ওঠে আসে সাত বছরে বিভিন্ন সময়ে ১৬৮টি শিশুকে সিআইএ’র দ্রোণ হামলার মাধ্যমে হত্যা করা হয়।

এদের বেশির ভাগই ছিল ২০১৭ সালে ৯২৩টি শিশুকে হত্যা, এবং ২৫৮৯টি শিশুকে গুরুতর আহত করার ঘটনা ঘটে। নিহত-আহতের সংখ্যাগুলো ছিল আগের বছরের তুলনায় যথাক্রমে ২৫% এবং ২৩% বেশি। ২০০৯ হতে ২০১২র মধ্যে আহত-নিহতের সংখ্যা ১১৪১৮।

এই নৃশংস শিশু হত্যাকাণ্ডের পর কেউ কেউ বলছেন ঘটনাটি ঘটার আগে তালেবানের হামলায় যে শতাধিক সাধারণ নাগরিকের হত্যাকাণ্ড ঘটেছে সে’টিও বিবেচনায় নিতে হবে এবং দু’টিরই প্রতিবাদ করতে হবে। প্রতিবাদ দু’টি ঘটনারই হচ্ছে।

তবে ভিন দেশের বিমানের নির্বিচার বোমাবর্ষণে অন্যের দেশে এরকম নৃশংস শিশু হত্যার প্রতিবাদটি করতে হলে তালেবানদের হত্যার প্রসংগটিও আনতে হবে— এই ন্যারেটিভ বিভ্রান্ত, অবিবেচনাপ্রসূত এবং বিপজ্জনক। কারণ তালেবানের নৃশংশতা শিশু হত্যার জাস্টিফিকেশন হতে পারে না। বরং এমনতর চিন্তাপ্রচ্ছন্নভাবে এই বোধই তৈরি করে যে, তালেবান দ্বারা সিভিলিয়ানদের হত্যা করার কারণে এই শিশু হত্যা হয়েছে।

তালেবানের কাজটি নৃশংস। এমন দুষ্কর্ম তারা নিত্যই করছে।তার প্রতিক্রিয়ায় ঘৃণা-প্রতিবাদও কোথাও থেমে নেই। তালেবান ক্রিমিন্যালফোর্স।তাদের আন্তর্জাতিক যুদ্ধনিয়ম মেনে আচরণ করার বালাই নেই, ম্যান্ডেট নেই, আন্ডারটেকিং নেই। কিন্তু মার্কিনপক্ষ, ন্যাটো পক্ষসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে জাতিসঙ্ঘের বিধিবিধানসহ আন্তর্জাতিক যুদ্ধাচরণ নীতিমালা মানতে হবে।ব্যত্যয়ের বা ছাড়-দেয়াদেয়ির প্রশ্নই আসে না।অন্যের অপরাধের তুলনা টেনে যুদ্ধাপরাধকে হালকা করতে দেয়া বিশ্বের শিশুদের জন্যই বিপজ্জনক।

একটি উদাহরণ দিয়ে বলি। ধরা যাক- এক গ্রামে একদল হিংস্র ডাকাত আছে।তারা প্রায়ই দুষ্কর্ম করে। একবার পাঁচজনকে মেরেও ফেলল। এই কারণে সেনাবাহিনী চড়াও হয়ে নির্বিচার গুলি করে সেই গ্রামের স্কুলে পাঠরত ডজনখানেক শিশুকে মেরে ফেলল।তাও কাজটি করল বন্ধুপ্রতিম আরেক দেশের সেনাবাহিনী। ডাকাতদের তেমন কিছু হল না।এমনটি কি বলা যাবে এই ঘটনার আগে ডাকাতরাও তো ৫ জনকে মেরে ফেলেছিল?

শিশু হত্যা কি ‘কল্যাট্যেরালড্যামেজ’? গত কয়েক বছরে কয়েকশ' শিশুকে হত্যা করা হয়েছে দ্রোণঅ্যাটাকের মাধ্যমে। সেনারা খেলাচ্ছলে, কন্ট্রোল রুম হতে ভিডিও গেমিং-এর আমোদে হত্যাগুলো করেছে।এইসব নৃশংসতা দেখতে দেখতে যে শিশুরা বড় হচ্ছে; যেসব পিতামাতা নিরপরাধ শিশুদের হারানোর ক্রোধে ক্রুদ্ধ এবং প্রতিহিংসার ক্ষোভে জ্বলছে, তারা অস্ত্র হাতে তুলে নেবার জন্য খুনি তালেবান বা অন্য কোনো ডাকাতদলে যোগ দিবেই দিবে। তালেবান আইসিস ইত্যাদি ইসলামের জন্য লড়ছে ধারণাটি বিশ্বাস করার মত বড় বিভ্রান্তি ও ফাঁদ সম্ভবত আর কোনোটি নেই।

প্রশ্ন আসতে পারে এই কথাগুলো বলার জন্য মালালাকে লাগবে কেন? মালালা কি করতে পারে?

মালালা চাইলে বলে দিতে পারে অনেক কিছুই। বিশ্বদৃষ্টি এবং বিশ্ব-জনমতও নির্মাণ করতে পারে। মালালা এখন প্রাপ্তবয়স্ক। শিশুটি নয়। সে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেবার আইনানুগ ক্ষমতার অধিকারী। সে প্রতিবাদে নোবেল প্রত্যাখ্যান করতে পারে। অক্সফোর্ড ছাড়তে পারে। জাতিসংঘের দুতিয়ালি ছাড়তে পারে।

তার সংস্থা ইউনিসেফই ২০১৭ সালকে চিহ্নিত করেছে “অ্যা নাইটম্যের ইয়ার ফর চিল্ড্রেন ক্যট ইন ওয়্যার জোনস’। মালালা প্রশ্ন তুলতে পারে কেন বিশ্বের রিফিউজি শিশুদের ৯৬ ভাগই মুসলিম দেশের? শুধু ২০১৭ সালেই ইরাকে ও সিরিয়ায় ৭০০ এবং ইয়েমেনে ৫০০০ শিশুকে হত্যা করা হয়। দক্ষিণ সুদানে ১৯০০০ শিশু এখন শিশুযোদ্ধা, যাদের সামনে মৃত্যু এবং হত্যাকাণ্ড ব্যতীত আর কোনো ভবিষ্যত নেই।

২০১৫ সালের ইউনিসেফ রিপোর্ট দেখিয়েছিল, বিশ্বময় ২৩০ মিলিয়ন শিশু যুদ্ধরত দেশগুলোর যুদ্ধক্ষেত্রে আটকা পড়ে আছে। এসব তথ্যগুলো তো অন্তত সারাবিশ্বকে জানান দিতে পারে। আরো প্রশ্ন উঠতে পারে- কাজটির জন্য মালালাকেই উপযুক্ত ভাবতে হতে কেন?

উত্তরটি একেবারেই সহজ। বর্তমান সময়টি মডেলিং ফেটিশিজম এবং ব্রান্ড ফেটিশিজম-এর। মালালাকে বিশ্বময় শিশুদের জন্য একমাত্র আইকন হিসেবে পরিচিত করে তোলা হয়েছে। অতটা পরিচিত আর কারো কি আদৌ আছে কোথাও? নিশ্চিত নেই। তাহলে শিশুহত্যার প্রতিবাদের বেলায় মালালা কেনইবা ক্ষীণকন্ঠ বা কন্ঠবিরতিতে থাকছে?

জাতিসঙ্ঘের ঘোষণা মতে ‘টেকসই উন্নয়ন” এর সংজ্ঞাই বিশ্বরাজনীতির ক্রীড়নক হয়ে মডেলিং করার বদলে শিশুদের জীবন রক্ষায় সত্যিকারের মডেল হবার জন্য মালালাকে অনুরোধ করাই আমাদের জন্য করণীয়। [যারা যেই ভাষায় দক্ষ— ইংরেজি, আরবি, উর্দূ, হিন্দি, ফার্সি, পর্তুগিজ— দয়া করে লিখুন। অনায়াসে এই লেখাটিও অনুবাদ করতে পারেন। মালালা যদি শিশু হত্যাযজ্ঞ বিষয়ে খানিকটা বিশ্বদৃষ্টিও আকর্ষণ করতে পারে, অনেকগুলো শিশুজীবন রক্ষা পাবে।

লেখক : হেলাল মহিউদ্দীন, গবেষণা ফেলো, ম্যানিটোবা বিশ্ববিদ্যালয় এবং কনফ্লিক্ট অ্যান্ড রেজিলিয়ান্স রিসার্চ ইনস্টিটিউট কানাডার গবেষণা পরিচালক
ফেমাসনিউজ২৪/এফএম/এমএম