logo

বৃহস্পতিবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৮ | ২৯ অগ্রহায়ণ, ১৪২৫

header-ad

বিশ্বকাপ ফুটবল, অতএব সাবধান

শামীমুল হক | আপডেট: ১৪ জুন ২০১৮

বিশ্বকাপ উত্তেজনায় কাঁপছে দেশ। প্রতিদিনই তর্কযুদ্ধ চলছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। ব্রাজিল না আর্জেন্টিনা- এ নিয়ে লড়াই শুরু হয়ে গেছে অনেক আগেই। তা চলবে খেলার শেষ পর্যন্ত। খবর বেরিয়েছে গরু বিক্রি করে এক ব্রাজিল সমর্থক কিনেছেন প্রজেক্টর। মেসি, নেইমার, রোনালদো, সালাহ, সুয়ারেজ, জেসুস, মুলার, হিগুয়েন, হ্যারি কেইন, এমবাপ্পের নামে স্লোগান সর্বত্র।

ওরা কি জানে বাংলাদেশে ওদের এতো এতো ভক্ত আছে? ওরা কি জানে বাংলাদেশে ওদের নামে পাগলপারা মানুষ? মোটেও না। আর জানলেইবা কি? ভক্তকেতো আর ওরা পাত্তা দেন না। তাহলে ওদের নামে স্লোগান দেয়ার দরকার কি? তারপরও জানি- পড়ার টেবিল ছেড়ে শিক্ষার্থীরা বসবে টিভির সামনে। অফিস ফাঁকি দিয়ে কেউ কেউ দ্রুত ছুটবে বাসায়।

কেউবা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বড় টিভি বসিয়েছেন। পাড়া-মহল্লার কোথাও কোথাও আবার প্রজেক্টর বসিয়ে খেলা দেখানোর প্রস্তুতি নিয়েছে কেউ কেউ। মাসব্যাপী বিশ্বকাপ আয়োজনে এ প্রজেক্টরে খেলা দেখে শিক্ষার্থীরা কি অর্জন করবে? বাসার বাইরে বন্ধুদের সঙ্গে খোলা মাঠে প্রজেক্টরে খেলা দেখে কি নিয়ে তারা ঘরে ফিরবে?

এমন প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই এসে যায়। রাশিয়া বিশ্বকাপে কে চ্যাম্পিয়ন হবে সেটা জানা যাবে সবার শেষে। ১৬ জুলাই ফাইনালের পর। কিন্তু এ নিয়ে এখনই ঘরে ঘরে, বন্ধু আর বন্ধুতে, পিতা-পুত্রে, মা-মেয়েতে, পাড়ায়-পাড়ায় বিভক্তি। একজন ব্রাজিলকে সাপোর্ট করলে অন্যজন আর্জেন্টিনা। আবার কেউ কেউ জার্মান কিংবা অন্যদলকে সাপোর্ট করে।

এ সাপোর্ট যদি সীমার মধ্যে থাকে তাহলে ভালো। কিন্তু পরিবেশতো তা বলছে না। কথায় বলে, বাঙালি অনুকরণের জাতি। অমুকে তা করেছে আমাকেও তা করতে হবে। যেমন ধরুন- একদিন সকালে ক'জন মানুষ দিগম্বর হয়ে রাস্তায় হাঁটছে। তাদের অনুকরণ করে পরদিন দেখা যাবে দলে দলে লোক দিগম্বর হয়ে হাঁটছে।

তাদের কথা- এটাই একটা স্টাইল। এরই মধ্যে বাংলাদেশের আকাশে তাকালে দেখা যায় ভিনদেশি পতাকায় ছেয়ে গেছে। রিতিমতো প্রতিযোগিতা পতাকা টাঙানোর। পতাকা টাঙাতে গিয়ে বিদ্যুতের তারে জড়িয়ে মারা যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। আসলে বাঙালি আবেগপ্রবণ।

এ আবেগে নিজ সমর্থিত দল হেরে গেলে কেঁদে বুক ভাসায়। আবার কেউ আত্মহত্যাও করে। নিজ দলের জয়ের খবরে অতি আনন্দে হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হওয়ার খবর বিগত দিনে শোনা গেছে। তারপরও চার বছর পর পর আসে বিশ্বকাপ ফুটবল। বাংলাদেশ এ পর্যন্ত বিশ্বকাপ আসরে খেলার সুযোগ না পেলেও এ দেশের মানুষ বিশ্বকাপকে ঘিরে যে স্বপ্ন দেখে তা বিরল।

বিশ্বের আর কোনো দেশের মানুষের এতো সময় নেই। তাদের এতো শখও নেই। এমন উত্তেজনা অন্য কোথাও নেই। এরই মধ্যে এএফপি এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বিশ্বকাপ উন্মাদনা সহিংসতায় রুপ নিয়েছে।

এএফপি বলেছে, বাংলাদেশে উন্মত্ত এক নেশা তৈরি করেছে ফুটবল বিশ্বকাপ। ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার সমর্থকদের মধ্যে বেধেছে সংঘর্ষ। সব জায়গায় শোভা পাচ্ছে দু’দেশের পতাকা। এর মাত্রা এতই বেশি যে, কিছু মানুষ ভিনদেশী পতাকা উড়ানো নিষিদ্ধ করার দাবি জানিয়েছেন।

বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অনুপস্থিতি ও বহুল সমর্থিত দক্ষিণ আমেরিকার দুই দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সরাসরি সম্পর্ক না থাকার পরও বিশ্বকাপ জ্বরে কাঁপছে এখানকার ফুটবলপ্রেমীরা। গত সপ্তাহে একটি শহরে লিউনেল মেসি ও নেইমারের সমর্থকরা পরস্পরের ওপর চাপাতি নিয়ে ঝাপিয়ে পড়ে। এতে এক ব্যক্তি ও তার সন্তান গুরুতর আহত হয়।

বাংলাদেশের জাতীয় ফুটবল দল বিশ্বকাপে অংশ নেয়ার যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি। মোট ২১১ দেশের মধ্যে র‌্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ১৯৪ তম। বিশ্বকাপ শুরুর কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই ১৬ কোটি মানুষের দেশে কর্তৃত্ব করছে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের পতাকা।

দলকে শুভকামনা জানিয়ে পতাকা মিছিল করেছে দুই দলের সমর্থকরা। বিভিন্নস্থানে কয়েকশ' সমর্থক মোটরসাইকেল র‌্যালি করেছে। তবে কিছু বাংলাদেশি আবার এই উত্তাপ থেকে নিষ্কৃতি চান। একজন আইনজীবী বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী দলগুলোর পতাকা উড়ানো নিষিদ্ধ করতে আদালতের শরণাপন্ন হন।

ভিন্ন দেশের পতাকা না উড়ানোর জন্য ৭ হাজার শিক্ষার্থীকে নির্দেশ দিয়েছে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এসএম ইমামুল হক বলেন, সরকারের উচিত বাংলাদেশে কোনো বিদেশি পতাকা উড়ানো পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা। বাংলাদেশ কখনোই ফুটবল বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেনি। ভবিষ্যতে খেলার সুযোগ পাবে এমন সম্ভাবনাও কম।

তা সত্বেও চার বছর পর পর বিশ্বকাপকে ঘিরে দেশ উন্মত্ত হয়ে ওঠে। ১৯৮৬ সালে দিয়াগো ম্যারাডোনা যখন অসাধারণ ক্রীড়া নৈপুণ্যে আর্জেন্টিনাকে চ্যাম্পিয়ন করেন, তখন থেকে বাংলাদেশে দক্ষিণ আমেরিকার দুই দেশকে নিয়ে দ্বন্দ্ব চলে আসছে।

ক্রীড়াবিষয়ক একটি অনলাইন পোর্টালের সম্পাদক এমএম কায়সার বলেন, এখানে পেলে একটি পারিবারিক নাম ছিল। তার গল্প আমরা পাঠ্যবইয়ে পড়েছি। তাই ব্রাজিল সমর্থনের একটি প্রথাগত ভিত্তি রয়েছে। কিন্তু ১৯৮৬ সালে ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনা বাংলাদেশিদের মন জয় করে নেয়। তখন থেকেই এই দুই দল নিয়ে দ্বন্দ্ব শুরু হয়।

তবে বাংলাদেশের ফুটবল উন্মাদনা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন সমাজবিজ্ঞানীরা। তাদের একজন এ বিষয়টিকে ‘ইনফেরিওরিটি কমপ্লেক্স’ আখ্যা দিয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক নেহাল করিম বলেন, এসব মানুষের অনেকই জানেন না যে, আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল কোথায়। এ দুই দেশের সঙ্গে তাদের রক্তের বা ভাষাগত কোনো সম্পর্ক নেই। তার পরেও এদের জন্যে তারা পাগল। এটার কারণ আমি বুঝি না। বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য মোকাদ্দেম হোসেন এটিকে বিশ্বায়নের প্রভাব বলেছেন।

যা হোক, অভিভাবকদের এক্ষেত্রে সচেতন হতে হবে। সন্তান অতি আবেগে দিশেহারা যেন না হয়। ঘরে বসে খেলা দেখা ভালো। বন্ধুদের আড্ডায় খেলা দেখতে যাওয়া ভয়ঙ্কর কিছু ঘটে যেতে পারে। পক্ষ বিপক্ষ নিয়ে হয়ে যেতে পারে অপ্রত্যাশিত ঘটনা। অতএব সাবধান।
ফেমাসনিউজ২৪/এফএম/এমএম