logo

শনিবার, ২১ এপ্রিল ২০১৮ | ৮ বৈশাখ, ১৪২৫

header-ad

'রাজনীতিকরণ আর স্বজনপ্রীতির কোটা বেশি'

রুমানা রশীদ রুমী | আপডেট: ১০ এপ্রিল ২০১৮

দেশের প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয় আর কলেজের ছাত্রছাত্রীরা চাকরির ক্ষেত্রে কোটা সংস্কারের জন্য একযোগে আন্দোলন করে চলেছে। গতকাল সোমবার মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতিনিধি হিসেবে দলের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, মাহবুল-উল আলম হানিফ এবং জাহাঙ্গীর কবির নানকসহ আরও ১১ জন নেতার উপস্থিতিতে ছাত্রছাত্রীদের প্রতিনিধি দলের সাথে বৈঠক হয়।

সুস্পষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত না দিলেও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সিদ্ধান্ত জানানো হবে বলে বলা হয় এবং ৭ মে অবদি আন্দোলন স্থগিত করার সিদ্ধান্ত আসে।

কিন্তু বারবার হতাশ হওয়া ছাত্র-ছাত্রীরা আবার আজ সকাল ১১টা থেকে আন্দোলন করবে বলে ঘোষণা দিয়েছে। যদি তাদের ক্যাম্পাসে আন্দোলন করে তা করতেই পারে। শুরুতে তা সহিষ্ণু আন্দোলনই ছিল। পরে ভিসির বাসভবনে হামলা অবদি বিষয়টি গড়াই। কেউ কেউ মনে করছেন- চাকরির কোটা নিয়ে ভিসির কী করার আছে। একটা বিষয় স্পষ্ট করে বলা দরকার যে, অনার্স পাস করেই চাকরির জন্য আবেদন করা যায়। অনেক ছাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পরপরই চাকরির জন্য পরীক্ষা দিতে প্রস্তুতি শুরু করে।

সে মাস্টার্স কিংবা এমফিলের পাশাপাশি চাকরির আবেদন ও পরীক্ষাগুলি চালিয়ে যায়। সেখানে প্রত্যাশিত ফল না পাওয়া তাকে হতাশ করবেই। তাদের এই যৌক্তিক আন্দোলনে তাদের প্রতি সমবেদনা না জানানোতে যা প্রকাশ পায় তা হল ছাত্র-ছাত্রী যথেষ্ট যোগ্য নয় বলে তার নীরব সমর্থন আছে।

কিন্তু আমি মনে করি যে, ছাত্র-ছাত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া অবদি যোগ্যতা রাখল; সে চাকরিতে গিয়ে যোগ্যতা হারাল- মানে সে দায় তার নিজের নয় বরং তার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের। আর ভিসি মহোদয় যদি তার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা এবং শিক্ষকদের প্রতি যথেষ্ট ভরসা রাখেন তবে অবশ্যই আমাদের ছাত্র-ছাত্রীদের এই যৌক্তিক দাবিকে সমর্থন জানাবেন এবং তাদের হয়ে উপর মহলের কাছে সুপারিশ করবেন। কারণ তিনি ছাত্র-ছাত্রীদের অভিভাবক।

বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির এই ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর বাবা-মায়েদের যতটা না শাসন থাকে তার বেশি তার এ অধিকার। আর ছাত্র-ছাত্রীদের বর্তমান ঠিকানাই এই ক্যাম্পাস। সুতরাং তাদের অবস্থান নেয়ার আর কোনো জায়গাও নেই। তাদের ওপর আক্রমণ হলে তা থেকে রক্ষা করার দায়িত্ব ভিসি মহোদয়েরই ওপর বর্তায়। আশা করি- তিনি তা শক্ত হাতে করবেন।

দেশের কত ছাত্র-ছাত্রী বেকার সমস্যায় ভুগছে তা ভেবে দেখেছেন? এ বিশাল সংখার বেকারত্বের দায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাব্যবস্থার ওপর অনেকাংশে পড়ে।বেসরকারি খাতে যদি পর্যাপ্ত নিয়োগের সুযোগ থাকতো আর সম্মানীও পর্যাপ্ত হত এবং ছাত্র-ছাত্রীরা পড়াশোনা শেষে ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা পেত; তবে সরকারি চাকরি সেক্ষেত্রে অনেকের না হলেও চলে।

কিন্তু প্রথমত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নিয়োগকর্তাদের কাছে প্রায়শই দক্ষ কর্মীর অভাব আছে বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। চাকরি পরবর্তী প্রশিক্ষণ খরচ বিবেচনায় তারা কর্মীর বেতন সীমিত ধার্য করেন। চাকরি সংকটে বেকার ছাত্র-ছাত্রী বাধ্য হয়ে কম বেতনে চাকরি নেয়।

উপরন্তু সরকারের যথেষ্ট নজরদারি না থাকায় এসব প্রতিষ্ঠান পরবর্তীতে বেতন সুবিধা বৃদ্ধি করে না। এমনকি জনশক্তি রপ্তানিকারক বিভিন্ন এজেন্সির কাছ থেকে ন্যূনতম বেতনে নতুন কর্মী নিয়োগ দেন। অগত্যা কিছুদিন পর চাকরি হারানোর হুমকির মুখে থাকে আমাদের মেধাবী ছাত্র-ছাত্রী।

সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে এ পর্যন্ত দেখা গেছে- ৫৬% কোটা আর ৪৪% মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ হয় ১ম ও ২য় শ্রেণির চাকরিতে। আর ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণির চাকরিতে এ কোটা বেশি বৈ কম নয়। তাই ছাত্র-ছাত্রীদের দাবি- কোটা ১০ শতাংশে কমিয়ে আনা হোক।

আর মন্ত্রণালয় থেকে বলা হচ্ছে- ৩৩তম বিসিএসে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ ছিল ৭৭.৪৪% যা ৩৫ ও ৩৬তম বিসিএসে ছিল যথাক্রমে ৬৭% ও ৭০%। উপরন্তু কোটায় যোগ্য প্রার্থী না পাওয়া গেলে মেধাতালিকা থেকে প্রার্থী নিয়োগ করা হয়।

সম্প্রতি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে কোটার ফাঁকা পদ পূরণ নিয়ে একটি ব্যাখ্যা দেয়া হয়, যা আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দেন। সুশীল সমাজ, গবেষক সবারই মন্তব্য- কোটাকে সহনীয় পর্যায়ে আনতে হবে।

বলতে পারেন, যারা প্রতিযোগিতায় যুদ্ধ করে টিকে গেল তাদের কতজনই বা উপযুক্ত ক্যাডার কিংবা পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধা পায়? আমাদের বিসিএসের মত গুরুত্বপূর্ণ সরকারি চাকরির নিয়োগে পদ্ধতিগত ত্রুটির কথাই বলি। কিছুদিন আগে বিসিএস পররাষ্ট্র ক্যাডারে প্রথম হওয়া মেডিকেল ছাত্রী ডা. সুবর্ণা তার উপযুক্ত উদাহরণ।

এর ফলে পরবর্তীতে অ্যাম্বাসী, হাইকমিশনে দেখা যায় কর্মকর্তাদের খারাপ ব্যবহার, অদক্ষতা আর কাজের প্রতি ভীষণ অমনোযোগ। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ারসহ বিভিন্ন বিশেষায়িত ক্যাডার সুবিধা থাকা সত্ত্বেও প্রশাসন, পুলিশ, পররাষ্ট্র ক্যাডারের মত স্পর্শকাতর ক্যাডারে নিয়োগ সুবিধা থাকলে এমনটি হবেই।

কিন্ত একইসঙ্গে তাদের বিশেষায়িত ক্যাডারভিত্তিক সুবিধাদিও বাড়াতে হবে।তবেই যার যার ক্যাডারে থাকার সহনীয়তা বাড়বে। ওদের সিলেবাসে পদোন্নতি, প্রেষণ, কর্মী ব্যবস্থাপনায় পড়ানোর সুযোগ থাকে না। তাহলে এ বিষয়ে সীমাবদ্ধতা থাকবেই।

বরং পিএসসির অধীনে বিশেষায়িত ইনস্টিটিউট গড়ে তুলে প্রশাসন, পুলিশ, পররাষ্ট্র ক্যাডারের মত স্পর্শকাতর ক্যাডারে নিয়োগের আগেই বিশেষ কোর্সের মাধ্যমে ছাত্র-ছাত্রীদের দক্ষ করে নিতে হবে। এসব ক্ষেত্রে মনোযোগ না দিয়ে শুধু কোটাকে গুরুত্ব দেয়া আপাতদৃষ্টিতে রাজনীতিকরণ করা ছাড়া কিছু নয়।

মুক্তিযোদ্ধার উত্তরাধিকার অপেক্ষা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সম্প্ন্ন একটি জাতি বেশি দরকার, যাদের মধ্যে দেশপ্রেম থাকবে। যারা সে প্রেমেই দুর্নীতিমুক্তভাবে দেশ ও প্রশাসন চালাবে। আপনারা তো মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সম্পন্ন ছাত্র-ছাত্রীও তৈরি করতে পারেননি।

যার বাবা-দাদা মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না তার জন্মের কী দোষ? তার মেধার কি কোনো দাম নেই? সে কি কোনো সুযোগ পাবে না? তার মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে অনুগ্রহ করে নষ্ট করে দেবেন না। তাকে এ হতাশায় অপরাধী আর দুর্নীতিপরায়ণ করে তুলবেন না।

কেননা এ সুবিধা-বঞ্চিত যে স্কুল-কলেজে কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির বেলায়ও হয়েছে। তার জীবনে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে টিকে থাকবার গল্পে আশা আর প্রত্যাশা দিয়ে প্রাণচাঞ্চল্য আনবে আর দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবার প্রত্যয় তৈরি করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা যোগাবে।

তাকে দেশকে ভালোবাসতে সাহায্য করবে এবং উন্নয়নের মুক্তিযুদ্ধে এদের মেধাকে হাতিয়ার করবে। নচেৎ এরাই হতাশ হয়ে বিদেশে অভিবাসনের পথ বেছে নেবে। তাতে আমাদের মেধা পাচার হয়ে যায়। আমাদের মেধা কাজে লাগিয়ে বিশ্ব যখন তুঙ্গে আপনারাই তখন মেধাহীনকে পদাধিকার বলে বসিয়ে দুর্নীতির তুঙ্গে।

মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানে কোটা অবশ্যই বহাল থাকবে কিন্তু তার শতাংশ কম হোক। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী আর প্রতিবন্ধী কোটার এখনো প্রয়োজন আছে। নারী কোটা, জেলা কোটা, পোষ্য কোটাসহ সব কোটা প্রয়োজনের চেয়ে রাজনীতিকরণ আর স্বজনপ্রীতি বেশি। এগুলোর জরুরি সংস্কার আসুক।
ফেমাসনিউজ২৪/এফএম/এমএম