logo

শুক্রবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৮ | ২৯ অগ্রহায়ণ, ১৪২৫

header-ad

দুধ পুকুর এবং জেলে

শামীমুল হক | আপডেট: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮

রাজার শখ দুধের পুকুর দেবেন। এ জন্য ডাকা হলো বিশেষজ্ঞদের। কিভাবে কি করলে এ পুকুর তৈরি করা যাবে। দুধের পুকুর দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে লোকজন আসবে। অন্য দেশের রাজারাও আসবেন তার পুকুর দেখতে। একেকজন বিশেষজ্ঞ তাদের প্রস্তাবনা লিখিত আকারে জমা দিলেন। অবশেষে রাজা পুকুর খোদাইয়ের নির্দেশ দিলেন। বিশেষজ্ঞের পরামর্শমতো এমনভাবে পুকুর তৈরি করলেন যাতে দুধ নষ্ট না হয়।

আকাশের বৃষ্টি যেন পুকুরে পড়তে না পারে সেজন্য দেয়া হলো ঢাকনা। সুইচের মাধ্যমে এ ঢাকনা উপরে উঠানো যাবে। আবার সুইচের মাধ্যমে আগের মতো হয়ে যাবে। আবার ঢাকনার মধ্যেই রাখা হয়েছে একটি ফাঁকা জায়গাও। সেখানেও তৈরি করা হয়েছে আরেকটি ঢাকনা। দীর্ঘ চেষ্টার পর হলো পুকুর। এবার রাজা গোটা রাজ্যে এলান জারি করার নির্দেশ দিলেন। আগামী শনিবার যত গৃহস্থ পরিবার আছে তাদের প্রত্যেকের গাভীর দুধ রাজ দরবারে ফেলতে হবে।

পুকুর ভর্তি হলে সেই দুধ পুকুর রাজা উদ্বোধন করবেন। অপেক্ষার শনিবার এলো। রাজ্যের সকল কৃষক ঘটি বাটি দিয়ে দুধ নিয়ে এসে রাজ দরবারের সেই পুকুর পাড়ে হাজির। এবার সিরিয়াল করে একজন একজন করে তাদের আনা দুধ ছাদের সেই ফাঁকা জায়গা দিয়ে পুকুরে ফেলার নির্দেশ দেয়া হলো। একজন একজন করে এগিয়ে যাচ্ছেন। সঙ্গে আনা দুধ সেই ফাঁক দিয়ে পুকুরে ঢালছেন। এভাবে ঢালতে ঢালতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। একসময় বুঝা গেল পুকুর দুধে ভর্তি হয়ে গেছে। রাজা-রানি, উজির, পাইক পেয়াদা সবাই হাজির।

এখনই রাজা পুকুরের ঢাকনা সুইচ টিপে উপরে তুলবেন। উদ্বোধন হবে দুধ পুকুরের। পুকুরকে ঘিরে দাঁড়িয়েছেন রাজ্যের সাধারণ মানুষও। এবার রাজা এলেন। সুইচ টিপলেন। ঢাকনা আস্তে আস্তে উপরে উঠতে থাকল। একসময় গিয়ে থামল ঢাকনা। পুকুরের দিকে নজর দিয়ে রাজা দেখলেন দুধ পুকুরে পানিতে ভরা। এ কি হলো? এতো দুধ গেল কোথায়? দুধ কিভাবে পানি হয়ে গেল? ভীষণ রেগে গেলেন রাজা। ডাকা হলো সকল গৃহস্থকে। রাজ দরবারে বসানো হলো দরবার। একে একে গৃহস্থকে ডাকা হচ্ছে। তাদের সওয়াল জওয়াব নেয়া হচ্ছে। প্রত্যেকেরই এক কথা আমি মনে করেছি সবাই দুধ আনবেন। আমি এক ঘটি পানি নিয়ে গেলে কি হবে? কেউতো আর বুঝতে পারবে না।

এমনটা ভেবে সকল গৃহস্থই দুধের বদলে পানি নিয়ে এসেছেন। আর এতে দুধ পুকুর ভরে গেল পানিতে। রাজার আর শখ পূরণ হলো না। এইতো গেল রাজা-বাদশার যুগের কথা। বর্তমান সমাজেও কেউ কেউ নানা ধরনের শখ করেন। এসব শখ পূরণে নানা চেষ্টা করেন। কিন্তু দেখা যায় তাদের এ শখ কখনো পূরণ হয় না। কারণ, তাদের শখটাই হলো উল্টো। যেমন ওই দুধ পুকুরের মতো। রাজাকে চিন্তা করা উচিত ছিল, দুধের কখনো পুকুর হতে পারে না। পুকুরে থাকবে পানি। দুধ এমন একটি জিনিস যাতে এক সময় পচন ধরে। আবার এটাও রাজার ভাবা দরকার ছিল তিনি যে এলান জারি করলেন, সকলকে দুধ নিয়ে আসতে। এটা সবাই মানবে কিনা? আরেক রাজা দরবারে বসা ছিলেন। সে সময় এক জেলে রাজার সাক্ষাৎ প্রার্থী হলেন।

কিন্তু রাজ দরবারের পাহারাদাররা তাকে অনুমতি দিচ্ছেন না ভেতরে যেতে। জেলে পাহারাদারকে বললেন, দেখ আমি রাজার জন্য বড় একটি মাছ নিয়ে এসেছি। সেটি রাজার হাতেই দিতে চাই। তুমি রাজাকে গিয়ে খবরটা দাও। পাহারাদার রাজার কাছে গিয়ে খবর দিলেন। রাজা জেলেকে ডাকলেন। জেলে রাজ দরবারে হাজির হয়ে মাছটি রাজাকে উপহার দিলেন। রাজা মহাখুশি এত বড় মাছ দেখে। আর খুশি হয়ে জেলের হাতে ৫০০ টাকা উপহার দিয়ে বিদায় দিলেন।
জেলে রাজ দরবার থেকে বের হওয়ার পর রানি বললেন, রাজা আপনি এই একটি মাছের জন্য ৫০০ টাকা দিয়ে দিলেন। এটা মোটেও ঠিক হয়নি। রাজা বললেন, তাহলে কি করা। রানি পরামর্শ দিলেন জেলেকে ডাকা হোক। জিজ্ঞেস করা হোক এটা পুরুষ মাছ না কি মেয়ে মাছ। পুরুষ বললে আমরা বলব আমাদের মেয়ে মাছের প্রয়োজন। আর মেয়ে বললে বলব আমাদের পুরুষ মাছের প্রয়োজন। আর এভাবে মাছটি ফেরত দিয়ে আমরা টাকা নিয়ে নেবো। সঙ্গে সঙ্গে ডাকা হলো জেলেকে। রাজ দরবারের প্রহরীরা জেলেকে ধরে আনল।

এবার রাজা জেলেকে জিজ্ঞেস করল আচ্ছা জেলে মাছটি পুরুষ না মহিলা। জেলে ঝটপট উত্তর দিলো রাজা মশাই এ মাছটি পুরুষও না মেয়েও না। এটি হিজড়া। উত্তর শুনে রাজা খুশি হলেন। এবার রাজা আরও ৫০০ টাকা দিল জেলেকে। জেলে বেরিয়ে গেল রাজ দরবার থেকে। গেট দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময় দুটি পয়সা পড়ে গেছে। সঙ্গে সঙ্গে জেলে পয়সাগুলো তুলে চুমু খেয়ে পকেটে রাখল। দূর থেকে রানি তা দেখে গেটের প্রহরীদের ডাকলেন। সব শুনে রাজাকে গিয়ে বললেন, জেলে এ কাজ করেছে। দুটি পয়সা পড়ে গেছে তাতে কি? তাকে এক হাজার টাকা দেয়া হয়েছে তাতেও জেলের পোষালো না। পড়ে যাওয়া দুটি পয়সা উঠিয়ে নিতে হবে? রাজার বাড়ির সামনে দিয়ে কত মানুষ যায় তাদের কেউ এ পয়সা দুটি পেলে কত উপকৃত হতো।

রানি বললো, রাজা জেলে সত্যিই লোভী। দুটি পয়সার লোভ সামলাতে পারেনি। তাকে এনে শাস্তি দেয়া হোক। পাশাপাশি তাকে দেয়া এক হাজার টাকা ফেরত নেয়া হোক। রাজা ফের ডাকলেন জেলেকে। এবার জেলেকে রাজা রাগান্বিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন মাটিতে পড়ে যাওয়া পয়সা তুললে কেন? আবার এতে চুমুও খেয়েছ। তোমার এতো লোভ কেন? জেলে বলল, রাজা মশাই আসলে লোভ নয়। দুটি পয়সা পড়ে গেছে ঠিকই। কিন্তু এ রাস্তা দিয়ে কত মানুষ যাবে আবার আসবে। তাদের পায়ের নিচে পয়সাগুলো পড়বে। আর পয়সায় আমার রাজা রানির ছবি আছে।

এতে রাজা রানির অপমান হবে। আর এটা মনে করেই পয়সাগুলো তুলে রাজা রানিকে চুমু দিয়ে সম্মান জানিয়েছি। কথা শুনে রাজাতো অবাক। তিনি ঘোষণা করলেন এই জেলেকে আরো ৫০০ টাকা দেয়া হোক। আসলে রাজা এবং রানি ভেবেছিলেন তারাই চালাক। জেলে বেটাকে জব্দ করবে। কিন্তু রাজা ও রানি ভাবেননি জেলে হলেও তার বুদ্ধি আছে। তারাও সব বুঝেন।