logo

বুধবার, ১৫ আগস্ট ২০১৮ | ৩০ শ্রাবণ, ১৪২৫

header-ad

এবার ঈদে তোমার ওখানে যাব মা

প্রতীক ইজাজ | আপডেট: ১৪ মে ২০১৮

মা চলে যাওয়ার পর, অনেকদিন তার প্রিয় জামরুল গাছটায় কোনো ফল ধরেনি। যে জানলার পাশে বসে সুরেলা কণ্ঠে কোরান তেলায়াত করতেন, সে জানালাটা খোলেনি কেউ। বাড়ির সামনের সবুজ লনে প্রজাপতি ওড়েনি, দোয়েল খেলেনি, ফুল ফোটেনি।

মার সঙ্গে সংসারও ঘুমিয়ে পড়েছিল আমাদের। আমরা জেগেছিলাম কঙ্কারসার মন নিয়ে। রোজ রাতে কোনো না কোনো ঘর থেকে কান্না ভেসে আসতো। চুলা জ্বলতো না। লালচোখ মানুষ আমরা একা একা ঘুরতাম, বসে থাকতাম। মার রেখে যাওয়া শাড়ি, গয়না বুকের সাথে ধরে ডুকতে কাঁদতাম।

আমরা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলাম। একা হয়ে গেলাম। মার সঙ্গে দু’একটা যা ছবি, ধীরে ধীরে সেগুলোও ম্লান অস্পষ্ট হয়ে গেল। দেয়ালে ঝুলছিল মা-বাবার যুগল যে ছবি, অনেক বছর ধরে সেটিও দেয়ালে দেখি না।

এবার শবে বরাতে বাড়ি গিয়েছিলাম। মা-বাবার কবর পাশাপাশি। দেখতে গিয়েছিলাম তাদের। যতবারই চোখ তুলে তাকিয়েছি দেখবো বলে, অস্পষ্ট হয়েছে মুখ জলে। আমার দেখা হয়নি। ফেরার সময় কেবল শুনতে পেলাম, মা বলছে: সাবধানে যাস। ভালো থাকিস বাবা। আবার আসিস।

আমাদের অভাব বেড়েছে, সংসারে সংকট বেড়েছে। বেঁচে থাকার জন্য সংসার পরিজন নিয়ে তোমার ছেলেরা যুদ্ধ করছে। আমাদের মধ্যকার সম্পর্কের অনেক অবনতি হয়েছে। চেনা সংসারের আদলটাই বদলে গেছে। জায়গা ভাগ হয়েছে, ঘরদোর; এমনকি তুমিও।

তোমার ওই ছবিটা এখনো ভাসে। ঈদে বাড়ি যাব। সন্ধ্যার পর থেকেই তসবিহ হাতে তুমি দাঁড়িয়ে সাঁকোর ওপর। সময় যায়। তোমার অপেক্ষা উদ্বেগে রূপ নেয়। মধ্যরাতে যখন বাড়ি পৌঁছি, তুমি তখনও জেগে। ঘরে ঢুকেই তোমার প্রথম কাজ ছিল আমার জামা খুলে দেওয়া। এমনকি স্যান্ডো গেঞ্জিটাও। তারপর পেটে পিঠে বুকে মুখে হাত ঘুরতো তোমার। একসময় চোখে জল এনে ফিসফিস করে বলতে- ঠিকমত খাসনে বুঝি। কেমন শুকিয়ে গেছিস!

আমি আরো রোগা হয়েছি মা। দুর্বল হয়েছি। পরিবার পরিজন থেকে আরো বিচ্ছিন্ন হয়েছি। এখন আর রুটিন করে বাড়ি যাওয়া হয় না। টানে না। গেলেও মনটা উচাটন হয়ে থাকে। তোমার রেখে যাওয়া ঝকঝকে তকতকে সংসারে অনেক ধুলোবালি পড়েছে। চোখে লাগে। শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। কথা বলতে পারি না। নিশ্চেতন মন নিয়ে আবার ফিরি কাজে, ঢাকায়।

তোমার গল্প এখনো করি মা। সবাই শোনে। মাত্র কয়েক ক্লাস পড়া তুমি কী নিপুণভাবে চালাতে সংসার। বড় বড় বিদ্যা নিয়ে তোমার স্বামী, ছেলে-মেয়েরা, কী অসহায়ভাবে নতমুখে দাঁড়িয়ে থাকতো তোমার সামনে। তোমার সব মুখস্থ- আমাদের পরীক্ষার খাতা, রিডিং রুম, বাবার পেনশন বই। তুমি মুখ দেখে অপরাধ বলে দিতে পারতে অবলীলায়।

এবার ঈদে বাড়ি গেলে তোমার ওখানে যাবো। কিছু কথা আছে। মনটা খুব খারাপ। তোমাকে বলবো বলে এখনো কাউকে বলিনি। একমাত্র তুমি পারো সমাধান দিতে। ভালো থেকো মা। দেখা হবে।

লেখক: সাংবাদিক, কবি ও সংস্কৃতিকর্মী।

ফেমাসনিউজ২৪/আরইউ