logo

বুধবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৮ | ২৮ অগ্রহায়ণ, ১৪২৫

header-ad

বাংলার মানচিত্রে সরকারি কর্মকর্তার সফলতা

আখতার-উজ-জামান | আপডেট: ২৩ জুলাই ২০১৮

বর্বরোচিত হিংস্রতার পরও বাঙ্গালী চেতনাবোধকে ধ্বংস করতে পারেনি হিংস্র পাকিস্তান। দীর্ঘ সাড়ে নয় মাস এই পাকহানাদার বাহিনী একের পর এক অত্যাচার নিপীড়ন চালাতে থাকে বাংলাদেশের নিরীহ মানুষের ওপর। তাদের এই লোমহর্ষক বর্বরতা কখনো ভুলে যাবার মতো নয়। এতো লাঞ্ছনা আর বঞ্চনা সহ্য করে আজকের এই স্বাধীন-স্বার্বভৌম বাংলার মানচিত্র দেখার স্বাদ পেয়েছে সাড়ে ষোল কোটি বাঙ্গালী। নিপাত হয়েছে ক্ষমতালোভী আর মায়ের ভাষা বিরোধী নরপিশাচ পাকিস্তানী হায়েনাদের। সব ষড়যন্ত্রের জাল পুড়িয়ে দিয়েছে এদেশেরই তরুণ সমাজ থেকে শুরু করে সর্ব বয়সী বাঙ্গালী চেতনার জনগন। বিধাতার অপরূপ দৃষ্টি থেকে ধ্বণিত হতে থাকে সাড়ে সাত কোটি বাঙ্গালীর আর্তনাদ বাংলাদেশ যে স্বাধীনতা আর মায়ের ভাষায় কথা বলতে পারে। কেননা মহান সৃষ্টিকর্তা তাঁর সেরা জীবের সব ভাষা বুঝতে পারে।

মজলুম নেতা মাওলানা ভাসানী, শহীদ সোহরাওয়ার্দীসহ খ্যাতমান রাজনীতিদরা অনায়েসে সেদিন বলেছিলেন এই মুজিব-ই-বাংলার অহংকার আর ত্যাগী নেতা। জাতির জনক মধুমতি আর বাঘিয়ার নদীর তীরে এবং এই হাওড়-বাঁওড়ের মিলনে গড়ে ওঠা বাংলার অবারিত প্রাকৃতিক পরিবেশে জন্ম নেয়া শেখ মুজিবুর রহমান-স্বাধীন বাংলার মহীয়ান। এই প্রজন্মের একজন বাঙ্গালী হিসেবে কথাটি আমার মনে প্রাণে ভেসে উঠে বারংবার এই মানুষটির নাম।

বাংলার ইতিহাসের ৭, ১৭ ও ২৬ মার্চের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধুকে শুধু রাজনৈতিক দিক থেকে বিবেচনা করলে চলবে না। এই মহান মানুষটি আবহমান বাংলার রূপ বৈচিত্র্যের সাথে পুরোপুরি মিশে আছেন দেশপ্রেমিক শিল্পী হিসেবে। গুরুত্বপূর্ণ এই মাসটিকে আমরা সবাই আরো বেশী স্মরণ করবো এই ত্যাগী নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কথা। যাঁর অগ্রণী ভূমিকা পালনে স্বাধীন ইতিহাস এক বিরল সাক্ষী আজকের এই বাংলাদেশ। তাই নতুন প্রজন্মের বোঝা উচিত যে, স্বাধীনতা মানে শুধু পরাধীনতা থেকে মুক্তি নয়, নতুন একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আয়োজনও শুধু নয়।

তাই বাংলা ভাষার মাতৃভূমিটির প্রতি মহান আল্লাহপাক রাব্বুল আলআমীনের দৃষ্টি ছিল পাকিস্তানের কবল থেকে এই বাংলাদেশ স্বাধীনতার ছোঁয়া পাক। স্বাধীন আর গৌরবময় বাংলাদেশের একজন নাগরিক হিসেবে আমি বরবারই বাংলার ইতিহাসকে মনে প্রাণে বিশ্বাস স্থাপন করে আমার লেখনিতে ঐতিহাসিক যুক্তিগুলো একই রূপে ধারণ করে থাকি। তাই এই ত্যাগ তিতীক্ষার স্বাধীন বাংলাদেশকে সঠিকভাবে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে আমি সদা সচেষ্ট।

আর তেমনি এবার এমন একজন মানুষকে খুঁজে পেলাম, যিনি বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণকে জাতীয় দিবস হিসেবে দেখতে স্বপ্নে বিভর হয়ে থাকেন সব সময়। মোঃ কামরুল আহসান তালুকদার। তিনি বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে লালন করে একাই প্রায় কোটি বাঙ্গালীর মাঝে পৌঁছে দিতে চেয়েছেন ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণকে একটি জাতীয় দিবস হিসেবে স্বীকৃতি হিসেবে। ছাত্রজীবনে যেমন ছিলেন মেধাবী, তেমনি ছাত্র রাজনীতিতেও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে সর্বদা সচেষ্ট ছিলেন ৭ মার্চের ভাষণ চর্চার মধ্য দিয়ে। সত্যিই এই মেধাবী বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ চর্চার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিস্তার নামে একটি কর্মসূচি গত ২০১৭’র ২৫ জানুয়ারী ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলায় নিজ উদ্যোগে শুরু করেন ‘বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ উৎসব।

যদিও মোঃ কামরুল আহসান তালুকদার কর্মজীবনে তাঁর এটি ছিল দ্বিতীয় কর্মস্থল। তখন তিনি এ উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এই সাহসী সরকারী কর্মকর্তার মহৎ উদ্যোগের কারণে ভালুকা উপজেলায় কয়েক হাজার শিক্ষার্থী এখন ‘খুদে বঙ্গবন্ধু’তে পরিণত হয়েছে। যারা ভাষণটি মুখস্থ বলতে পারেন, অবিকল বঙ্গবন্ধুর আদলে। এই উপজেলার চার শতাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এক লাখ ছাত্র-ছাত্রীর মাঝে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিস্তারের লক্ষ্যে ৭ মার্চের ভাষণের সিডি এবং লিখিত পাঠ বিতরণ করা হয়। সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে প্রাইমারী, মাধ্যমিক, কলেজ এবং মাদ্রাসা পর্যায়ে বিভক্ত করে উৎসবের কর্মসূচী ঘোষণা করা হয়।

প্রথমে স্কুল পর্যায়ে, দ্বিতীয় পর্বে ইউনিয়ন পর্যায়ে এবং চূড়ান্ত পর্বে উপজেলা পর্যায়ে বাচনভঙ্গি, উচ্চারণ, অঙ্গভঙ্গি অনুসরণ করে ছাত্র-ছাত্রীরা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে। উৎসবের প্রস্তুতিপর্ব থেকেই ভালুকা উপজেলার ৫ লাখ মানুষের মধ্যে ব্যাপক সাড়া পড়ে যায়। শিক্ষার্থীদের মধ্যে ইতিবাচক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। ছাত্র, শিক্ষক, অভিভাবক, কর্মকর্তা সবাই ভাষণটি বারবার দেখে ও শুনে রপ্ত করে। আর এ আয়োজনে উৎসুক উপজেলার সকল জনপ্রতিনিধি সক্রিয় অংশগ্রহণ ও সহযোগিতা করে। যার প্রেক্ষাপটে এক লাখেরও বেশি ছাত্র-ছাত্রী ভাষণটি আত্মস্থ করে এবং কয়েকশো ছাত্র-ছাত্রী ভাষণটি পুরো মুখস্থ বলতে পারে। উপজেলা পর্যায়ে বিজয়ী ১২জন শিক্ষার্থীকে আকর্ষনীয় পুরস্কার ও সনদপত্র দেয়া হয়।

আর এরই মাঝে শিক্ষার্থীদের মাঝে এক অভূতপূর্ব দেশাত্মবোধ জাগ্রত হয়। এই অনুশীলন যাতে অব্যাহত থাকে সেজন্য যে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভাষণের সিডি ও লিখিত পাঠ সরবরাহ করা হয়, সে সকল প্রতিষ্ঠানে জরিপ করে দেখা যায় যে, শতকরা ৯৫ ভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ৭ মার্চের ভাষণের সিডি সংরক্ষিত আছে এবং সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জাতীয় দিবসসহ গুরুত্বর্পূণ সকল কর্মসূচীতে ৭ মার্চের ভাষণ প্রচার এবং ভাষণের উপর বিশেষ আলোচনা হয়ে থাকে। পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ বিশ্ব প্রামাণ্য দলিল হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার নয় মাস পূর্বে এ আয়োজন করা হয়। ৭ মার্চকে জাতীয় ভাষণ দিবস এবং ৭ মার্চের ভাষণকে জাতীয় ভাষণ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদানের জন্য ২৫ জানুয়ারী, ২০১৭ সালে যথাযথ কর্তৃপক্ষ বরাবর পত্র প্রেরণ করা হয়।

প্রসঙ্গত সাবেক এই সৎ ও মেধাবী ছাত্রনেতা মোঃ কামরুল আহসান তালুকদারের এই মহৎ উদ্যোগের প্রায় নয়মাস পর চলতি বছরের ৩০ অক্টোবর ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দেওয়া ৭ই মার্চের ভাষণ। বর্তমানে তিনি ২৫তম বিসিএস ব্যাচের প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা। মোঃ কামরুল আহসান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা থাকাকালে অনুমতির জন্য জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে প্রস্তাব পাঠান।

মৌখিক অনুমতি মেলার পরই তিনি ভালুকা উপজেলা ও পৌরসভার ৪ শতাধিক কিন্ডার গার্টেনসহ প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের কয়েক হাজার শিক্ষার্থীর মাঝে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ নিয়ে প্রতিযোগিতার আয়োজন করেন। কয়েক মাস পর উপজেলা পরিষদ চত্বরে সেরা ভাষণদাতা হিসেবে ১২ জনকে নির্বাচিত করা হয়। তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয় পুরস্কার ও ক্রেস্ট। এই ব্যতিক্রমী উদ্যোক্তা বলেন আমি বিশ্বাস করি একদিন দেশে মিলবে ৭ মার্চ ভাষণ দিনটির জাতীয় স্বীকৃতি। আর এই স্বীকৃতির ফসল বুনলেন এই মেধাবী ছাত্র ও বর্তমান গণপ্রজান্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব।

সোমবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ‘জাতীয় পাবলিক সার্ভিস দিবস’ উপলক্ষ্যে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ৩৯ ব্যক্তি ও ৩ প্রতিষ্ঠানকে ‘জনপ্রশাসন পদক-২০১৮’দেওয়া হয়। এতে বাংলার অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাহসী কন্যা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই সাহসী সরকারী কর্মকর্তা মোঃ কামরুল আহসান তালুকদার তাঁর বিশেষ অবদানের জন্য হাতে তুলে দেন সাফল্যের পুরস্কার। আর জননেত্রীর হাতে এইভাবে আরো মূল্যায়িত হবে বাংলার নতুন প্রজন্মের সকল সাফল্য অর্জনকারী স্বাধীন, স্বার্বভৌমত্ব রক্ষাকারী মানুষেরা।

স্বাধীনতা হলো- স্বাধীন রাষ্ট্রে সার্বভৌম জাতি হিসেবে টিকে থাকার আয়োজন। স্বাধীনতা মানে ইচ্ছার স্বাধীনতা, রাজনীতির স্বাধীনতা এবং অবশ্যই অর্থনৈতিক মুক্তি। বঙ্গবন্ধু ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণে স্পষ্টভাবেই উচ্চারণ করেছিলেন, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম। মোঃ কামরুল আহসান তালুকদারের মতো ১৮ কোটি বাঙ্গালীর একজন প্রতিনিধি হিসেবে তাঁর এই মহান উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। বাংলার এই মুক্তির সংগ্রামে জয়ী হওয়ার লক্ষ্যে আমাদের তরুণ প্রজন্ম একাত্তরের মুক্তিসংগ্রামীদের মতোই স্বপ্ন ও সাহস এগিয়ে আসুক, এটিই আমাদের প্রত্যাশা।

লেখক: গবেষক, সাংবাদিক
e-mail: [email protected]

ফেমাসনিউজ২৪.কম/কেআর