logo

রবিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮ | ৮ আশ্বিন, ১৪২৫

header-ad

১৯৭১ সালে ত্রিপুরা ছিল যেন একখণ্ড মুক্তাঞ্চল

ড. মাহফুজ পারভেজ | আপডেট: ১৬ আগস্ট ২০১৮

প্রতিবেশী ত্রিপুরার ভৌগোলিক অবস্থানটি বড়ই গুরুত্বপূর্ণ। ভারত যেখানে তিন দিক দিয়ে ঘিরে রেখেছে বাংলাদেশ, বাংলাদেশ সেখানে তিনদিক থেকে জড়িয়ে আছে ত্রিপুরাকে। রাজ্যের মোট ৯১৭ কিলোমিটার সীমান্তের মধ্যে ৮৫৬ কিলোমিটারই বাংলাদেশের সঙ্গে। ১৯৭১ সালে ত্রিপুরায় জাতি-উপজাতি মিলিয়ে যখন ছিল ১৫.৫৬ লাখ, তখন বাংলাদেশ থেকে পাড়ি দেয়া শরণার্থীর সংখ্যা ছিল ১৩.৪২ লাখ। স্থায়ী জনসংখ্যার প্রায় সমান। এ সংখ্যা পরবর্তীতে আরো বেড়েছিল, স্বভাবতই রাজ্যের সমাজজীবন ও অর্থনীতিতে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয়। তবু আমাদের দুর্দিনে নিজের কষ্টকে কষ্ট বলে ভাবেন নি ত্রিপুরাবাসী। আমাদের কাছে প্রীতি ও বন্ধুত্বের অপর নাম ত্রিপুরা।

ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলা, সেখানে রাজপ্রাসাদ গড়েন মহারাজ কৃষ্ণকিশোর মাণিক্য। পাহাড়-অরণ্যময় রাজ্যের প্রাণময় প্রকৃতির কোলে বেড়ে ওঠা এক রূপসী নগর আগরতলা। পাহাড় থেকে হাতির দল নেমে আসতো একদা শহরের ভেতরেই। পার্বত্য ফল ও ফসল নিয়ে আসতো বৈনারী। মালঞ্চ নিবাসের বাগান থেকে ফুল তুলতে গিয়ে মনে হয় পুষ্পিত অমরাবতী; রূপকথার রাজ্যে এখনই আসবে বুঝি কোনও এক রাজকন্যা অথবা নীল পরী, লাল পরী। শহরময় কাঁঠাল ও নাগকেশরের ঘন বাগান। নাম না জানা পাখিদের কাকলী। সবুজ-সঘন প্রকৃতিতে হারিয়ে যাওয়ার হাতছানি। জীবনের তাপ ও দগ্ধতা থেকে অনায়াসে লুকিয়ে থাকা যায় ঘন অরণ্যের মায়াবী আলিঙ্গণে।

ঐতিহ্যে সাজানো পুরনো আগরতলা থেকে নতুন আগরতলার পত্তন করেন মহারাজ কৃষ্ণকিশোর মাণিক্য। এই শহরেই একদিন অখণ্ড বাংলা থেকে তরুণ রবীন্দ্রনাথ এসেছিলেন। সেটি ছিল বঙ্গাব্ধ ১৩০৬। নেমেছিলেন মোগড়ার রেল স্টেশনে, বর্তমান বাংলাদেশের আখাউড়া বা তার কাছাকাছি। কিশোর রবীন্দ্রনাথকে, যাঁর কাব্যখ্যাতি তখন কেবলই পরিচিতজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ, সর্বপ্রথম ‘কবি’ হিসেবে স্বীকৃতিদান করেন ত্রিপুরার মহারাজা বীরচন্দ্র মানিক্য। রবীন্দ্রনাথের নিজের ভাষায়, “যে অপরিণত বয়স্ক কবির খ্যাতির পথ সম্পূর্ণ সংশয়সঙ্কুল ছিল, তার সঙ্গে কোন রাজত্ব গৌরবের অধিকারীর এমন অবারিত ও অহেতুক সখ্য-সম্বন্ধের বিবরণ সাহিত্যের ইতিহাসে অভূতপূর্ব।”

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বরপুত্র রবীন্দ্রনাথ তাঁর আশি বছরের জীবনের প্রায় ষাট বছরই ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রেখেছেন ত্রিপুরার সঙ্গে। রবীন্দ্র সান্নিধ্যে এসেছেন চার মহারাজা। যথাক্রমে: বীরচন্দ্র মাণিক্য, রাধাকিশোর মাণিক্য, বীরেন্দ্র কিশোর মাণিক্য ও বীরবিক্রম কিশোর মাণিক্য। কবির বিশ্বভারতী স্থাপনে মুক্তহস্তে দান করেন এই মহারাজারা। এক মহারাজা রবীন্দ্রনাথকে প্রথম ‘কবি’র সম্মানে ভূষিত করেছিলেন, তাঁরই প্রপৌত্র বীরবিক্রম কিশোর মাণিক্য শেষ বয়সে কবিগুরুকে সম্মানিত করেন ‘ভারত ভাস্কর’ উপাধিতে, আগরতলায় এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের মাধ্যমে।

রবীন্দ্রনাথও ত্রিপুরার দান ও বদান্যতাকে শ্রদ্ধা সঙ্গে স্বীকার করেছেন। ত্রিপুরার, বিশেষত ত্রিপুরারাজদের অসামান্য বদান্যতার কথা স্মরণ রেখেই কৃতজ্ঞ রবীন্দ্রনাথ তাঁর সাহিত্যের বিভিন্ন সৃষ্টিতে বিশেষ স্থান দিয়েছেন ত্রিপুরাকে। ‘রাজর্ষি’ ও ‘বিসর্জন’ বাদেও অসংখ্য গান ও কবিতা উপহার দিয়েছেন। ত্রিপুরার বর্ণাঢ্য প্রকৃতির ছাপ আর বনে বনে ছায়া ঘনিয়ে আসার চিরায়ত আবহ রবীন্দ্র রচনায় স্পষ্ট। রবীন্দ্রনাথ ত্রিপুরাকে কখনো বাংলার বাইরের বিদেশ ভাবেন নি; মনে করেছেন আত্মার আত্মীয়; প্রাণের সারথী।

অথচ আশ্চর্য্যরে বিষয়, ত্রিপুরার রাজপরিবার বাঙালি নয়, কিন্তু তাদের উদ্যোগেই রাখিবন্ধনে আবদ্ধ হয় ত্রিপুরা ও বাংলা। এই রাজ্যের মহারাজাদের হাতে বাংলা ভাষা-সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতার গৌরবের ইতিহাস অম্লান হয়ে রয়েছে। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি ত্রিপুরার মহারাজাদের অকৃত্রিম ভালোবাসা ঐতিহাসিক ঘটনা। অধীনস্ত ভারতবর্ষের অবিভক্ত বঙ্গেও যখন বাংলা ভাষার সরকারি মর্যাদা নেই, ফার্সি কিংবা বা ইংরেজি যখন সরকারি-ভাষা, ত্রিপুরার রাজভাষা তখনও বাংলা! বাঙালিদের আনাগোনা ও সমাদর অবারিত।

শুধু ভাষা নয়, বাঙালিকে নানাভাবে সাহায্য করেছে ত্রিপুরা। রবীন্দ্রনাথের বন্ধুজন জগদীশ চন্দ্র বসু বিলেতে গিয়ে বিজ্ঞান গবেষণা করবেন। তাঁর অর্থ চাই প্রচুর। কবি স্বয়ং অর্থ সংগ্রহে নামলেন। মহারাজা রাধাকিশোর মাণিক্য সানন্দে এগিয়ে এসে সেকালে ৫০ হাজার টাকা জগদীশচন্দ্রের বিজ্ঞান সাধনায় দান করেন। অকুণ্ঠভাবে বসু বিজ্ঞান মন্দির প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করেন। উপরন্তু, অন্ধ কবি হেমচন্দ্র এবং লোকসাহিত্য সংগ্রাহক ড. দীনেশচন্দ্র সেন তাদের জীবনের সঙ্কটতম মুহূর্তে ত্রিপুরার মহারাজাদের কাছ থেকে মাসোহারা পেয়ে সঙ্কটমুক্ত হন। শিক্ষা, শিল্প, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি, সর্বক্ষেত্রে বাঙালিকে সহায়তা করতে বন্ধু-ত্রিপুরা কখনোই পিছ পা হয় নি।

ইতিহাসের চমৎকার একটি তথ্য হলো, ত্রিপুরা কিংবা আগরতলায় আর্যদের পা পড়েনি, আসেনি কোনো বিদেশি শাসনকর্তা। খোদ ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক-আগ্রাসী শক্তি তাদের পৌনে দুশ’ বছরের শাসনামলে সরাসরি শাসন করেনি ত্রিপুরাকে, পরোক্ষভাবে খবরদারি করেছে, যেমন করেছে উপমহাদেশের অন্যান্য দেশীয় রাজ্যকে। ফলে নিজের স্বাতন্ত্রিকতা বজায়ে সচেষ্ট হয়েছিল ত্রিপুরা।

আর নিজের মতো করে স্বাধীনভাবে প্রতিবেশী বাংলার সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখতেও সক্ষম হয়েছিল। ত্রিপুরার মহারাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায় ব্রিটিশ বিরোধী বাঙালি স্বাধীনতা যোদ্ধাদের এককালীন আশ্রয়স্থল হয়ে ওঠে ত্রিপুরা, যা ভারতের স্বাধীনতার ইতিহাসে আরেক গৌরবের অধ্যায়। ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদারের “হিস্ট্রি অব ফ্রিডম মুভমেন্ট ইন ইন্ডিয়া”র একটি উদ্ধৃতি প্রণিধানযোগ্য।

তিনি লিখেছেন, “ত্রিপুরার রাজাদের অনুগত প্রজা বা সদস্যদের প্রশিক্ষণের জন্য পাহাড়ি এলাকা বিলোনিয়া ও উদয়পুরে দুটো খামার ছিল। সেগুলো দৃশ্যত কৃষি খামার হলেও মূলত তা ছিল প্রশিক্ষণ শিবির। দিনের বেলায় সমিতির সদস্যরা মাঠে কাজ করতো; কিন্তু রাতের বেলা তাঁদের বিভিন্ন ধরনের অস্ত্রের প্রশিক্ষণ দেয়া হতো এবং নিকটবর্তী পাহাড়ে গিয়ে তারা গোলাগুলির মহড়া দিত।”

অনেক বিপ্লবী ও সংগ্রামী ব্রিটিশের হুলিয়া মাথায় নিয়ে নিরাপদে ত্রিপুরায় আশ্রয় লাভ করেছিলেন। স্বাধীনতাকামী-দেশপ্রেমিক মহারাজা রাধাকিশোর বাঙালি বিপ্লবীদের সহযোগিতায় হাত প্রসারিত করেছিলেন বলেই তাঁর নামের আগে ‘মহারাজা’ উপাধি ব্যবহারে বাদ সাধে দখলদার ইংরেজ। তবু স্বদেশভক্ত রাজা নিজের কর্তব্যকর্ম থেকে বিচ্যুৎ হননি। বাঙালিদের জন্য ত্রিপুরার দ্বার রুদ্ধ করেননি। বরং বাংলা আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক পরম্পরা ও ইতিহাসের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে মৈত্রী ও ভালোবাসার সূত্রে আবদ্ধ থেকেছেন।

বাংলার স্বাধীনতা ও সংগ্রামে ত্রিপুরার শাশ্বত ঐতিহ্য আরো উজ্জ্বল হয় ১৯৭১ সালে, আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ে। নিজের কষ্ট ও দুর্ভোগ ভুলে সীমান্ত উন্মুক্ত রেখে শরণার্থীদের আশ্রয়ই শুধু নয়, ২ এপ্রিল ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের সরকার গঠনের অনেক আগেই পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার প্রতিবাদে ও ‘স্বাধীন বাংলাকে’ সর্বতো সহায়তার দাবিতে সারা ত্রিপুরায় স্বতঃস্ফূর্ত বন্ধ পালিত হয়।

বাংলাদেশের ‘নতুন কর্তৃত্বের’ প্রতি ভারত সরকারের স্বীকৃতি আদায়ে ত্রিপুরার শিক্ষক ও ছাত্ররা মিছিল করেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ত্রিপুরা এতোটাই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে যে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে মোট ১১ টি যুদ্ধ সেক্টরের মধ্যে ৫টি যুদ্ধ সেক্টর গড়ে ওঠে এই রাজ্যের সীমান্ত বরাবর। রাজ্যের পত্র-পত্রিকাগুলি নয় মাস ধরে যে ভূমিকা রাখে তাতে সেগুলিকে বাংলাদেশের পত্রিকা ছাড়া আর কিছুই ভাবা যায় নি। ১৯৭১ সালে ত্রিপুরা যেন ছিল একখণ্ড মুক্তাঞ্চল।

প্রাকৃতিক ও ভৌগোলিক- ঐতিহাসিক কারণেই ত্রিপুরার জনজীবনে পূর্ববাংলা তথা আজকের বাংলাদেশের ভাষা, সংস্কৃতি, লোকায়ত জীবন-ভাবনার অবিচ্ছিন্ন ধারা প্রবাহিত। বাংলাদেশের প্রতিটি অর্জনে ত্রিপুরাবাসী রোমাঞ্চিত,পুলকিত। ইতিহাসের এই বন্ধন চিরায়ত, যা দুই পাড়ের মানুষের মৈত্রী ও বন্ধুত্বের স্মারক। অভিন্ন নদী গোমতীর মতোই চির বহমান এই প্রীতি ও বন্ধুত্বের ধারাস্রোত। মানবমৈত্রীর শ্বাশত প্রেরণায় প্রবহমান এই প্রীতি, বন্ধুত্ব ও মৈত্রীর উষ্ণ প্রস্রবণ।

ত্রিপুরার অনেক মানুষেরই ঐতিহ্য ও শেকড় বাংলাদেশ থেকে বিস্তারিত। বন্ধু ত্রিপুরার জন্য বাংলাদেশ হলো ‘গেটওয়ে’। ভারতের অন্যত্র ও বিশ্বের সর্বত্র অবারিত পথ খুলে দিয়ে বাংলাদেশও প্রসারিত করেছে বন্ধুত্বের অকৃত্রিম সম্ভাষণ। ইতিহাসের সোনালি পাতায় লিপিবদ্ধ বাংলাদেশ-ত্রিপুরার মৈত্রী, বন্ধুত্ব ও সুসম্পর্ক অনাগতকালে আরো ঋদ্ধ, উষ্ণ ও আন্তরিক হয়ে সৌভ্রাতৃত্বের বিজয় তিলক এঁকে দিক দিকে-দিকে-সবদিকে; মানুষে মানুষে সৃষ্টি করুক মিলনের ঐক্যতান। প্রীতি ও বন্ধত্বের অপর নাম হয়ে ত্রিপুরা আরো মহীয়ান হোক দক্ষিণ এশিয়ার আকাশে ও দিগন্তে।

লেখক : কবি, গল্পকার ও গবেষক, অধ্যাপক, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
ফেমাসনিউজ২৪/এফএম/এমএম