logo

শনিবার, ২১ এপ্রিল ২০১৮ | ৮ বৈশাখ, ১৪২৫

header-ad

বান্নি, মেলা, হালখাতা এবং আচার-অনাচার

শামীমুল হক | আপডেট: ০৮ এপ্রিল ২০১৮

আজ আর চোখে পড়ে না পহেলা বৈশাখে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে মিষ্টি খাওয়ানোর দৃশ্য। দুই তিনদিন আগে থেকেই গ্রামের বাজারের ছোট্ট দোকান থেকে শুরু করে শহরের বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সাজানো হাতো নানা রঙ্গে। ওই দিন ব্যবসায়ীরা সারাবছরের বকেয়া টাকা উত্তোলন করতেন। আর যারা বকেয়া টাকা নিয়ে আসতেন তাদের আপ্যায়ন করতেন মিষ্টি দিয়ে। এটি হালখাতা হিসেবে চিহ্নিত হতো।

পুরনো বছরের হিসাব শুধরে নতুন বছরের খাতা হালনাগাদ করত বলেই একে হালখাতা বলা হতো। কিন্তু আজ হালখাতা উৎসব খুব কমই চোখে পড়ে। হালখাতা ছিল বাংলা বছরের একটি ঐতিহ্য। বাঙালির এমন নানা ঐতিহ্য এখন হারিয়ে যেতে বসেছে। কিছু কিছু জায়গায় ঐতিহ্যের স্থলে স্থান করে নিয়েছে অনাচার।

পৃথিবী যত ছোট হচ্ছে ততই যেন মানুষ বেপরোয়া হচ্ছে। একসময় পহেলা বৈশাখ আসার মাস-দুয়েক আগ থেকেই চলতো মেলার আয়োজন। গ্রামের ঘরে ঘরে বাঁশের পালা ছিদ্র করে বধূরা এক পয়সা, পাঁচ পয়সা আর দশ পয়সা করে জমা রাখতো। বৈশাখের বান্নির দিন বাঁশের পালা কেটে যত্ন করে জমানো পয়সা বের করে আনতো।

তুলে দিতো সন্তানদের হাতে। দুরন্ত ওই সব শিশু-কিশোর গ্রামের অন্যদের সঙ্গে কিংবা বাবার সঙ্গে হাত ধরে যেতো কোন বটতলা, কিংবা নদীর পাড়ে বসা সেই বান্নিতে। সারাদিন ঘুরে মেলা থেকে কিনে আনতো বাঁশি, পেঁপু ও বডবডি। মেয়েরা মাটির নানা তৈজসপত্র, ছোট ছোট হাঁড়ি-পাতিল, ঢাকনা, হাতি- ঘোড়া কত কিছু।

খাবার হিসেবে কিনে আনতো মুড়ি-মুড়কি, বাতাসা, মোড়ালি আরও কত কি? বেশাখজুড়ে বান্নি থেকে আনা বাঁশির শব্দ মাতিয়ে রাখতো প্রতিটি বাড়ি। যেন পুরো এলাকা এক উৎসবের নগরী। ঐতিহ্যবাহী বান্নি যেন অতীত। এ বান্নিতে এখন যোগ হয়েছে আধুনিকতা। বটতলা থেকে তা স্থান পেয়েছে শহরের কোনো অডিটরিয়ামে। আলোচনা সভা, গান-বাজনার মধ্যে থাকে সীমাবদ্ধ। আর অডিটরিয়ামের পাশে মেলা বসে।

তবে সে মেলাতে মাটির তৈজসপত্রের বদলে থাকে ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি। ব্যাটারিচালিত খেলনা। যেখানে নেই বান্নির গন্ধ। এবার আসা যাক অন্য প্রসঙ্গে। বাঙালির আরেকটি ঐতিহ্য ছিল যৌথ পরিবার। এখন লাখে একটা যৌথ পরিবার পাওয়া দুষ্কর। ছোট সময়ে দেখেছি নিজেদের বাড়িতে ফজরের আজানের সময় চুলা জ্বালানো হতো।

সেই চুলা এক নাগাড়ে জ্বলতো গভীর রাত পর্যন্ত। অগণিত সদস পরিবারে। কে কখন আসতো। কে কখন খেতো এর কোন হিসাব ছিল না। এ ছাড়া মেহমান তো ছিলই প্রতিনিয়ত। এ এক অন্যরকম দৃশ্য ছিল বাড়িতে। কেউ ঢেঁকিতে ধান ভানছে। কেউবা গোলা ঘর থেকে ধান এনে রাখছে। কেউ বসেছে পিঠা বানাতে। এ এক এলাহি কাণ্ড।

এখন ঢেঁকিও নেই, ঢেঁকিছাঁটা চালও নেই। মাটির পাতিলে, লাকড়ির চুলায় রান্না ভাত খেতেই মনে চাইতো। এখন ঢেঁকির স্থানও হয়েছে জাদুঘরে। দশ গ্রাম ঘুরেও কোন ঢেঁকি পাওয়া যায় না। ঢেঁকির স্থান পূরণ করছে যন্ত্র। আর যৌথ পরিবার তা চলে গেছে যেন চাঁদের দেশে। এখন নাকি মেয়েরা বিয়ের আগেই চিন্তা করে ছোট সংসার হলে ভালো।

বুড়া-বুড়ি না থাকলে তো আরও মজা। বোনদের বিয়ে হয়েছে কিনা? তারপর সিদ্ধান্ত নেয় এ ছেলেকে বিয়ে করবে কিনা? এমন না হলেও অসুবিধা নেই। বিয়ের পর নানা ছলচাতুরীতে স্বামীকে পটিয়ে গ্রাম থেকে সোজা শহরে। বুড়া আর বুড়ির স্থান হয় গ্রামেই। আর শীতের পিঠা, পুলি আর নানা জাতের পায়েস উধাও হয়েছে অনেক আগেই।

সে সময় গ্রামে কোন অনুষ্ঠান হলেই আগে থাকতো পিঠা। রাতভর ঢেঁকিতে চালের গুঁড়ি করা। তারপর আশপাশের বউ-ঝিরা বসে পিঠা বানানোর পাশাপাশি নানা গল্প আর গানে। এ দৃশ্য এখনকার ছেলেমেয়েদের কাছে অকল্পনীয়। এখন কে যাবে এ ঝামেলায়। তার চেয়ে না করাই ভালো।

বেশি প্রয়োজন হলে এখন তো সব জাতের পিঠাই পাওয়া যায় কিনতে। কষ্ট করে বানানোর চেয়ে কিনে এনে খেয়ে ফেললেই হয়। আগে বিয়ের আসরে রাতভর চলতো গীতের আয়োজন। বর বা কনের গায়ে-হলুদ ও হাতে মেহেদি পরাতো গীতে গীতে। আর এ গীতে অংশ নিতেন দাদি-নানিরা।

দেও গায়ে হলুদ/পায়ে আলতা/হাতে মেহেদি/বিয়ের সাজে কন্যারে সাজাও জলদি। এখন আধুনিক যুগে বিউটি পার্লার সব নিয়ে বসে আছে। গেলেই হয়। একেবারে রেডি। আর গীতের জায়গা দখল করেছে ব্যান্ড। রাতে ব্যান্ডের গান শুনে বাড়ির লোকজন আনন্দ করে।

পাড়া-প্রতিবেশী হয় বিরক্ত। আর আগে বরযাত্রী নিয়ে রাতে গিয়ে হাজির হতো কনের বাড়িতে। সে বাড়ির ঘরের চারপাশে সামিয়ানা টানিয়ে, কাগজের ফুল দিয়ে সাজানো হতো। এ ঘরেই হতো খাবার-দাবার। এখন এসব ঝামেলাও নেই। সব নিয়ে বসে আছে কমিউনিটি সেন্টার। টাকা দিলেই সব রেডি। শুধু তা-ই নয়, বিয়ে উপলক্ষে সপ্তাহ-দিন আগ থেকে বর ও কনের বাড়িতে আসতো নাইওরি।

তারা নান ধরনের পিঠা বানিয়ে নিয়ে আসতো। যেসব পিঠা বিয়ের দিন বরযাত্রী ও বিয়ের পরে ফিরাযাত্রায় বরের সঙ্গে আসা লোকজনদের সকালের নাশতা হিসাবে দেয়া হতো। এখন নাইওরির কোন ঝামেলা নেই। দূর-দূরান্তের স্বজনদের বাড়িতে গিয়ে দাওয়াত দেয়ার আনন্দ থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন দু’পক্ষই।

কারণ এখন গিয়ে দাওয়াত দিতে হয় না। মোবাইল ফোনেই কাজ শেষ। অবশ্য দাওয়াত দেয়া হয় বিয়ের দিনের জন্য। আর সেটা কমিউনিটি সেন্টারে। সেখানে খাওয়ার পর উপহার নেয়ার জন্য লোকও বসানো হয়। আর পালকি চড়ে কনের চলে যাওয়ার দৃশ্য তো এখন অকল্পনীয়।

বেহারারা তাই পেশা ছেড়ে অনেক আগেই অন্য পেশায় চলে গেছেন। বাঙালির আরও কত ঐতিহ্য এভাবে হারিয়ে যাচ্ছে দিন দিন। কেউ এর জন্য আফসোসও করেন না। বরং ঝামেলামুক্ত বলে কেউ কেউ গর্ববোধ করেন।
ফেমাসনিউজ২৪/এফএম/এমএম