logo

বুধবার, ২১ নভেম্বর ২০১৮ | ৭ অগ্রহায়ণ, ১৪২৫

header-ad

সাবাস ইমরান খান

অধ্যাপক নূরুল আমিন চৌধুরী | আপডেট: ০৭ আগস্ট ২০১৮

কিংবদন্তী ক্রিকেটার হিসেবে ১৯৭২ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত সর্বকালের অন্যতম বিশ্বসেরা অল রাউন্ডার ক্রিকেট জগতের বরপুত্র ইমরান খানকে বলা হত স্বপ্নের রাজকুমার। তার নাম উচ্চারিত হতেই বিশ্বের যেকোন খেলোয়াড় প্রেমীর মানসপটে ভেসে উঠত মায়াবী সুদর্শন দৃষ্টিনন্দন এক যুবা পুরুষের অবয়ব। যে কিনা ক্রিকেট মাঠের দর্শকদের বিমোহিত করত বিস্ময়কর শৈল্পিক ভঙ্গিমায় ব্যাট কিংবা বলের যাদুকরী নিপুণতা প্রদর্শন করে। ১৯৯২ সালে বিশ্বকাপ জয়ের মাধ্যমে পাকিস্তানের খেলোয়াড়ী ভাবমূর্তিকে অন্য এক মাত্রার উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। সেই দিনেও পাকিস্তানব্যাপী আনন্দ-উচ্ছ্বাসের জোয়ার বইয়ে গিয়েছিল।

এদিকে সমগ্র পাকিস্তান যখন সহিংস রাজনৈতিক কোন্দল ও দুর্নীতিতে আকষ্ঠ নিমজ্জিত। এমনই সময়ে গত ২৫শে জুলাইয়ের নির্বাচনে ইমরান খানের দলের বিশাল বিজয় পাকিস্তানব্যাপী তার সমর্থক ও শুভাকাঙ্খীদের মধ্যে বিশ্বকাপ জয়ের দিনের মতোই আনন্দ-উচ্ছাসের বন্যা বয়ে যায়। তিনি অবাক বিষ্ময়ে প্রমান করে দিলেন, তিনি পাকিস্তানের নাজুক রাজনীতির মাঠে অনেক শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে দাবড়িয়ে সেরাদের সেরা হওয়ার যোগ্যতায় ও কোন অংশে কম না।

ইমরান খানের রাজনৈতিক শ্লোগান হল- “রোড টু নয়া পাকিস্তান”। কলুষিত ও সহিংস রাজনীতি ও দুর্নীতির মাধ্যমে যারা পাকিস্তানকে নাপাকিস্তানে পরিণত করেছে, ভোটের মাধ্যমে তাদের মুখে চপেটাঘাত করে বিজয় ছিনিয়ে নিয়ে নয়া পাকিস্তানের যাত্রা পথকে ইমরান খান কতটুকু নিষ্কন্টক করতে পারেন- এখন তা ই দেখার বিষয়। যদি তা করতে পারেন তাহলে তিনি হলে উঠবেন ইতিহাসের সেরা খেলোয়াড় থেকে সেরা রাজনীতিবিদ। তবে তিনি সফল হবেন বলে আশা করার ২/১টি কারণ উল্লেখ করছি:

১। শিক্ষাগত যোগ্যতার দিক থেকে তার রয়েছে বিশ্বসেরা অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিন তিনটি উচ্চতর ডিগ্রি (দর্শন, রাজনীতি ও অর্থনীতি) যা একটি দেশের সরকার পরিচালনার জন্যে অপরিহার্য।
২। মাঠ পর্যায়ের রাজনীতির ক্ষেত্রে ১৯৯৬ সালে “তেহরিক ই-ইনসাফ” নামে দল গঠন করে সঙ্কট-সঙ্কুল পাকিস্তানের রাজনীতিতে পদার্পন করে বহু বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে অনলস লেগে থেকে দীর্ঘ বিশটি বছর সংগ্রাম করে দেশের সিংহভাগ মানুষের আস্থা অর্জন করে ভোট যুদ্ধে বিজয় লাভে সক্ষম হয়েছেন।
৩। বয়স ও শারীরিক সক্ষমতহার দিক দিয়েও ৬৫ বছর বয়সেও যথেষ্ঠ ফিট আছেন।
৪। ভোটে বিজয় লাভের পর প্রদত্ত প্রথম ভাষণটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও প্রনিধান যোগ্য।

তিনি বলেছেন, ২২ বছর আগে আমি রাজনীতি শুরু করেছিলাম এ জন্যে যে, আমাদের আসল সম্ভাবনার কথা কেউই উপলব্ধি করতে পারছে না। আমি বড় হবার সঙ্গে সঙ্গে নিজের চোখে পাকিস্তানকে খানখান হয়ে ভেঙ্গে যেতে দেখেছি। আমার প্রেরণা হল আমাদের নবী (সা:) যিনি কল্যাণ রাষ্ট্রে বিশ্বাসী ছিলেন। কিন্তু আমরা কল্যাণ রাষ্ট্রের বিপরীত একটা দেশে পরিণত হয়েছি। যে রাষ্ট্র দারিদ্রের দরিয়ায় ডুবে আছে। তাই, আমি এমন এক নয়া পাকিস্তানের স্বপ্ন দেখি, যেখানে দুর্বল, নিগৃহীত এবং নিপীড়িত মানুষের সহায় হবে রাষ্ট্র। যেখানে মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ হবে। মেধার মূল্যায়ন হবে এবং যেখানে যতটুকু দেওয়া উচিত ততটুকু সাহায্য করবে কল্যাণ রাষ্ট্র। আমরা দুর্নীতির শেকড় উৎপাটন করব। বানিজ্য ও বিনিয়োগের উপযুক্ত পরিবেশ গড়ে তুলব। আইনের প্রয়োগ হবে সবার জন্যে সমান। জবাবদিহিতা শুরু হবে আমাকে দিয়েই। তারপর আমারা মন্ত্রীদের এবং এভাবে সবার।

এটাতো ঠিক যে, কল্যাণ রাষ্ট্রে বিশ্বাসী আমাদের নবীজীর আদর্শ পথে কখনো পাকিস্তানের রাজনীতিকে হাটতে দেওয়া হয়নি। ইমরান খান তার বড় হবার সাথে সাথে স্বার্থবাজ রাজনীতিবিদ ও ক্ষমতা লোভী পাকিস্তানী খানসেনাদের দৌরাত্ম্যে পাকিস্তানকে ভেঙ্গে খান খান হয়ে যেতে দেখেছেন। এটা খুবই দুঃখের বিষয়। আমি যখন হাই স্কুলে পড়তাম (৬১ থেকে ৬৫ সাল) তখন আমাদের ক্লাশ শুরুর পূর্বে আমরা সারিবদ্ধভাবে উত্তোলিত জাতীয় পতাকাকে সম্মান প্রদর্শনপূর্বক সমস্বরে পাকিস্তানের জাতীয় সঙ্গীত গাইতাম। (আমি ভোকাল নীড করতাম)।
উড়াও, উড়াও, উড়াও আজি কওমী নিশান।
চাঁদ-তারা-সাদা আর সবুজ মিশান ............।
পূরব বাংলার শ্যামলিয়ায়
পঞ্চ নদীর তীরে অরুণিমায়
ধুসর সিন্ধুর মরুসাহারায়
ঝান্ডা জাগে যে আজাদ............।

তখন আমাদের বালক বয়সের মানসপটে আমাদের সুজলা সুফলা শষ্য শ্যামলা বাংলাদেশের থেকে হাজার মাইল দূরত্বের ধুলি-ধূসর সিন্ধুর মরু-সাহারার একটা আবছায়া আবহ সৃষ্টি হত এবং এতে আমরা পুলকিত বোধ করতাম এই ভেবে যে, আমরা এমনই একটা বিচিত্র দেশের সন্তান। কিন্তু ২৩ বছর যেতে না যেতেই ধুরন্ধর স্বার্থপর রাজনীতিবিদ ও ক্ষমতালোভী পাকিস্তানী খানসেনাদের অপরিনামদর্শী হঠকারীতার কারণে আমাদের সঙ্গে এক ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাদের পাকিস্তান খান খান হয়ে গেল। পরিণামে আমরা পেলাম একটা সার্বভৌম স্বাধীন রাষ্ট্র। তাই বলি ‘সাবাস ইমরান খান’! ক্রিকেট মাঠ দাবড়ানোর মতো পাকিস্তানের ঝঞ্ঝা বিক্ষুব্ধ রাজনীতির মাঠে শক্তিমান প্রতিপক্ষদের দাবড়িয়ে ভোটের রাজনীতিতে যেভাবে বিজয় ছিনিয়ে সফল হয়েছেন, বিশ্ববাসী চায় আপনার সফল নেতৃত্বে বেচারা পাকিস্তানীরা যেন আপনার দেখানো স্বপ্নের সত্যিকারের বাস্তবায়ন দেখতে পায়।

গুজব চলছে যে,আপনি সেনাবাহিনীর মদদে ভোটে জিতেছেন। যদি তা হয়েও থাকে, আশাকরি কৌশরী খেলোয়াড়ের মতোই আপনি ক্ষমতায় গেলে সেনাবাহিনীর কুট-কৌশল বুঝে “সাপ ও মরে, লাঠিও না ভাঙ্গে”- এই সাবধানী কৌশল গ্রহণ করে সরকার পরিচালনা করে জনগনকে প্রদত্ত স্বপ্ন পূরণে সাহায্য করবেন এবং পাকিস্তানের রাজনীতিতে অসামান্য অবদান রাখতে সক্ষম হবেন। আপনি হয়ে উঠবেন আর একজন মাহাথির মোহাম্মদ। বিরুদ্ধ শক্তির মোকাবিলা করার পাশাপাশি আপনার নয়া পাকিস্তান গড়ার পথে যেন আপনাদের নাকলম্বা সেনাবাহিনী কোনভাবে নাক গলিয়ে আপনাকে যেন থমকে দিতে না পারে সে দিকে সর্তক দৃষ্টি রাখবেন। ভোটে জেতানোতে যদি সত্যিই সেনাবাহিনী আপনাকে সাহায্য করে থাকে। আশা করি সরকার পরিচালনায় ও তারা আপনাকে সাহায্য করবে যদি ওয়াদা অনুযায়ী আপনি সঠিক পথে থাকেন। সেনাবাহিনী যদি সত্যিকারের দেশপ্রেমী হয়ে দেশের উন্নয়নে আপনাকে সাহায্য করে তবে তা হবে সোনায় সোহাগা।

যে কয়েকটা বিষয় আপনার সাফল্যে সহায়ক হবে সেগুলো হল- প্রতিবেশী দেশ সমূহের সঙ্গে কুটনৈতিক ও বৈদেশিক নীতিতে সম্পর্কোন্নয়ন। যুদ্ধ নয়, শান্তি ও সম্প্রীতির নীতি গ্রহণ। সার্ক রাষ্ট্রসমূহের সঙ্গে সম্পর্ক বৃদ্ধি করে দক্ষিষ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে স্থিতিপূর্ণ শান্তি ও উন্নয়ন নিশ্চিত করনে ভূমিকা রাখা। পাকিস্তানের কাছে বাংলাদেশের পাওনা মিটিয়ে দেওয়া। বাংলাদেশে অবস্থানরত পাকিস্তানীদের প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা করা। বাংলাদেশকে পুনরায় পাকিস্তানের কাঠামোয় ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্ঠাকে সমূলে প্রতিহত করা এবং অনেক কষ্টে অর্জিত একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের সঙ্গে সু-সম্পর্ক বজায় রাখা।

আমরা বাংলাদেশীরা সর্বান্তকরণে আপনার ‘নয়া পাকিস্তান’ গড়ার অঙ্গীকারকে স্বাগত জানাই এবং অস্থিতিশীল পাকিস্তানকে স্থিতিশীল শান্তিপূর্ণ একটি উন্নত কল্যাণ রাষ্ট্র হিসেবে পরিণত করতে আপনার প্রয়াস যেন সার্বিক ভাবে সফল হয় এই কামনা করি। আমরা চাই বিশ্বসেরা নন্দিত ক্রিকেট তারকার মতো পাকিস্তানের রাজনীতিতে ও আপনি সাফল্য লাভ করে নন্দিত হোন। শেষ করছি- “রোড টু সোয়াত” নামক বিখ্যাত একটা পাকিস্তানী চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় একটি একটি গানের কলি দিয়ে ‘চালো হে দিলওয়ালে রোড টু সোয়াত”। সুতরাং, “চলো হে দিলওয়ালে রোড টু নয়া পাকিস্তান”।

লেখক: সাবেক অধ্যক্ষ, ভুলুয়া কলেজ, নোয়াখালী, লেখক, কলামিষ্ট ও গবেষক।

ফেমাসনিউজ২৪.কম/কেআর/এস