logo

শুক্রবার, ২২ জুন ২০১৮ | ৮ আষাঢ়, ১৪২৫

header-ad

পাশের শহর আগরতলা

ড. মাহফুজ পারভেজ | আপডেট: ১৮ মে ২০১৮

আমাদের সীমান্তের তিনদিকজুড়ে ভারত রাষ্ট্রের অনেকগুলো রাজ্যের নানা শহর অবস্থিত। বাংলাদেশের সবচেয়ে কাছের শহর কোনটি? সবচেয়ে পাশের শহর কোনটি? অবশ্যই ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলা। সীমান্তের দাঁড়ালে শহরটির গন্ধ ভেসে আসে। আবছা দেখা যায় রাতে। ভালো করে তাকালে চোখে-মুখে আগরতলার আলোর ঝলক ছিটকে আসে। বাংলাদেশের সবচেয়ে কাছের শহর আগরতলা ঠিক যেন পাশের বাড়ির মতো নিবিড়, নিকটবর্তী ও আন্তরিক। সদ্য সেখানে মুখ্যমন্ত্রীও নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশের চাঁদপুরের ছেলে বিপ্লব সরকার।

মানচিত্রের দিকে তাকালে দেখতে পাবো যে, বাংলাদেশের পশ্চিম সীমান্তের বেনাপোল থেকে কলকাতা কয়েক ঘণ্টার পথ। উত্তরের বাংলাবান্ধা থেকে শিলিগুড়ি-জলপাইগুড়ি খুব কাছের শহর নয়। সিলেট সীমান্ত থেকে গৌহাটি, শিলং বেশ দূরবর্তী। আর আগরতলা? একদম গা-ঘেষাঁ। সীমান্তের খুবই কাছে। একেবারেই পাশে।

মনে আছে, শৈশবে ঢাকা-চট্টগ্রাম ট্রেনে আসা-যাওয়ার সময় আখউড়া স্টেশনে এলে রোমাঞ্চিত হতাম। জানালা দিয়ে পূর্বদিকে তাকালে কখন আগরতলা দেখা যাবে, সারা পথ এই ভেবে কেটে যেত। কসবা স্টেশনে এলে তো উত্তেজনা চরমে! ট্রেন চলছে দু‘দেশের সীমানা বরাবর। একপাশে বাংলাদেশ অন্য পাশে ভারত। ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য। রাতের বেলা আগরতলা শহরের আলো নিকষ কালো আকাশের অনেকটুকু জায়গা রাঙিয়ে দিত। আহ! কত কাছেই না আগরতলা শহর! চোখে দেখা যায়, তবু যাওয়া যায় না!

আগরতলা নিয়ে কত কথাই না ভেবেছি জীবনের অসংখ্য রেলযাত্রায়। স্বপ্ন দেখেছি রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিস্পর্শী শহরের যাওয়ার। অমর সঙ্গীতকার শচীন দেব বর্মন, শিক্ষা ও শিল্পপ্রেমী ত্রিপুরার রাজা মাণিক্য কিশোরের হাতে-গড়া আগরতলায় ঘুরে বেড়ানোর রোমান্টিক কল্পনায় ভেসেছি। ত্রিপুরা আর আগরতলা আমার মনের গভীরতম চেতনায় এতোটাই জায়গা করে নিয়েছিল যে, এ প্রসঙ্গে যৌবনে আস্ত একটি কবিতাই রচনা করেছিলাম। ১৯৯৬ সালে প্রকাশিত আমার প্রথম কাব্য গ্রন্থ ‘আমার সামনে নেই মহুয়ার বন’-এ কবিতাটি মুদ্রিত হয়েছে।

বাংলাদেশের সীমান্তগুলো, সীমান্ত শহরগুলো, রেলপথগুলো গৌরবময় ও বৃহত্তর অতীতকে বড় বেশি মনে করিয়ে দেয়। একবার বৃহত্তর কুষ্টিয়ার সীমান্ত শহর দর্শনায় গিয়ে শরীর ছমছম করে ওঠেছিল। গোয়ালন্দ-ফরিদপুর-ঝিনেদা হয়ে দর্শনার প্রান্ত সীমায় কেরু অ্যান্ড কোম্পানির বিশাল কম্পাউন্ডে এসে মনে হয়েছিল, আহ! আমি তো নদীয়ার ভেতরেই চলে এসেছি। ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটে গারো পাহাড়ের পাদদেশে আপ্লূত হয়েছি সবুজে-শ্যামলে। সিলেটে উচ্চাবচ পাহাড় যেন হাতছানিতে ডেকেছে ‘পার্বত্য সাত কন্যা’র দেশে। রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়িতে ভ্রমণকালে শরীরে এসে লেগেছে প্রতিবেশীর পরশ।

একাকী রেলযাত্রায় আনমনে তাকিয়ে থেকে পূর্বাঞ্চলের প্রায়-পুরোটা রেলপথেই পোতা ছোট ছোট পিলারের লেখা দেখেছি ‘এবিআর’। যার মানে ‘আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ে। সিলেটের রেলপথ প্রায়-সমস্তটাই ‘এবিআর’ চিহ্নের পিলারে ভরা। দক্ষিণের রামু, উখিয়া, কক্সবাজার বা টেকনাফে গেলে নজরে এসেছে প্রাচীন রোসাঙ-আরাকান রাজ্যের বিলুপ্ত-প্রায় নানা স্মৃতিগন্ধী বিষয়-আশয়। পৃথিবীকে মনে হয়েছে অনেক বড় আর প্রসারিত। অতীতকে মনে হয়েছে স্বপ্নময় আর নিবিড়।

বারবার কুমিল্লা শহরে কাজে বা বেড়াতে গিয়ে দেখেছি অনেক কিছুতেই ত্রিপুরার স্মৃতি। শহরের প্রাণকেন্দ্র কান্দিরপাড়-টাউন হলের সামনে লাল ইটের প্রাচীন ইমারত দেখে জানতে চেয়েছিলাম। কেউ একজন বলেছিলেন, এক সময় এটি ‘ব্যাংক অব ত্রিপুরা’ ছিল। কুমিল্লার কাগজ-পত্রে, অনেকের সার্টিফিকেটে ত্রিপুরা নামটি পরিচিতি হিসাবে সংযুক্ত ছিল। বৃহত্তর কুমিল্লা, ফেনী, চৌদ্দগ্রামের ভৌগোলিক নৈকট্য ত্রিপুরার স্মৃতিময়। অনেক দিন দু'টি ত্রিপুরার কথা আমরা জেনেছি। একটি পার্বত্য ত্রিপুরা, ভারতের অংশ। আরেকটি শুধু ত্রিপুরা, পাকিস্তান ও পরে বাংলাদেশের অংশ, যা হাল আমলে কুমিল্লা।

স্মৃতি ও অতীতের ত্রিপুরা বিশ্বায়ন ও তথ্য-প্রযুক্তি প্রভাবিত গণমাধ্যম আর যোগাযোগ সুবিধার হাত ধরে আবার নৈকট্যের নিবিড়তায় আমাদের প্রবলভাবে দোলায়িত করেছে। আমরা জানি, ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলা থেকে কলকাতার দূরত্ব ১,৭০০ কিলোমিটার। কিন্তু ঢাকা ও চট্টগ্রামের দূরত্ব মাত্র ১৪০ কিলোমিটার। স্থল কাস্টমস স্টেশনের মধ্য দিয়ে ওই দুটি শহর থেকে ত্রিপুরায় মালপত্র আনা অনেক সুবিধাজনক তো বটেই, লাভজনকও। এই ভৌগলিক নৈকট্যকে কাজে লাগিয়ে পরিবহণ খরচ কমিয়ে লাভজনক ব্যবসার পথও দিনে দিনে উন্মোচিত হচ্ছে। পর্যটন, শিক্ষা, সংস্কৃতিসহ সর্বক্ষেত্রে নিবিড়তাও বাড়ানো সম্ভব হবে খুবই বাস্তব সম্মত কারণে।

ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশ যেমন তিন দিক দিয়ে ভারতবেষ্টিত, ত্রিপুরা রাজ্যটিও তেমনিভাবে তিন দিক দিয়েই বাংলাদেশের দ্বারা পরিবেষ্টিত। ত্রিপুরার উত্তর, দক্ষিণ ও পশ্চিমে বাংলাদেশ আর পূর্বভাগে ভারতের অপর দুই রাজ্য আসাম ও মিজোরাম অবস্থিত। আসামের করিমগঞ্জ জেলা ও মিজোরামের আইজল জেলার দ্বারা মাত্র একটি দিক দিয়ে এটি ভারতের মূল ভূখণ্ডের সাথে যুক্ত। বাকি তিন দিকে বাংলাদেশের উপস্থিতি ত্রিপুরার সঙ্গে আমাদের ভৌগোলিক লেনদেন সহজ করে। এই সুসম্পর্ক ও মেলামেশার অবারিত সুযোগ প্রকৃতি নির্ধারিত। সুপ্রতিবেশী ত্রিপুরার মাধ্যমে বাংলাদেশ যেমন উপকৃত হতে পারে, ত্রিপুরাবাসীও তেমনিভাবে বন্ধু বাংলাদেশের মাধ্যমে নানা দিক দিয়ে উপকার পেতে পারে।

প্রথাগত কূটনীতির বাইরে ক্রিকেট বা কালচারাল ডিপ্লোমেসির দ্বারা যেমন বিভিন্ন দেশের মধ্যে আন্তঃসম্পর্ক উন্নয়ন করা যায়, বিশ্বায়নের তথ্য-প্রযুক্তির যুগে মিডিয়া ও গণমাধ্যমের দ্বারাও নৈকট্যের কাজটি সাধিত হয়। দু‘দেশের তথ্য-যোগাযোগের ভিত্তি স্থাপনের ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালনকালে পারস্পরিক বন্ধুত্ব, যোগাযোগ, বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির লালন-পালন ও বিকাশের স্বার্থে কাজ করারও সুযোগ রয়েছে। এ সুযোগকে অবশ্যই কাজে লাগাতে হবে।

লেখক : কবি, গল্পকার ও গবেষক, অধ্যাপক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]
ফেমাসনিউজ২৪/এফএম/এমএম