logo

মঙ্গলবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৮ | ২৯ কার্তিক, ১৪২৫

header-ad

সেই দিন আর নেই

ড. মাহফুজ পারভেজ | আপডেট: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮

প্রতিবছর পালিত হয় বিশ্ব নদী দিবস। নদী ও নদী-মাতৃক প্রকৃতি ও পরিবেশ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে দিবসটি পালন করা হয়। ১৯৮০ সাল থেকে বিশ্ব নদী দিবস পালন করতে শুরু করে ব্রিটিশ কলম্বিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি। ২০০৫ সাল থেকে জাতিসংঘের বিভিন্ন সহযোগী সংস্থা দিবসটি পালন করছে। এখন তা পালিত হয় বিশ্বব্যাপী। কিন্তু এতো এতো দিবস পালন আর আনুষ্ঠানিকতার পরেও পৃথিবীর নদীগুলো দখল ও দূষণে বিপর্যস্ত। বাংলাদেশের পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ।

নদীময় বাংলাদেশের জন্য অবশ্য আলাদা করে নদী দিবসের দরকার ছিল না। এদেশের মানুষের কাছে একদা প্রতিটি দিনই ছিল নদী দিবস। নদী ছিল জীবন-যাপন ও যোগাযোগের উৎস। সংস্কৃতি ও আবেগের সহযোগী হয়ে চিরায়ত বাংলার সঙ্গে মিশে ছিল শত শত নদী।

সেই দিন আর নেই। দেশব্যাপী যেসব নদী ছিল, সেগুলোর প্রত্যেকটি এখন আর জীবন্ত নেই। হয়ে গেছে নদীর কঙ্কাল। দখলে-দূষণে অসংখ্য নদীর মৃত্যু বা অবলুপ্তি ঘটেছে। চারপাশে তাকালে একদার প্রমত্তা বা খরস্রোতা নদীর অপসৃয়মান ছায়া দেখা যাচ্ছে। চোখের সামনে এত বড় হত্যাযজ্ঞ দেখেও আমরা সচেতন হচ্ছি না। অথচ বিশ্বের বহু দেশে নদীকে মানুষের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। নদীকে হত্যা বা ক্ষতি বা দূষিত করাটাকে মানুষের বিরুদ্ধে অপরাধের সমতুল্য বলে ধরা হচ্ছে। যদিও আমরা পাষণ্ডের মতো নদী আর প্রকৃতিকে প্রতিনিয়ত হনন করে চলেছি এবং এভাবেই আমাদের জীবন-যাপনকে বিপদময় করে তুলছি। হয়তো অচিরেই এমন একদিন আসবে, যখন চলচ্চিত্রে নদী দেখে মানুষকে নদী চিনতে হবে! নদী পরিণত হবে স্মৃতির সামগ্রীতে।

ক’বছর আগে সুযোগ হয়েছিল অনেকগুলো নদীর সঙ্গমস্থল হাওরাঞ্চলে যাওয়ার। কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ, সিলেট, হবিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মাঝখানে জলমগ্ন বিস্তৃর্ণ হাওর অবস্থিত। সেই হাওর পর্যন্ত ক্রমে ক্রমে অপরিকল্পিত পদক্ষেপে বিরূপ হয়ে যাচ্ছে। প্রাকৃতিক ব্যবস্থাপনা বদলে ফেলার নানা কুপ্রভাব দেখা যাচ্ছে সেখানে।

হাওরের ওপর দিয়ে যাত্রা করলেই মনে হয়, আমি ভূপৃষ্ঠে নেই; পৃথিবী নামক আদিম গ্রহের অভ্যন্তরে কোনও এক ধমনীর ভেতর দিয়ে রক্তকণিকার মতো ছুটে চলেছি। যেন দুধের বাটির অভ্যন্তরের এক অতল নিঝুমপুরীতে নিমজ্জিত হয়েছি।

শরতের কুয়াশার আস্তরণ কখনও পুরো কখনও হাল্কা হতে হতে ভোরের আলো ফুটে ওঠার আগেই রহস্যময় আলোছায়ায় জলের বুকে বিম্বিত হলো একটি অলৌকিক সকাল। জল থেকে সূর্য ওঠে। জলেই অস্তমিত হবে আলোর গোলক। সাগরের মতো চারপাশ ঘেরা অতলান্ত জলের ভূগোলে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দ্বীপ-সদৃশ্য হাওরের গ্রামগুলোর একটিতে আশ্রয় নিয়ে আমি পানির বদলে রক্তের টান পাই। মনে হয়, আমি আর মানব-সত্তায় নেই, একটি উদ্বাস্ত রক্তকণা হয়ে বুদ্বুদের মতো ভাসছি আদিঅন্তহীন জলের শরীরে।

হাওরে আসাটা এখন সহজ ও আরামদায়ক হয়েছে। আগে সেখানে যেতে সারাদিনের ধকল পোহাতে হতো। আজকাল কিশোরগঞ্জ শহর থেকে আধা-ঘণ্টার মধ্যে সিএনটি বা বাসে পৌঁছা যায় হাওরের প্রবেশদ্বার নামে পরিচিত করিমগঞ্জ উপজেলার চামড়াঘাটে; অধুনা বন্দরের মর্যাদা পেয়েছে জায়গাটি। ভৈরব বা কুলিয়ারচর দিয়েও হাওরের জলমগ্ন জনপদে প্রবেশ করা আরো সহজ।

চোখের সামনেই দেখা যায় রহস্যাবৃত্ত ও অনির্ধারিত জলরাশি। মাইলের পর মাইল নিচু জমি জলে টুইটুম্বুর। মধ্যাকর্ষণের টানও প্রবল। আর আছে জলমগ্ন মানুষগুলোর কণ্ঠে চন্দ্রাবতী, মহুয়া, মলুয়া, আবদুল করিমের হৃদয় মোচড়ানো হাহাকার। জোছনা রাতে এখানে চাঁদের গলিত শরীর জলে ভিজে মায়াবী গলায় ডাকে। মানুষগুলো সেনখানে সঙ্কুল ও আক্রান্ত হয়ে জলে জলে ভাসছে। জলমগ্ন হাওরের খোলা প্রান্তরে ‘লিলুয়া বাতাস’ নামের এক মায়াবী উড়ালে মনে হয় জল-কল্লোলিত পুরাণ-রমণীর ছায়া”ছন্ন আধুনিক অবয়বের কাছে সব কিছু অবনত হয়েছে।

আমি এসেছি কুলিয়ারচর দিয়ে। আসার দিনটির কথা বেশ মনে আছে। ঢাকা থেকে স্বল্প সময়ের আরামপ্রদ ট্রেন জার্নিতে ভৈরব। স্টেশনে নেমে চেপে বসলাম সিএনজি’তে। অলিগলি, এই পাড়া, সেই মহল্লা পেরোতেই বদলে গেল প্রকৃতির চালচিত্র। ফুরফুরে মিষ্টি বাতাস ধেয়ে এলো। কিশোরগঞ্জগামী সরু পাকা রাস্তায় কিছুটা গিয়ে ডান দিকে মোড় নিয়ে কুলিয়ারচর। রাস্তা শেষ হলো বিশাল এক হ্রদ সদৃশ্য নদীর পাড়ে। স্থল পথের সঙ্গে এটাই আমাদের শেষ সাক্ষাৎ। এরপর আমরা কেবলই জলের ভ‚গোলে বিচরণ করব।

একটি স্বাভাবিক ও নিয়মতান্ত্রিক জীবন থেকে অচেনা ভিন্নতর প্রতিবেশে চলেছি। মানুষ শেষ যাত্রার আগে যেভাবে চারপাশ দেখে, আমি আমার এতোদিনের চেনা পৃথিবীটাকে দেখার জন্য খানিক থমকে দাঁড়াই। ৩৬০ ডিগ্রির সবটুকু ধীরে ধীরে, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখি। আমার সামনের অর্ধেকটায় জলের হাতছানি আর পেছনে স্থলের আশ্রয়।

আলতো পায়ে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম দীর্ঘতম নদীর পাড়ে সুন্দর সাজানো পার্কটিতে। সামনের আদিঅন্তহীন নদীটি উজানে আরও অনেক নদী আর জলাভূমি হয়ে আদি উৎস গারো পাহাড়ের দিকে চলে গেছে। তার নিম্নগামী পথটি অন্যান্য নদীর সঙ্গে সখ্যতার সূত্রে বঙ্গোপসাগরে মিশেছে। নদী-ঘেষাঁ পার্কে নানা রঙিন ফুলের বাহার। সুন্দর নদীর বুকে আধো কুয়াশা জমাট বেঁধেছে। দীর্ঘ এই নদীময়তার বুকে ভেসে বেড়াচ্ছে নানা পরিযায়ীর দল।

একটু পরেই যুক্ত হয়েছি সেই প্রাকৃতিক দলে। রূপবান সিনেমার পোস্টারের মতো রঙ-চঙে শরীর নিয়ে একটি স্টিমার আমাদের তুলে নিল। হয়ত এমনই জলযানে জল-সামন্তরা ঘেঁটুপুত্র কমলাকে নিয়ে ভেসে বেড়ায়। স্টিমারে কিছু কর্মজীবী মানুষের দঙ্গল ছাড়া আমি কোনও পেশাদার সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর লোকজনকে দেখতে পেলাম না। অকাল বন্যা ও প্রাকৃতিক বিরূপতায় মানুষের কঠিন ও সংগ্রামী জীবন থেকে নন্দনকলা বলতে গেলে অবলুপ্ত হয়েছে। আদিম অন্ধকার জলের ছায়াচ্ছন্ন হু হু বাতাসের বেগ আমাদেরকে অচীরেই টেনে নিল হাওরের গহীন গভীরে। চারপাশে এখন শুধু জলছলছল প্রকৃতির আদিঅন্তহীন কল্লোল।

মধ্যাহ্নের মুখে আমরা এসে ভিড়েছি একটি চরে। বিশাল চরের নাম ডাকি। প্রচুর পাখি দেখছি হাওরের আনাচে-কানাচে ভেসে বেড়াচ্ছে। তাদের দেখতে বছর জুড়েই নানা স্থানের পক্ষিপ্রেমীরা ছুটে আসেন বারে বারে। চরের প্রধান ঘাটের পাড় জুড়ে ছোট ছোট ডিঙি দাঁড়িয়ে আছে। আগে থেকে বলে রাখা ছিল মোজাম্মেলকে; আমার প্রাক্তন ছাত্র। সে সঙ্গে নিয়ে এসেছে ছমিরদ্দীন মাঝিকে। তিনি সারা বছর মাছ ধরেন আর পর্যটকদের পাখি দেখান। সময় আর চাহিদা জানালে এখনো নিবু নিবু টিকে-থাকা হাওর সংস্কৃতির নানা প্রান্তিক কেন্দ্রে নিয়ে যান আগুন্তকদের; কোনও এক কাঙালিনি সুফিয়ার মতো বেঁচে থাকা লড়াকু-অনামা শিল্পীর সামনে হাজির করেন। মরমী টানে জল আর কথা আর কণ্ঠ তখন খুলে দেয় পৃথিবীর চেয়ে দূরের কোনও রহস্যময় অলৌকিক পথ।

হাতের তালুর মতো হাওরের প্রতিটি আনাচ-কানাচ ছমিরুদ্দীন মাঝির চেনা। প্রতিটি পাখির বিজ্ঞানসম্মত নাম অজানা থাকলেও তাদের ঠিকানা একেবারে নখদর্পণে এই অক্ষরজ্ঞানহীন লোকটির। কোন পাখি কোন দেশ থেকে এসেছে, সব তার জানা। ‘সাইবেরিয়া থেকে আসা পাখিদের চেনা যায় পায়ের ঘুঙুর দেখে’, জানালেন তিনি, ‘উল্কি আঁকা থাকে তিব্বতের পাখিদের ধূসর পালকে’। চরের ভেতরের দিকে হাঁটতে হাঁটতে তিনি প্রকৃতি-পরিবেশের একটি রানিং কমেন্ট্রি দিতে লাগলেন। মাঝ-চরে কয়েকটি সাজানো ছনের ঘরের একটি দেখিয়ে বললেন, ‘সবচেয়ে ভালোটির ব্যবস্থা করেছি আপনাদের জন্য।’

আমি মোজাম্মেলের দিকে জিজ্ঞাসু চোখে তাকাই। এমন পরিস্থিতিতে আমার কিছু বলার নেই। দ্বিতীয় অপশন দেওয়ার রাস্তা বন্ধ। ক্লান্ত ও চরম ক্ষুধার্ত অবস্থায় আশ্রয় আর খাবার নিয়ে দর কষাকষির সুযোগ নেই। ওর দিকে তাকিয়ে আমি হাল্কা মাথা নেড়ে সম্মতি জানালাম। মোজাম্মেল খুশি হলো। ছমিরুদ্দীন মাঝির সঙ্গে মৃদ্যু গলায় পরবর্তী কার্যক্রম নিয়ে কথা বলে আমাকে নিয়ে ঘরে ঢুকল সে। হাওর ভ্রমণের বাকী অংশের বর্ণনা করবো আগামী কিস্তিতে।

লেখক : কবি, গল্পকার ও গবেষক, অধ্যাপক, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
ফেমাসনিউজ২৪/এফএম/এমএম