logo

বুধবার, ১৫ আগস্ট ২০১৮ | ৩০ শ্রাবণ, ১৪২৫

header-ad

এদেরই বলে জানোয়ার

শামীমুল হক | আপডেট: ০২ আগস্ট ২০১৮

জানোয়ার ড্রাইভার। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীকে চাপা দিয়ে চলে গেল সবার সামনে দিয়ে। একটুও বুক কাঁপেনি ওর। চালক নামের এসব জানোয়ারের পক্ষ নিয়ে এদেশে মন্ত্রীও কথা বলেন। হাসিমাখা মুখে সাফাই গায় ভারতে ৩৩ জন মারা গেলেও কোনো হইচই হয় না বলে দম্ভোক্তি করেন।

সহপাঠীদের মৃত্যু শোকে যখন শিক্ষার্থীরা রাজপথে তখন মন্ত্রীর এ কথা ওদের বুকে বিঁধে তীরের মতো। যন্ত্রণা বাড়িয়ে দেয় বহুগুণ। ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। ফেসবুকে নির্লজ্জ হাসি দেখে বুকের আগুন দাউ দাউ জ্বলে ওঠে। নেমে আসে রাজপথে, বিক্ষোভে ফুঁসে ওঠে। মুখে প্রতিবাদী স্লোগান।

যে যেভাবে পারে প্ল্যাকার্ড নিয়ে রাজপথে দাঁড়িয়েছে। দাবি তাদের যন্ত্রদানবের বিরুদ্ধে। প্রতিদিন যন্ত্রদানবের চাকায় পিষ্ট হয়ে অকালেই ঝরছে একের পর এক প্রাণ। অবস্থা এখন সীমা ছাড়িয়ে গেছে। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। এখন আর পেছনে ফেরার কোনো পথ নেই। তাই সহপাঠীর মৃত্যুর প্রতিবাদ জানাতে কলেজ ছেড়ে শিক্ষার্থীরা নেমে এসেছে রাজপথে।

নটরডেম কলেজ, সরকারি বিজ্ঞান কলেজ, সিটি কলেজসহ রাজধানীর নামিদামি কলেজের ছাত্ররা রাজপথে দাঁড়িয়ে কাঁদছে। দাবি জানিয়েছে ঘাতক চালকের বিচারের। এরই মধ্যে গতকাল বুধবার ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের শনির আখড়ায় একটি পিকআপ ভ্যান আন্দোলনরত শিক্ষার্তীর উপর দিয়ে চলে যায়।

এ খবর ছড়িয়ে পড়লে ক্ষোভে যেন ঘি ঢালার মতো হয়। বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা গাড়ি ভাঙচুর করে। ওদিকে তাদের দমন করতে রাজপথে নামে পরিবহন শ্রমিক। সঙ্গে পুলিশও। শিক্ষার্থীদের দাবি অযৌক্তিক নয়। তাদের দাবি সড়কে নিরাপদে চলা। এ দাবিতেই তারা নানা ধরনের স্লোগান সংবলিত প্লেকার্ড বহন করে।

একজনের হাতে থাকা প্ল্যাকার্ডে স্লোগান ‘আমরা ৯ টাকায় এক জিবি চাই না, নিরাপদ সড়ক চাই।’ তাদের মুখে উচ্চারিত হয়েছে ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস, উই ওয়ান্ট জাস্টিস।’ স্লোগানে স্লোগানে উত্তাল ঢাকার মিরপুর, মতিঝিল, উত্তরা, সায়েন্সল্যাব এলাকা, ফার্মগেট, বিমানবন্দর সড়কসহ গোটা ঢাকাই বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের দখলে।

সহপাঠীর মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করছিল শিক্ষার্থীরা। রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নটরডেম কলেজের শিক্ষার্থীরা এই প্রথম কোনো দাবি নিয়ে রাজপথে নেমেছে। সড়ক দুর্ঘটনার ভয়াবহতা থেকে দেশকে বাঁচাতে শিক্ষার্থীরা বিভিন্নস্থানে সড়ক অবরোধ করে। তারা নৌমন্ত্রীর পদত্যাগ, ঘাতক বাসচালকের ফাঁসি, দুর্ঘটনাস্থলে স্পিডব্রেকার তৈরি, নিহত শিক্ষার্থীদের ক্ষতিপূরণসহ নয় দফা দাবি তুলে ধরে।

গত রোববার রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে বাসের জন্য অপেক্ষারত শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই ছাত্রছাত্রীকে হত্যা করে। এ ঘটনায় ১২ জন আহত হয়। এ ঘটনা দেশজুড়ে আলোচনায় আসে। ওই দিনই সচিবালয়ে নৌমন্ত্রী শাজাহান খানের বক্তব্য হাসিমুখে দেয়া ভারতের উদাহরণে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে শিক্ষার্থীসহ অভিভাবকরা।

এরই ধারাবাহিকতায় রাজধানীর বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীরা রাজপথে নেমে আসে। কোথাও কোথাও বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশ হামলা চালায়। অহিংস আন্দোলনে পুলিশের হামলা নিয়েও বিক্ষোভ করে শিক্ষার্থীরা। শোকাহত শিক্ষার্থীদের হাতে থাকা প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল- ‘টনক কবে নড়বে তোমাদের’, ‘আর কত মায়ের বুক খালি হলে তোমরা শান্ত হবে’, ‘আমরা সবাই মরতে রাজি, তবুও বিনা বিচারের সংস্কৃতি মানতে রাজি নই’, ‘এমন দুর্ঘটনার পরও নৌমন্ত্রীর হাসিমাখা প্রতিক্রিয়ার কারণ কি?’, ‘সন্তান হত্যার বিচার চাই’, ‘লাশের গন্ধ বাতাসে’, কে সে নরপিশাচ আজো হাসে’।

শহীদ রমিজ উদ্দিন কলেজের শিক্ষার্থীরা বিমানবন্দর সড়কে কালোব্যাজ ধারণ করে মানববন্ধন করেছে। শনিরআখড়ার দনিয়া বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের শিক্ষার্থীরাও কলেজ ছেড়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে মানববন্ধন করে। বাসচাপায় নিহত দিয়ার পিতা ত্রিশ বছর ধরে বাস চালান। তিনি ঘোষণা দিয়েছেন আর কখনোই বাস চালাবেন না। স্টিয়ারিং ধরবেন না।

এমন করুণ মৃত্যুতে কাঁদছে গোটা দেশ। পথেঘাটে, হাটবাজারে এখন আলোচনায় ওঠে আসছে মর্মান্তিক এ মৃত্যুর কথা। সবার কথা এমন মৃত্যু আর দেখতে চাই না। তাই তো তরুণ কলেজ শিক্ষার্থীর করুণ আকুতি ‘আমরা ৯ টাকায় এক জিবি চাই না, নিরাপদ সড়ক চাই।’ অবুঝ এ শিক্ষার্থী যখন রাজধানীর রাজপথে এ প্ল্যাকার্ড নিয়ে দাঁড়িয়েছিল তখন কুমিল্লায় বাসের চাপায় নিহত হয়েছে আরেক কলেজ শিক্ষার্থী।

সড়ক দুর্ঘটনা রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে দ্রুত বসা হোক। সড়ক দুর্ঘটনা শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনতে যা যা করা প্রয়োজন শিগগিরই তা করা হোক। এমন বিমর্ষ, মর্মান্তিক অঘটন আর নয়। এখনই এর প্রতিকারে ব্যবস্থা নেয়া হোক।
ফেমাসনিউজ২৪/এফএম/এমএম