logo

বুধবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৮ | ২৮ অগ্রহায়ণ, ১৪২৫

header-ad

শিক্ষার কথা, স্বপ্নের কথা

মোমিন মেহেদী | আপডেট: ০৫ ডিসেম্বর ২০১৮

সুশিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড। কথাটি এখন আর উচ্চারিত হয় না। তবে থেমে নেই শিক্ষার জন্য নিবেদিত দেশগুলো, থেমে নেই ব্যক্তি বা প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ের অনেকেই। তারা কাজ করছেন। শিক্ষার আলো জ্বালিয়ে যাচ্ছেন। এগিয়ে নিচ্ছেন। যদিও তা নিভু নিভু।

পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত ২০ বছরে কোটি শিশু-কিশোর শিক্ষার আলো থেকে ঝরে পড়েছে। কিন্তু বড় বড় কথা থামছে না লোভী-লম্পটদের মুখে।

এরই ধারাবাহিকতায় একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য চূড়ান্ত মনোনয়ন তালিকা প্রকাশ করেছে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক প্লাটফর্ম। ইতোমধ্যে কয়েকটি দলের প্রার্থীও নির্দিষ্ট হয়ে গেছে।

দেখা যায়- একাদশ সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগে প্রার্থী বাছাইয়ে তেমন পরিবর্তন আসেনি। তবে এবার আওয়ামী লীগ থেকে জাতীয় নির্বাচনে লড়বেন বেশকিছু নতুন ও তরুণ। আওয়ামী লীগ-বিএনপির অসংখ্য প্রার্থীর মধ্যে বাংলাদেশ ক্রিকেটের ওয়ানডে দলের অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজাকে নড়াইল-২ এর নৌকার মাঝি হিসেবে বেছে নিয়েছে আওয়ামী লীগ।

এ আসনে ২০১৪ সালের নির্বাচনে মহাজোট থেকে মনোনয়ন পেয়েছিলেন ওয়ার্কার্স পার্টির শেখ হাফিজুর রহমান। মাগুরা-১ আসনেও এবার পরিবর্তন এনেছে আওয়ামী লীগ। এ আসনে এ টি এম আব্দুল ওয়াহাবের পরিবর্তে দলটি সাবেক ছাত্রলীগ নেতা সাইফুজ্জামান শিখরের ওপর আস্থা রেখেছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। টাঙ্গাইল-৩ আসনে সংসদ সদস্য আনামুল রানা খানের পরিবর্তে এবার নৌকার মনোনয়ন দেয়া হয়েছে তার বাবা আতাউর রহমান খানকে।

আনামুল রহমান খান রানা বর্তমানে হত্যা মামলায় কারাগারে। চট্টবীর মহিউদ্দিন চৌধুরীর পুত্র ব্যারিস্টার মুহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল প্রথমবারের মতো মনোনয়ন পেয়েছেন। তিনি চট্টগ্রাম-৯ আসন থেকে নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করবেন। একাদশ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সবচেয়ে বড় চমক দিয়েছে ঢাকা-১৩ আসনে। আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী কেন্দ্রীয় নেতা জাহাঙ্গীর কবির নানকের পরিবর্তে এই আসনে উত্তর ঢাকা মহানগরের সাধারণ সম্পাদক সাদেক খানকে বেছে নিয়েছেন শেখ হাসিনা।

শরীয়তপুর-১ আসনেও এসেছে নৌকার নতুন মুখ। আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক বিএম মোজাম্মেলের পরিবর্তে ইকবাল হোসেন অপুকে মনোনীত করা হয়েছে। শাহীন আক্তার চৌধুরী কক্সবাজার-৪ আসন থেকে প্রথমবারের মতো নির্বাচন করবেন। তিনি বহুল আলোচিত-সমালোচিত ইয়াবা ব্যবসায়ী এমপি বদির স্ত্রী। কিশোরগঞ্জ-২ আসনে লেগেছে পরিবর্তনের হাওয়া। এখানে নৌকা প্রতীক নিয়ে প্রথমবারের মতো নির্বাচন করবেন বাংলাদেশের পুলিশের সাবেক আইজিপি নূর মোহাম্মদ।

যখন সারাদেশে সংসদ সদস্য হওয়ার যুদ্ধ চলছে, তখন নির্মমতার অন্ধকারে হারিয়ে যেতে বসেছে অসংখ্য মানুষের স্বপ্নজীবন। যে জীবনে নতুন হাসি ফোটানোর দায়িত্ব ছিল এমপিদের-মন্ত্রীদের-সচিব-আমলাদের; সে দায়িত্ব পালনে নিবেদিত না হওয়ায় আজও ঢাকার দোহারের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন নারিশা জোয়ার, কৃষ্ণদেবপুরসহ কয়েকটি চরাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা বঞ্চিত আলোর জীবন থেকে। নেই স্কুল-এ অধ্যায়নের সুযোগও। তবু বলা হচ্ছে– উন্নয়নে ভাসছে বাংলাদেশ।

কিন্তু এটা কতটা সত্য?

তার প্রমাণের জন্য নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধি হিসেবে বরাবরই যেমন উন্মুখ ছিলাম, তেমন উন্মুখ থেকে জানতে গিয়ে দেখেছি- নির্মম অন্ধকাওর কীভাবে কাটে অত্র এলাকার শিশু-কিশোরদের দিন। দেখেছি- কিছু সাহসী শিক্ষার্থীর এগিয়ে চলা আর বাকি ছোট্ট ছোট্ট ফুলের ঝরে পড়া। সাহসী শিক্ষার্থীদের ঝড়-বৃষ্টি আর প্রমত্তা ঢেউয়ের মধ্যে স্কুলে যাওয়ার ক্ষেত্রে ইঞ্জিনচালিত নৌকাই একমাত্র ভরসা।

ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও স্কুলে যেতে ভয় পায় ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা। আবার নদী পারাপারে বাড়তি খরচের বোঝাও আছে। বাধ্য হয়ে অনেকেই পড়াশোনা ছেড়ে দেয়। এই শিক্ষার্থীদের কথা কেউ ভাবে না। ভাবে বরাবরের মতো নিজের কথা, নিজের পরিবারের কথা, নিজের দলের কথা আর নিজের আখের-এর কথা। যে কারণে নিঃস্ব প্রায় এই এলাকায় আজও আসেনি স্কুল নামক আলোঘর। বরং বলা হচ্ছে এই শিক্ষার্থীদের মাথায় রেখেই সরকারি অর্থায়নে তৈরি করা হয়েছে নৌযান ‘শিক্ষাতরী’। কিন্তু সেই তরী দিয়ে কতটা আলো আসে শিক্ষাবঞ্চিত এ এলাকায়?

জবাব জানতে গিয়ে দেখা যায়- ঢাকার দোহারের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন নারিশা জোয়ার, কৃষ্ণদেবপুরসহ কয়েকটি চরাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা নদীপথে ইঞ্জিনচালিত এ নৌযানে চড়ে স্কুল-কলেজে যাতায়াতের কথা বলা হলেও মাসের অধিকাংশ দিনই বন্ধ থাকে, নষ্ট থাকে। পদ্মা নদীর অব্যাহত ভাঙনে দোহারের মূল ভূখণ্ড থেকে কয়েকটি গ্রাম বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।

এর মধ্যে নারিশা জোয়ার ও কৃষ্ণদেবপুর অন্যতম। কিন্তু এ গ্রামগুলোর মানুষকে যে কোনো প্রয়োজনে নদী পার হয়ে উপজেলা সদরে আসতে হয়। তা ছাড়া বিচ্ছিন্ন এ চরাঞ্চলগুলোতে শত শত শিক্ষার্থী আছে। তারা সবাই মালিকান্দা মেঘুলা স্কুল অ্যান্ড কলেজ, নারিশা উচ্চ বিদ্যালয়, নারিশা পশ্চিম চর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আসে লেখাপড়া করতে। যে কোনো পরিস্থিতিতে প্রমত্তা পদ্মা পাড়ি দিয়ে তাদের আসতে হয়। ‘দোহারের বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চলে গিয়ে দেখেছি ওখানকার মানুষের সমস্যা, বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের। একরকম গাদাগাদি করে ঝড়, বৃষ্টি আর ঢেউয়ের মধ্যে কী ঝুঁকি নিয়ে ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা প্রমত্তা পদ্মা পাড়ি দিচ্ছে। নদী পাড়ি দেয়ার ভয়ে অনেকে লেখাপড়াই ছেড়ে দিচ্ছে।

এমন অসংখ্য শিক্ষা বঞ্চিত এলাকা রয়েছে বাংলাদেশে। তবু বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। অথচ সেদিকে কারও কোনো খেয়াল নেই। আমাদের রাজনীতিকরা নিজেদের মতো করে রাজনীতিকে ব্যবহার করার কারণে নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত তারা। আর এ কারণেই সারাদেশে ৭০ লাখ করে শিক্ষার আলো থেকে ঝরে পড়া শিশু কিশোরকে নিয়ে না ভাবলেও ক্ষমতায় আসার আর থাকার চেষ্টায় মত্ত তারা।
এ ব্যক্তিরা নিজেদের ক্ষমতার জন্য টাকার মেলা বসাবেন নির্বাচনে। কিন্তু তারা যদি দেশ ও মানুষের উন্নয়নে নিবেদিত থাকতেন, নিশ্চিত করে বলতে পারি- যতই টাকার মেলা বসুক আর খেলা হোক; কোনো বাধাই তাদের জনপ্রতিনিধি হওয়ার রাস্তা থেকে সরাতে পারত না। কিন্তু তা হয় না, কেননা, এদের অধিকাংশই শিক্ষা নিয়ে, রাজনীতি নিয়ে, সমাজসেবা ও ধর্ম নিয়ে ব্যবসায় ব্যস্ত।

সব শেষে একটি কথা। আপনারা, প্রার্থীরা, রাজনীতিকরা যদি ধিকৃত হতে না চান, তবে নিবেদিত থেকে শিক্ষা-সাহিত্য-সমাজসেবায় অনবদ্য এগিয়ে যান। এ আহবান সবার জন্য নিরন্ততর...

মোমিন মেহেদী : চেয়ারম্যান, নতুনধারা বাংলাদেশ-এনডিবি

[email protected]

ফেমাসনিউজ২৪.কম/আরআই/আরবি