logo

বৃহস্পতিবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৮ | ২৮ অগ্রহায়ণ, ১৪২৫

header-ad

গণতন্ত্রের প্রয়োজনে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন

ড. মাহফুজ পারভেজ | আপডেট: ১১ জুন ২০১৮

গণতন্ত্রের প্রয়োজনে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের বিকল্প নেই। ফলে নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্রের ‘বিজয়’ না ‘বিদায়’ হয়, সে প্রশ্ন উত্থাপন করাই অবান্তর। গণতন্ত্রের জন্য নির্বাচন অপরিহার্য, এটাই শেষ কথা।

কিন্তু বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ও চলমান বিভিন্ন নির্বাচন নিয়ে সন্দেহ ও সংশয় দেখা যাচ্ছে। সামনেই একটি জাতীয় নির্বাচন। তাই গণতন্ত্রের স্বার্থে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করা সবার মিলিত চেষ্টা হওয়া উচিত।

বাংলাদেশের অতীত ইতিহাসে, বিশেষত সামরিক শাসনামলে সন্ত্রাস, ব্যাপক কারচুপি ও জালিয়াতি নির্বাচনের শরীরে ক্যান্সারের মতো বৃদ্ধি পেয়েছে। পত্রিকার শিরোনাম এসেছে: ‘ডিজিটাল যুগে এনালগ কারচুপি’। অতএব, নির্বাচন ব্যবস্থার দুরবস্থা নিয়ে সবাই চিন্তিত।

বিশেষ করে, মানুষের জীবন ও নিরাপত্তা নির্বাচনের প্রাক্কালে চরম শঙ্কার মধ্যে নিপতিত হচ্ছে। বিশেষত নারী, সংখ্যালঘু ও বিরোধী প্রতিপক্ষ ক্ষমতার আক্রোশের নির্মম শিকারে পরিণত হচ্ছে। পুরো পরিস্থিতিই উদ্বেগজনক।

নিরাপদে ভোট দেয়ার পরিবেশ সৃষ্টিও তাই গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পূর্বশর্ত।
স্বাধীনতার পর পর অনুষ্ঠিত ১৯৭৩ সালে দেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন স্মরণাতীতকালের ভয়াবহ সন্ত্রাস দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিল। কারণ, পাকিস্তানের ২৪ বছর জাতি নির্বাচনী অধিকার পায়নি।

মানুষের মধ্যে নির্বাচনের অভিজ্ঞতাও ছিল না। স্বাধীন বাংলাদেশে সে অধিকার প্রথমবারের মতো পেয়ে সুষ্ঠুভাবে প্রয়োাগ করা সম্ভব হয়নি অভিজ্ঞতার অভাবে এবং বিভিন্ন গ্রুপের দৌরাত্ম্যের জন্য। সে সময় বহু প্রার্থীকে কিডন্যাপ করা হয়; অনেককে প্রার্থিতা প্রত্যাহারে বাধ্য করা হয়; ভোটকেন্দ্রগুলো দখল করে পছন্দের প্রার্থীদের বিজয়ী করা হয়।

৩০০ আসনের জাতীয় সংসদে মাত্র ৭ জন বিরোধী দলের প্রার্থী বিজয়ী হতে সক্ষম হন। সন্ত্রাস ও বলপ্রয়োগের মাধ্যমে স্বচ্ছ, অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের ক্ষতির ফলে দেশ, জনগণ এবং খোদ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগই ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল বলে বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছেন।

এসব বলপ্রয়োগ যে আওয়ামী লীগ সিদ্ধান্ত নিয়ে করেছিল, এমন নয়। বহু অতি-উৎসাহী ক্যাডার এমন অপকর্ম করতে লাফিয়ে পড়েছিল। যার দোষ চাপে আওয়ামী লীগের কাঁধে।

বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থাকে কলুষিত করার জন্য যেমন এরশাদ আমলকে বিশেষভাবে দায়ী করা হয়, তেমনি ১৯৭৩ সালের আওয়ামী লীগ শাসনামলের নির্বাচনকে কলঙ্কিত করার দায় বিতর্কিত খন্দকার মোশতাকের। সে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বোকার মতো ক্ষতিগ্রস্ত হয় সন্ত্রাস করে।

যদিও স্বাধীনতার পর পর আওয়ামী লীগের আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তার কারণে সে সময় নির্বাচনে সন্ত্রাস করার দরকার ছিল না। সে নির্বাচনে সন্ত্রাস ও বলপ্রয়োগের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের হত্যাকারীর উত্থান হয়। কারণ সুষ্ঠু নির্বাচন হলে কুমিল্লার দাউদকান্দি থেকে খন্দকার মোশতাক কখনোই বিজয়ী হতেন না।

সেখানে বিজয়ের দোরগোড়ায় পৌঁছে গিয়েছিলেন জাসদের ইঞ্জিনিয়ার আব্দুর রশীদ। প্রচণ্ডভাবে সন্ত্রাস, সহিংসতা করে এবং প্রশাসন ও ক্যাডারদের লেলিয়ে দিয়ে খন্দকার মোশতাকের ক্যাডাররা নিলর্জ্জভাবে খন্দকার মোশতাককে বিজয়ী করেছিল, সে ইতিহাস অতি ন্যক্কারজনক ও নিন্দিত।

অতএব, অজনপ্রিয়দের জন্য জবরদস্তিমূলক নির্বাচনে গণরায়কে লুট করে বিজয়ানন্দ করার ফল ভালো হয় না। যারা জনপ্রিয় তাদেরকে বিজয়ের পথ করে দেওয়াই মঙ্গলজনক। কারণ, অতীত অভিজ্ঞতা বলছে যে, জনতার রায়ে জননেতার বদলে জোর করে ষড়যন্ত্রকারীকে আনার ফল ভালো হয়নি।

ষড়যন্ত্রকারীরা জনগণের বা দলের প্রতি বিশ্বস্ত থাকেনি। ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য দলকে ব্যবহার করে দল ও নেতার বিরুদ্ধে ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র করেছে। যার মাসুল সবচেয়ে বেশি দিতে হয়েছে আওয়ামী লীগকেই।

প্রসঙ্গত বলা দরকার, নির্বাচনী বিপর্যয়ের হাত ধরে পরবর্তী সামরিকতন্ত্রীরা বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থার পবিত্রতা পুরোপুরি নস্যাৎ করে দেয়। হোন্ডা আর গুণ্ডা দিয়ে ভোটকেন্দ্র দখলের উৎসব শুরু হয়। গণরায় একেবারেই ভুলুণ্ঠিত হয়।

কতিপয় পদলেহীকে ক্ষমতা দখলকারীরা সংসদে আসার সুযোগ দেয়। প্রকৃত জনপ্রতিনিধি ও জনসমর্থিত ব্যক্তিগণের পক্ষে নির্বাচনের সঠিত রায় পাওয়ার কোনোই সুযোগ রাখা হয়নি। এমনই অবনতিশীল পরিস্থিতির ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশে সঠিক ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অসম্ভব হয়ে পড়ে। স্বাধীনতার নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগ এ কারণে বহু বছর জনগণের রায় নিয়ে ক্ষমতায় আসতে পারেনি।

গণতন্ত্রে ক্ষমতায় আসতে বা যেতে হলে নির্বাচনের পথেই সেটা করতে হবে। আওয়ামী লীগ এবং বিএনপিকে এই সত্য মনে রাখতে হবে এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য একযোগে কাজ করতে হবে। কারণ নির্বাচনী ব্যবস্থা নস্যাৎ হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হবে রাজনৈতিক দলগুলোরই। লাভবান হবে সুযোগ-সন্ধানী কুচক্রী মহল। গণতন্ত্রের স্বার্থে এমনটি হতে দেয়া যায় না। যেকোনও মূল্যে সুষ্ঠু নির্বাচনের পথেই সবাইকে এগিয়ে গিয়ে গণতন্ত্রের ধারাকে অব্যাহত রাখতে হবে।

নির্বাচন আর গণতন্ত্রের ফাটল হলে ইংরেজি ‘স্টিক অ্যান্ড ক্যারেট’ থিওরি লক্ষ্য করা যাবে। বাংলায় এটাকে বলা হয় ‘লাঠি ও গাজর তত্ত্ব। একদিকে লাঠি দিয়ে ভয় দেখাবে আর আরেক দিকে গাজরের লোভ দেখিয়ে আয় আয় বলে ডাকবে। কাছে এলে গাজর সরিয়ে লুকানো লাঠি দিয়ে মাথায় আঘাত করবে।

বশ মানানোর জন্য বা শায়েস্তা করার জন্য ইংরেজরা ‘লাঠি ও গাজর তত্ত্ব/‘স্টিক অ্যান্ড ক্যারেট’ থিওরি প্রয়োগ করে থাকে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমন যেন কখনোই না হয়।

পাশাপাশি একচ্ছত্র ক্ষমতাসীন সরকারি দল এবং তাদের একতরফা উল্লাস ও দলীয়করণ গণতন্ত্রের বহুদলীয় শাসনের ক্ষতিও যেন করতে না পারে, সেটাও লক্ষ্য রাখতে হবে। কারণ, যথার্থ বিরোধী দলহীন গণতন্ত্র দুর্বল এবং একদলেরই নামান্তর।

নির্বাচন কলুষিত করে গণতন্ত্রের বিজয় হয়েছে বলা হলে গণতন্ত্রের গুপ্তক্ষতটি আড়াল করা হয়। দুর্বল ও একদল-মার্কা নির্বাচনে গণতন্ত্রের নানাবিধ বিপদ ডেকে আনার রাস্তা তৈরি করা হয়। অতএব, সুষ্ঠু নির্বাচনের লক্ষ্যে সবার আগাম পদক্ষেপই গণতন্ত্রের প্রয়োজনে কাম্য হওয়া উচিত।

লেখক : রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, কবি, অধ্যাপক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
ফেমাসনিউজ২৪/এফএম/এমএম